.
বিকেল হতে না হতে শিবু ফটিকের বাড়ি হাজির হল। না জানি কুষ্ঠি থেকে কী বার করেছে ফটিকদা!
শিবুকে দেখেই ফটিক মাথা নাড়ল।
সব গোলমাল হয়ে গেছে রে!
কেন ফটিকদা? কুষ্ঠি পাওনি?
তা পেয়েছি। তোর অঙ্কের মাস্টার যে রাক্ষস সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শুধু রাক্ষস নয়–পিরিন্ডি রাক্ষস। সাংঘাতিক ব্যাপার। এরা পুরোপুরি রাক্ষস ছিল সাড়ে তিনশো পুরুষ আগে। কিন্তু এত তেজ যে, এক-আধটা হাফ রাক্ষস এখনও বেরিয়ে পড়ে এদের মধ্যে। পুরো রাক্ষস তো এখন সভ্য দেশে কোথাও নেই-এক আছে আফ্রিকার কোনও কোনও অঞ্চলে, আর ব্লেজিল, বোর্নিও এইসব জায়গায়। তবে হাফ-রাক্ষস এখনও কচিৎকদাচিৎ সভ্যদেশে পাওয়া যায়। জনার্দনবাবু ওই ওদের মধ্যে একজন।
তা হলে গোলমাল কেন? শিবুর গলাটা একটু কেঁপে গেল। ফটিকদা হাল ছেড়ে দিলে সে চোখে অন্ধকার দেখবে। তুমি যে সকালে বললে তোমার ব্যবস্থা জানা আছে?
আমার জানা নেই এমন জিনিস নেই।
তবে?
ফটিকদা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর বলল, মাছের পেটে কী থাকে?
এই রে! ফটিকদার আবার পাগলামি আরম্ভ হয়েছে। শিবু এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ফটিকদা, রাক্ষসের কথা হচ্ছিল, তুমি আবার মাছ আনলে কেন?
কী থাকে? ফটিক গর্জন করে উঠল।
প-পটকা? ফটিকদার গলা শুনে শিবুর রীতিমতো ভয় লাগতে আরম্ভ করেছিল।
তোর মাথা! এত কম বিদ্যে দিয়ে তো তুই বকের বকলসটাও লাগাতে পারবি না। শোন। আড়াই বছর বয়সে একটা শ্লোক শিখেছিলাম, এখনও মনে আছে–
নর কি বানর কিংবা অন্য জানোয়ার
জেনে রাখো হৃৎপিণ্ডে রহে প্রাণ তার।
রাক্ষসের প্রাণ জেনো মৎস্যের উদরে,
সেই হেতু রাক্ষস সহজে না মরে॥
তাই তো! শিবু তো কত রূপকথার গল্পে পড়েছে মাছের পেটে থাকে রাক্ষসের প্রাণ। এটা তো তার মনে হওয়া উচিত ছিল।
শ্লোকটা আওড়ে ফটিক বলল, দুপুরে যখন গেলি ওর বাড়ি, জনার্দন রাক্ষসকে কেমন দেখলি?
বলল সর্দিজ্বর হয়েছে।
হবেই তো! ফটিকদার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। হবে না? প্রাণ নিয়ে টানাটানি যে। যেই কাতলা উঠেছে ছিপে, অমনই জ্বর! এ তো হবেই।
তারপর শিবুর দিকে এগিয়ে এসে তার শার্টের সামনেটা খপ করে হাতের মুঠোয় খামচে ধরে ফটিকদা বলল, এখনও হয়তো সময় আছে। তোর জ্যাঠা এই আধঘণ্টা আগে সরলদিঘির ওই আধমনি কাতলাটা ধরে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আমি দেখেই আন্দাজ করেছি যে, ওটার পেটের মধ্যেই আছে জনার্দন রাক্ষসের প্রাণ। এখন জ্বরের কথাটা শুনে আরও শিওর মনে হচ্ছে। ওই মাছটাকে চিরে দেখতে হবে।
কিন্তু সেটা কী করে হবে ফটিকদা?
