তাই তো ইচ্ছে আছে, বলল অবনীশ।
তোর আঁকার সরঞ্জাম সব রয়েছে?
কিছু ক্যানভাস, একটা ইজেল, আর কিছু রঙ কিনতে পারলে ভাল হত।
বেশ তো–কিনবিখন। কত লাগবে বলিস। আমি টাকা দিয়ে দেব।
সেসব সরঞ্জাম কেনা হয়ে গেছে, কিন্তু অবনীশ এখনও ছবি আঁকতে শুরু করেনি। ইজেলে সাদা ক্যানভাস খাটানো রয়েছে, তাতেই ছবি ফুটে উঠবে, কিন্তু কবে বা কী ছবি তা অবনীশ এখনও ভেবে পায়নি।
অম্বিকা সেনগুপ্তর পোর্ট্রেট আঁকার আইডিয়াটা নিখিলই দেয়। নিখিল অবনীশের অনেকদিনের বন্ধু, যদিও সে আর্টিস্ট নয়। তারা দুজনে একসঙ্গে স্কুলে পড়েছে। তারপর দুজনের পথ আলাদা হয়ে গেলেও বন্ধুত্ব রয়েই গেছে। নিখিলের বাবা রজনী দত্ত ডাক্তার। নিখিল একদিন এসে সাদা ক্যানভাস দেখে বলল, কী রে, এখনও আঁকা আরম্ভ করিসনি?
অবনীশ মাথা চুলকে বলল, কী আঁকব সেটা ঠিক করলে তবে তো আঁকা শুরু হবে।
কেন? পোর্ট্রেট। তোর যেটা স্পেশালিটি।
কার পোর্ট্রেট? রাস্তা থেকে তোক ধরে এনে তো পোর্ট্রেট করা যায় না। আর আজকাল ফোটোগ্রাফিক যুগে অয়েল পোর্ট্রেট করানোর রেওয়াজ প্রায় উঠেই গেছে।
আমাকে দুদিন ভাববার সময় দে।
দুদিন বাদে নিখিল এসে অবনীশকে জিজ্ঞেস করল, অম্বিকা সেনগুপ্তর নাম শুনেছিস?
অবনীশ শোনেনি।
স্টিফেন অ্যান্ড গিলফোর্ড কোম্পানির একজন চাঁই। বাবার বিশেষ বন্ধু। একদিন ক্লাবে নাকি আক্ষেপ করে বাবাকে বলেছিলেন, পুরনো রেওয়াজ সব উঠে যাচ্ছে–এটা অত্যন্ত আফসোসের ব্যাপার। বাবার একট পোর্ট্রেট আছে আমাদের ড্রইং রুমে–পঞ্চাশ বছর আগে বিখ্যাত প্রবোধ চৌধুরীর করা। চমৎকার। ফোটোতে ওই আভিজাত্যই নেই। বাবা তাতে বললেন, তুমি একটা নিজের পোর্ট্রেট করাও না। বাধাটা কোথায়? সেনগুপ্ত নাকি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, সেরকম আর্টিস্ট কোথায়?
এ গল্প নিখিল গতকাল বাবার মুখে শোনার পরেই তার মাথায় বুদ্ধিটা খেলে।
পোর্ট্রেট তুই খুব ভাল পারবি–একেবারে ভেটারেন আর্টিস্টের মতো। আমি বাবাকে তোর কথা বলেছি। বাবা বলেছেন সেনগুপ্তকে বলবেন।
তিনদিন বাদে নিখিল অবনীশের কাছে এল। বলল, তোর ডাক পড়েছে।
কোথায়?
সাত নম্বর রয়েড স্ট্রিট। অম্বিকা সেনগুপ্তের বাড়ি।
কবে, কখন যেতে হবে?
রবিবার সকাল নটায়।
দুরু দুরু বুকে যথাসময়ে অবনীশ গিয়ে হাজির হল সাত নম্বর রয়েড স্ট্রিটে। বেয়ারা বসবার ঘরে বসালো অবনীশকে। তিন মিনিটের মধ্যেই আসল লোকের আবির্ভাব। সত্যিই ছবি আঁকার মতো চেহারা।
তুমি অয়েল পোর্ট্রেট করো? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমার খুব প্রশংসা করছে আমার বন্ধু ডাক্তার রজনী দত্তর ছেলে। কদিন নাও তুমি একটা পোর্ট্রেট করতে?
