ফণীবাবু মানিব্যাগটা পকেটে পুরে জানলার দিকে এগোলেন।
তিন পা এগোতেই বাধা পড়ল।
এটা চেয়ার। নবীন তা হলে চেয়ারটাকে সরিয়েছে।
নাঃ, এভাবে অন্ধকারে হাতড়ানোর কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে বাকি সময়টা আলোর অপেক্ষায় চেয়ারটাতেই বসে কাটিয়ে দেওয়া ভাল।
ফণীবাবু বসলেন। হাতলওয়ালা চেয়ার, বসার জায়গাটা বেতের। একবার যেন মনে হল তাঁর নিজের ঘরের চেয়ারে হাতল নেই, কিন্তু পরমুহূর্তেই খটকাটা মন থেকে দূর করে দিলেন। মানুষ নিজের ঘরের আসবাবের খুঁটিনাটি সব সময় মনে রাখে না, এই অভিজ্ঞতা তাঁর আজকে হয়েছে।
এখন ফণীবাবুর মুখ দরজার দিকে। বাইরে ছোট ছাতটার দিকে একটা ফিকে চতুষ্কোণ আভা। ফণীবাবু বুঝলেন সেটা আকাশ। শহরের যে অংশে লোড শেডিং নেই সেখানকার আলো প্রতিফলিত হয়ে আকাশে পড়েছে। যদিও মেঘ থাকায় তারা দেখা যাচ্ছে না। যাক, তবুও তো একটা দেখার জিনিস রয়েছে চোখের সামনে।
একটা টিক টিক শব্দ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে যে মুহূর্তে ফণীবাবুর খেয়াল হল যে তাঁর ঘরে কোনও টেবিল ঘড়ি নেই, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কান-ফাটা শব্দ তাঁকে চমকিয়ে প্রায় চেয়ার থেকে ফেলে দিল।
টেলিফোন।
তাঁর মাথার ঠিক পিছনে টেবিলের উপর টেলিফোন বেজে উঠেছে।
নিঃশব্দ অন্ধকারে প্রায় এক মিনিট ধরে একটা তুমুল আলোড়ন তুলে অবশেষে টেলিফোনটা থামল।
এইবার ফণীবাবু বুঝলেন যে তিনি তাঁর নিজের ঘরে আসেননি, কারণ তাঁর টেলিফোন নেই। আর এই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর কাছে আসল ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
সতেরোর দৃই আর সতেরোর তিন হল পাশাপাশি বাড়ি। একই ধাঁচের দুটো বাড়ি। দুটো বাড়িই তিন তলা, দুটো বাড়িরই একই বাড়িওয়ালা। সতেরোর তিনে ফণীবাবু কোনওদিন ঢোকেননি, কিন্তু আজ বোঝাই যাচ্ছে যে দুটো বাড়ির প্ল্যানই প্রায় হুবহু এক। তিনি এখন বসে আছেন সতেরোর তিনের তিন তলার পশ্চিমের ঘরে। সেই ঘরের আলো এখন নেই, কিন্তু ঘরের দরজা খোলা,
আলমারি খোলা।
তার মানে যাই হোক না কেন, ফণীবাবু নিজের ভুল বুঝতে পেরে আর সময় নষ্ট না করে উঠে পড়ার উপক্রম করেই আবার তৎক্ষণাৎ বসে পড়লেন।
আরেকটা শব্দ। এটা এসেছে তাঁর খুব কাছেই বাঁ দিক থেকে।
মেঝের উপর একটা টিনের বাক্স জাতীয় কিছু ঘষটানোর শব্দ।
ফণীবাবু বুঝলেন যে তাঁর গলা শুকিয়ে আসছে আর তাঁর বুকের ভিতরে দুরমুশ পেটা শুরু হয়েছে।
চোর।