সহজে হবে না। তোরই ওপর নির্ভর করছে। আর এটা না করতে পারলে যে তোর কী বিপদ হতে পারে সেটা ভাবতেও আমার ঘাম ছুটছে।
ঘণ্টাখানেক পরে শিবু একটা দড়ির মাথায় সরলদিঘির আধমনি কাতলাটাকে বেঁধে সেটাকে হিঁচড়ে হিঁচড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফটিকের বাড়ির সামনে এসে হাজির হল।
ফটিক বলল, কেউ জানতে পারেনি তো?
শিবু বলল, না। বাবা চান করছিলেন, জ্যাঠামশাই শ্রীনিবাসকে দিয়ে দলাইমলাই করাচ্ছিলেন, আর মা সন্ধে দিচ্ছিলেন। নারকোলের দড়ি খুঁজতে দেরি হল। আর উঃ, যা ভারী!
কুছ পরোয়া নেই। মাস্ল হবে।
ফটিক মাছ নিয়ে ভিতরে চলে গেল। শিবু ভাবল–কী আশ্চর্য বুদ্ধি আর জ্ঞান ফটিকদার! ওর জন্যই বোধহয় শিবু এ যাত্রা রক্ষা পাবে। হে ভগবান–জনার্দন রাক্ষসের প্রাণটা যেন থাকে মাছটার পেটে!
মিনিট দশেক পরে ফটিক বেরিয়ে এসে শিবুর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, নে। এটা হাতছাড়া করবি কখনও। রাত্রে বালিশের নীচে নিয়ে শুবি। ইস্কুলে যাবার সময় প্যান্টের বাঁ পকেটে নিয়ে নিবি। এটা হাতে থাকলে রাক্ষস কেঁচো, আর হামানদিস্তায় গুঁড়িয়ে ফেললে রাক্ষস ডেড। আমার মতে গুঁড়োবার দরকার নেই, হাতে রাখলেই যথেষ্ট। কারণ অনেক সময় দেখা গেছে পিরিণ্ডি রাক্ষস চুয়ান্ন বছর বয়সের পর থেকে পুরো মানুষ হয়ে গেছে। তোর জনার্দন মাস্টারের বয়স এখন তিপ্পান্ন বছর এগারো মাস ছাব্বিশ দিন।
শিবু এবার সাহস করে তার হাতের তেলের দিকে চেয়ে দেখল একটা ভিজে ভিজে মিছরির দানার মতো পাথর নতুন-ওঠা চাঁদের আলোয় চকচক করছে।
পাথরটাকৈ পকেটে নিয়ে শিবু বাড়ির দিকে ঘুরল। পিছন থেকে ফটিকদা বলল, হাতে আঁশটে গন্ধ রয়েছে তোর। ভাল করে ধুয়ে নিস। আর বোকা সেজে থাকিস, নইলে ধরা পড়ে যাবি।
.
পরদিন অঙ্কের ক্লাসে জনার্দনবাবু ঠিক ঢোকবার আগে একটা হাঁচি দিলেন, আর তার পরেই চৌকাঠে ঠোক্কর খেয়ে তাঁর জুতোর সুকতলা হাঁ হয়ে গেল। শিবুর বাঁ হাত তখন তার প্যান্টের বাঁ পকেটের ভিতর।
ক্লাসের শেষে শিবু অনেকদিন পরে অঙ্কে দশে দশ পেল। সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৭০
শিল্পী
অবনীশ ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। অয়েল পেন্টিং। একজন মাঝবয়সি সুপুরুষ ভদ্রলোকের পোর্ট্রেট। অবনীশের স্টুডিওর এক কোনায় আরও আট-দশটা ছবির পিছনে দাঁড় করানো ছিল। অবনীশের আঁকা প্রথম অয়েল পোর্ট্রেট। গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে সে দু বছর হল পাশ করে বেরিয়েছে। ছাত্র অবস্থায় অবিশ্যি সে আরও পোর্ট্রেট করেছে। এবং তাতে বেশ নামও হয়েছিল। অবনীশের ইচ্ছা সে ছবি আঁকাকেই পেশা হিসেবে নেবে। কিন্তু কীভাবে শুরু করবে সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।
অবনীশের বাড়িতে তার বাবা-মা আছেন। একটি বোন ছিল, তার সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। বাবা হিমাংশু বোস ব্যারিস্টার এবং ভাল প্র্যাকটিস। ছেলেকে তিনি চিরকালই উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। তিনি একদিন অবনীশকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই তো আর্টিস্ট হবি?