দিন দশেকের বেশি লাগে না।
তা হলে কালই শুরু করে দাও। আমার আবার কলকাতার পাট গুটিয়ে দিল্লির আপিসে চলে যেতে হতে পারে। আমার এখানেই আসবে। সকাল আটটা থেকে নটা পর্যন্ত টাইম দেব তোমায়। তোমার রেট কত?
আমি তো প্রোফেশনাল কাজ শুরুই করিনি; কাজেই যা ভাল বোঝেন তাই দেবেন।
শ পাঁচেক?
ঠিক আছে।
আরেকটা কথা–তিনদিনের দিন যদি দেখি ছবি আমার পছন্দ হচ্ছে না, গ হলে সেইখানেই থামতে হবে। তোমার এক্সপেনসেস আমি দিয়ে দেব। তবে স্বভাবতই পুরো পারিশ্রমিক পাবে না।
এতেও অবনীশ বলল, ঠিক আছে।
পরের দিনই কাজ শুরু হয়ে গেল। অবনীশকে একটা রিকশা ভাড়া করতে হয়েছিল সরঞ্জাম আনবার জন্য। অম্বিকা সেনগুপ্ত ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় ঠিক আটটার সময় হাজির হলেন বৈঠকখানায়।
কোথায় বসাবে আমাকে? ভদ্রলোক এসেই জিজ্ঞেস করলেন।
আজ্ঞে এই উত্তরের জানলাটার পাশে হলে ভাল হয়। নর্থ লাইটটা পোর্ট্রেটের পক্ষে সবচেয়ে ভাল লাইট।
হাতে বই-টই কিছু লাগে না? পাশে টেবিল থাকবে না?
আজকাল ওসব উঠে গেছে। আমি আপনার যাকে বলে আবক্ষ পোর্ট্রেট করব। আপনি এই চেয়ারটায় বসবেন। দাঁড়াবার দরকার নেই।
বাঃ–এ তো তেমন কঠিন ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে না।
তিনদিনেই দেখা গেল ছবিতে মিস্টার সেনগুপ্তকে চেনা যাচ্ছে। ভদ্রলোক কাজ দেখে অবনীশের পিঠে দুটো মৃদু চাপড় মেরে বললেন, এক্সেলেন্ট! ক্যারি অন। অবনীশের শাঁধ থেকে একটা বোঝ নেমে গেল।
কিন্তু তার পরের দিনই এক দুঃসংবাদ। তোমাকে আর তিনদিনের বেশি সময় দিতে পারছি না, অবনীশ।বললেন অম্বিকা সেনগুপ্ত। আমাকে বুধবার–অর্থাৎ আজ থেকে চারদিন পরে–দিল্লি চলে যেতে হচ্ছে। তলপি-তলপা গুটিয়ে। কদিনের জন্য তা বলতে পারব না। বছর দু-এক তো বটেই। আমকে মাঝে মাঝে আসতে হতে পারে। কিন্তু তার মধ্যে তোমায় সময় দিতে পারব না।
অবনীশের মনটা ভেঙে গেল। সে নিজেও বুঝতে পারছিল যে কাজটা খুব ভাল এগোচ্ছে। তিনদিনে যে ছবি শেষ হবে না তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
তা হলে আপনি কি অসমাপ্ত ছবিই সঙ্গে নিয়ে যাবেন?
সে আর কী করে হয়। যতদূর করতে পারো সেই অবস্থাতেই তোমার কাছে থাকবে ছবিটা। অবিশ্যি তোমার পারিশ্রমিক তুমি পাবে।
তিনদিনে মনের জোরের সঙ্গে হাতের জোর মিলিয়ে অবনীশ ছবির বারো আনা শেষ করে ফেলল। অম্বিকা সেনগুপ্ত এবার দেখে বললেন, ব্রিলিয়ান্ট, ব্রিলিয়ান্ট! তোমার ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল, অবনীশ। আমি টাকা সঙ্গেই এনেছি। এই নাও তোমার পারিশ্রমিক।
অবনীশ দেখল মিস্টার সেনগুপ্ত তাকে পাঁচশোর জায়গায় সাতটা করকরে একশো টাকার নোট দিয়েছেন।
