দরজার মুখ অবধি এসে পায়ের শব্দ থামল চৌকাঠের বাইরে। কয়েক মুহূর্তের নিঃশব্দতা। তারপর–
একী! দরজাটা–?
আদিনাথ সান্যালের বাজখাঁই কণ্ঠস্বর। অনেক গল্প করেছিলেন সেদিন ট্যাক্সিতে, তাই ফণীবাবু গলাটা ভোলেননি।
আরও মনে পড়ছে ফণীবাবুর। তাঁর পাশের ঘরের নরেন বিশ্বাস বলেছিলেন একটা কথা। সান্যাল মশাই নাকি অগাধ টাকার মালিক। কলকাতায় তিনখানা বাড়ি। সব ভাড়া দিয়ে নিজে এইখানে থাকেন। উপার্জনের রাস্তাগুলো নাকি সিধে নয়। আলমারিতে নাকি অনেক কালো টাকা।
সান্যাল মশাই এখন ঘরের ভিতর। কাঁচ ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলেছেন হাতে হাতে চোর ধরার আশায়। জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে ভদ্রলোকের।
.
ফণীবাবুর আর ভয় নেই। আদিনাথ সান্যালের পিছন দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে বাহাত্তরটা সিঁড়ি নেমে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে সতেরোর দুইয়ের দিকে রওনা দিলেন।
নিজের বাড়ির তিন তলায় এসে খালি পাখির খাঁচাটা বাঁচিয়ে একবার এগোতেই যখন বিজলি ফিরে এল, তখন ফণীবাবু লক্ষ করলেন যে তাঁর হাতে একটি ঝকঝকে নতুন হাল ফ্যাশানের জাপানি ছাতা এসে গেছে।
২৪৫ সন্দেশ, কার্তিক ১৩৮৫
শিবু আর রাক্ষসের কথা
অ্যাই শিবু–এদিকে শোন।
শিবুর ইস্কুল যাবার পথে ফটিকদা তাকে প্রায়ই এইভাবে ডাকে।
ফটিকদা মানে পাগলা ফটিক।
জয়নারায়ণ বাবুদের বাড়ি ছাড়িয়ে চৌমাথার কাছটায় যেখানে একটা পুরনো মরচে-ধরা স্টিম রোলার আজ দশ বছর ধরে পড়ে আছে, তার ঠিক সামনেই ফটিকদার ছোট্ট টিনের চালওয়ালা বাড়ি। অষ্টপ্রহর দাওয়ায় বসে কী-যে খুটুর খুটুর কাজ করে ফটিকদা তা ও-ই জানে। শিবু শুধু জানে ফটিকদা খুব গরিব, আর লোকে বলে যে এককালে খুব বেশি পড়াশুনো করেই ফটিক পাগল হয়ে গেছে। শিবুর কিন্তু তার এক-একটা কথা শুনে মনে হয় যে, তার মতো বুদ্ধিমান লোক খুব কমই আছে।
তবে এটা ঠিক যে, ফটিকদার বেশিরভাগ কথাই আজগুবি আর পাগলাটে। হ্যাঁ রে, কাল চাঁদের পাশটা লক্ষ করেছিলিবাঁ দিকটায় কেমন একটা শিং-এর মতো বেরিয়েছিল? কদিন থেকে কাকগুলো কেমন নাকি-নাকি সুরে ডাকছে শুনেছিস? সব হোলসেল সর্দি লেগেছে!
শিবুর হাসিও পায়, আবার মাঝে মাঝে বিরক্তিও লাগে। যেসব কথার কোনও জবাব নেই, যার সত্যি করে কোনও মানে হয় না, সেসব কথা শুনে তো খালি সময় নষ্ট। তাই এক-একদিন ফটিক ডাকলেও শিবু যায় না। আজ সময় নেই ফটিকদা, আরেকদিন আসব, বলে সে সটান চলে যায় ইস্কুলে।
আজও সে ভেবেছিল যাবে না, কিন্তু ফটিকদা আজ যেন একটু বেশি চাপ দিল।
তোকে যা বলতে চাই, সেটা না শুনলে তোর ক্ষতি হবে।
শিবু শুনেছে পাগলরা নাকি মাঝে মাঝে এমন সব সত্যি কথা বলে যা এমনি লোকেদের পক্ষে সম্ভবই না। তাই সে ক্ষতির কথা ভেবে ভয়ে ভয়ে ফটিকদার দিকে এগিয়ে গেল।
একটা হুঁকোর মধ্যে ডাবের জল ভরতে ভরতে ফটিক বলল, জনার্দনবাবুকে লক্ষ করেছিস?
