শিবু মরিয়া হয়ে বলে উঠল, ফটিকদা, কী আজেবাজে বকছ তুমি? এদিকে জনার্দনবাবু যে সত্যিই রাক্ষস। আমি জানি তিনি রাক্ষস। আমি অনেক কিছু দেখেছি আর শুনেছি।
তারপর শিবু গত দুদিনের ঘটনা ফটিককে বলল। ফটিক সব শুনেটুনে গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, হু। তা তুই এ ব্যাপারে কী করবি কিছু ঠিক করেছিস?
তুমি বলে দাও না ফটিকদা! তুমি তো সব জানো।
ফটিক মাথা হেঁটে করে ভাবতে লাগল।
শিবু ফাঁক পেয়ে বলল, আমার বাড়িতে এখন একটা বন্দুক আছে।
ফটিক দাঁত খিঁচিয়ে উঠল।
তোর যেমন বুদ্ধি! বন্দুক আছে তো কী হয়েছে? বন্দুক দিয়ে রাক্ষস মারবি? গুলি রিবাউন্ড করে এসে যে মারছে তারই গায়ে লাগবে।
তাই বুঝি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বোকসন্দর!
তা হলে? শিবুর গলা মিহি হয়ে আসছিল। তা হলে কী হবে ফটিকদা? আমাকে যে আবার বাবা আজ থেকে
মেলা বকিসনি। বকে বকে কানের চিংড়ি নড়িয়ে দিলি।
প্রায় দুমিনিট ভাবার পর ফটিক শিবুর দিকে ফিরে বলল, যেতেই হবে।
কোথায়?
জনার্দনবাবুর বাড়ি।
সে কী?
ওঁর কুষ্ঠিটা জানতে হবে। আমি এখনও শিওর নই। কুষ্ঠি দেখলে সব বেরিয়ে যাবে। বাক্স-প্যাঁটরা ঘাঁটলে কুষ্টিটা বেরোবে নিশ্চয়ই।
কিন্তু—
তুই থাম। আগে প্ল্যানটা শোন। আমরা দুজনে যাব দুপুরবেলা। আজ রোববার, লোকটা বাড়ি থাকবে। তুই বাড়ির পিছন দিকটায় গিয়ে জনার্দনবাবুকে ডাকবি। বাইরে এলে বলবি অঙ্ক বুঝতে এসেছিস। তারপর দুএকটা আজেবাজে বকে লোকটাকে আটকে রেখে দিবি। আমি সেই ফাঁকে বাড়ির সামনের দিক দিয়ে ভিতরে গিয়ে কুষ্ঠিটা বের করে নিয়ে আসব। তারপর তুই এদিক দিয়ে পালাবি, আমি ওদিক দিয়ে পালাব। ব্যস।
তারপর? শিবুর যে প্ল্যানটা খুব ভাল লেগেছিল তা নয়, কিন্তু ফটিকদার উপর নির্ভর করা ছাড়া তো আর কোনও রাস্তাই নেই।
তারপর তুই বিকেলে আবার আমার বাড়ি আসবি। আমি ততক্ষণে কুষ্ঠিটা দেখে কিছু পুরনো পুঁথিপত্তর ঘেঁটে একেবারে রেডি থাকব। যদি দেখি জনার্দনবাবু সত্যিই রাক্ষস, তা হলে তার ব্যবস্থা আমার জানা আছে। তুই ঘাবড়াস না। আর যদি দেখি রাক্ষস নয়, তা হলে তো আর ভাববার কিছুই নেই।
ফটিকদা বলেছিল দুপুরে বেরোবে। শিবু তাই খাওয়া-দাওয়া করে গিয়ে ফটিকের বাড়ি হাজির হল। মিনিট পাঁচেক পর ফটিকদা বেরিয়ে এসে বলল, আমার হুলোটার আবার নস্যির বাতিক হয়েছে। বামেলা কি কম? শিবু লক্ষ করল ফটিকদার হাতে একজোড়া ছেঁড়া চামড়ার দস্তানা, আর একটা সইকেলের ঘণ্টা। ঘণ্টাটা সে শিবুর হাতে দিয়ে বলল, এটা তুই রাখ। বিপদ হলে বাজাস। আমি এসে তোকে বাঁচাব।
পুবপাড়ার একেবারে শেষমাথায় দোলগোবিন্দবাবুদের বাড়ির পরেই জনার্দন মাস্টারের বাড়ি। একা মানুষ, বাড়িতে চার পর্যন্ত নেই। বাইরে থেকে বাড়িতে যে একটা রাক্ষস আছে সেটা বোঝবার কোনও উপায় নেই।
কিছুটা রাস্তা বাকি থাকতেই শিবু আর ফটিকদা আলাদা হয়ে গেল।
বাড়ির পিছনে পৌঁছে শিবু বুঝল যে, তার আবার গলা শুকিয়ে আসছে। জনার্দনবাবুকে ডাকতে গিয়ে তার যদি গলা দিয়ে আওয়াজ না বেরোয়?
বাড়ির পিছনে পাঁচিল, তার গায়ে একটা দরজা, আর দরজার কাছেই একটা পেয়ারা গাছ। গাছের আশপাশ আগাছার জঙ্গলে ভরা।
শিবু পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। আর বেশি দেরি করলে কিন্তু ওদিকে ফটিকদার সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে।
আরেকটু বেশি সাহস পাবার জন্য শিবু পেয়ারা গাছটায় একটা হাত দিয়ে ভর করে মাস্টারমশাই বলে ডাকতে যাবে, এমন সময় একটা খচমচ শব্দ পেয়ে সে চমকে নীচের দিকে চেয়ে দেখে একটা। কালভৈরবী লতার ঝোঁপের ভিতর একটা গিরগিটি চলে গেল। আর গিরগিটিটা যেখান দিয়ে গেল তার ঠিক পাশেই সাদা সাদা কী যেন পড়ে রয়েছে।
একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঝোঁপটা ফাঁক করতেই শিবুই দেখল–সর্বনাশ! এ যে হাড়! জন্তুর হাড়। কী জন্তু? বেড়াল, না কুকুর–না ছাগল?
কী দেখছ ওখানে শিবরাম?
শিবুর শিরদাঁড়ায় একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে পিছন ফিরে দেখল জনার্দনবাবু খিড়কি দরজা ফাঁক করে গলা বাড়িয়ে তার দিকে অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে।
কিঁছু হাঁরিয়েছ নাকি?
না স্যার…আ-আমি..
তুঁমি কি আমার কাঁছেই আঁসছিলে? তা হলে পিছনের দঁরজা দিয়ে কেন? এসো–ভিঁতরে এসো।
শিবু পিছোতে গিয়ে দেখল তার একটা পা লতায় জড়িয়ে গেছে।
আঁমার আবার কাঁল থেকে একটু সঁর্দিজ্বর হয়েছে। রাত্রে আবার তোঁমার বাড়ি গেঁলাম তো? তুমি তঁখন ঘুমোচ্ছিলে।
শিবুর এত তাড়াতাড়ি পালানো চলবে না। ওদিকে ফটিকদার যে কাজই শেষ হবে না। মাঝখান থেকে হয়তো সে ধরাই পড়ে যাবে। একবার মনে হল ঘন্টাটা বাজাবে। তারপর মনে হল, এখনও তো সত্যি করে তার বিপদ কিছু হয়নি। ফটিকদা হয়তো রেগেই যাবে।
তুঁমি নিচু হয়ে কীঁ দেখছিলে বঁলো তো?
শিবু চট করে কোনও উত্তর পেল না। জনার্দনবাবু এগিয়ে এসে বললেন, জায়গাটা বড় ময়লা, ওঁদিকে না যাওয়াই ভাঁল। ভুলো কুঁকুরটা কোত্থেকে মাংসের হাড়গোড় এনে ফেঁলে ওখানে। এঁক-এঁকবার ভাবি ধমক দেব–কিন্তু পাঁরি না। আমার আবার জন্তু-জানোয়ার ভীষণ ভাঁল লাগে কিনা!
জনার্দনবাবু তাঁর হাতের পিছন দিয়ে ঠোঁটের নীচটা মুছলেন।
তুমি ভিতরে চলো শিবু–তোমার অঙ্কের ব্যাপারটা–
আর দেরি নয়। শিবু আজ থাক, কাল আসববলে, উলটোমুখো হয়ে এক দৌড়ে মাঠ পেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে, নীলুর বাড়ি, কার্তিকের বাড়ি, হরেনের বাড়ি পেরিয়ে একেবারে সাবাবুদের পোড়োবাড়ির গেটের রোয়াকে এসে বসে হাঁফ ছাড়ল। আজকের ব্যাপারটা সে কোনওদিন ভুলবে না। তার যে এত সাহস হতে পারে, সে নিজেই ভাবতে পারেনি।