জনার্দনবাবু শিবুদের নতুন অঙ্কের মাস্টার। দিন দশেক হল এসেছেন।
শিবু বলল, রোজই তো দেখছি। আজও তো প্রথমেই অঙ্কের ক্লাস।
ফটিক জিভ দিয়ে ছিক করে একটা বিরক্তি হওয়ার শব্দ করে বলল, দেখা আর লক্ষ করা এক জিনিস নয়, বুঝেছিস? বল তো, তুই যে বেল্টটা পরেছিস তাতে কটা ফুটো, শার্টটার কটা বোতাম? না দেখে বল তো?
শিবু কোনওটারই ঠিকমতো জবাব দিতে পারল না।
ফটিক বলল, ওই দ্যাখ–তোর নিজের জিনিস, নিজে পরে আছিস, অথচ লক্ষই করিসনি৷ তেমন জনার্দনবাবুকেও লক্ষ করিসনি তুই।
কী লক্ষ করব? কোন জিনিসটা?
হুঁকোতে কলকে লাগিয়ে গুড়ুক গুড়ুক করে দুটো টান দিয়ে ফটিক বলল, এই ধর–দাঁত।
দাঁত?
হুঁ, দাঁত।
কী করে লক্ষ করব? উনি যে হাসেন না।
কথাটা ঠিক। রাগী না হলেও, ওরকম গম্ভীর মাস্টার শিবুদের ইস্কুলে আর নেই।
ফটিক বলল, ঠিক আছে। এর পর যেদিন হাসবেন সেদিন ওঁর দাঁতগুলো খালি লক্ষ করিস। তারপর আমায় এসে বলে যাস, কী দেখলি।
.
আশ্চর্য ব্যাপার। ঠিক সেইদিনই অঙ্কের ক্লাসে জনার্দনবাবুর একটা হাসির কারণ ঘটে গেল।
জ্যামিতি পড়াতে পড়াতে শঙ্করকে চতুর্ভুজ মানে জিজ্ঞেস করাতে শঙ্কর বলল, ঠাকুর, স্যার। নারায়ণ, স্যার।–আর তাই শুনে জনার্দনবাবু খ্যাক খ্যাক করে রাগী হাসি হেসে উঠলেন, আর শিবুর চোখ তৎক্ষণাৎ চলে গেল তাঁর দাঁতের দিকে।
বিকেলে ফেরার পথে ফটিকদার বাড়ির সামনে পৌঁছে শিবু দেখলে সে হামানদিস্তায় কী যেন হেঁচছে। শিবুকে দেখে ফটিক বলল, এই ওষুধটা যদি উতরে যায় তো দেখিস বহুরূপীর মতো রঙ চেঞ্জ করতে পারব।
শিবু বলল, ফটিকদা, দেখেছি।
কী দেখেছিস?
দাঁত।
ও। কীরকম দেখলি?
এমনি সব ঠিক আছে, খালি পানের দাগ, আর দুটো দাঁত একটু বড়।
কোন দুটো?
পাশের। এইখানের। শিবু আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
হুঁ। ওখানের দাঁতকে কী বলে জানিস?
কী?
শ্বদন্ত। কুকুরে দাঁত।
ও।
এতবড় কুকুরে দাঁত মানুষের পার্টিতে দেখেছিস এর আগে?
না বোধহয়।
কুকুরে-দাঁত কাদের বড় হয় জানিস?
কুকুরের?
ইডিয়ট! শুধু কুকুরের কেন? সব মাংসাশী জন্তু-জানোয়ারেরই খদন্ত বড় হয়। ওই দাঁত দিয়েই তো কাঁচামাংস ছিঁড়ে হাড়গোড় চিবিয়ে খায় ওরা। বিশেষ করে হিংস্র জানোয়ারেরা।
ও।
আর কার বড় হয় শ্বদন্ত?
শিবু আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল। আর কার হবে আবার? মানুষ আর জন্তু-জানোয়ার–এ ছাড়া দাঁতওয়ালা জিনিস আর আছেই বা কী?