তাঁর পাশেই বোধহয় খাট, আর খাটের নীচে চোর। বেরোবার চেষ্টায় খাটের নীচে রাখা টিনের বাক্সে ধাক্কা খেয়েছে।
ঘরের দরজা আর আলমারি কেন ভোলা সেটা এখন খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে।
চোরের কাছে যদি হাতিয়ার থাকে তা হলে ফণীবাবুর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তাঁর নিজের একমাত্র হাতিয়ার ছাতাটি এখন নাগালের বাইরে। তা ছাড়া ছাতার যা দৈন্যদশা, তাতে চোরের চেয়ে ছাতাটি জখম হবে বেশি।
চোর অবিশ্যি আবার চুপ মেরে গেছে, কারণ টিনের বাক্সের শব্দ তুলে নিজের উপস্থিতিটা জানান দেবার অভিপ্রায় তার নিশ্চয়ই ছিল না, ফলে সে হয়তো কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট।
ঠিক ঠিক ঠিক?–একটা টিকটিকি ডেকে উঠল।
ভুল ভুল ভুল!ফণীবাবুর মন বলল। একটা বিশ্রী ভুল করে একটা বিশ্রী অবস্থার মধ্যে এসে পড়েছেন তিনি। ছিচকে চোরের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার সম্ভাবনা কম, তবে ছোরা ছুরি থাকা অসম্ভব নয়। অবিশ্যি অনেক চোর নিরস্ত্র অবস্থাতেই বেরোয়। হাতাহাতির প্রশ্ন হলে ফণীবাবু হয়তো লড়ে যাবেন, কারণ এককালে তিনি ফুটবল খেলেছেন পাড়ার টিমে। কিন্তু মুশকিল করেছে এই অন্ধকার। দৃষ্টির অভাবে অতি শক্তিশালী মানুষও অসহায় বোধ করে।
কিন্তু তা হলে কী করা যায়? যা থাকে কপালে বলে উঠে পড়বেন কি?
কিন্তু যদি সিঁড়ি নামার মুখে বিজলি এসে যায়? আর ঠিক সেই সময় যদি একদিক দিয়ে চোর পালায়, আর অন্য দিক দিয়ে ঘরের মালিক এসে পড়েন? আর মালিক যদি এসে দেখেন তাঁর ঘরে চুরি হয়েছে, তা হলে তো
ফণীবাবুর চিন্তায় ছেদ পড়ল।
নীচ থেকে একটা পায়ের শব্দ আসছে।
এই সিঁড়ি ওঠা শুরু হল। ধীরে ধীরে উঠছেন ভদ্রলোক। ওঠার মেজাজ আর পায়ের শব্দ থেকে পুরুষ বলে বুঝতে অসুবিধা হয় না।
আটচল্লিশ ধাপ অবধি গুনে উনপঞ্চাশের মাথায় ফণীবাবুর ধারণা বদ্ধমূল হল যে, এই ঘরের মালিকই আসছেন সিঁড়ি উঠে, আর সেই সঙ্গে হঠাৎ ভেল্কির মতো মনে পড়ে গেল–
এই ঘরের মালিককে তো ফণীবাবু চেনেন!
এতক্ষণ খেয়াল হয়নি কেন? শেয়ারের ট্যাক্সিতে একবার ডালহৌসি অবধি গিয়েছিলেন ভদ্রলোকের সঙ্গে। কোনও কারণে বাস বন্ধ ছিল সেদিন। ভদ্রলোক নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। নাম আদিনাথ সান্যাল। বছর পঞ্চাশেক বয়স, জাঁদরেল চেহারা, টকটকে রঙ, গায়ে ফিনফিনে আদ্যির পাঞ্জাবি। ঘন ভুরুর নীচে তীক্ষ্ণ সবজেটে চোখ।
বাষট্টি-তেষট্টি-চৌষট্টি…পায়ের শব্দ এখন জোরালো।
ঘরের ভিতরেও শব্দ। খচমচ্ ধুপধাপূ–আর তারপরেই একটা যন্ত্রণাসূচক উ। পায় কাঁচ বিঁধেছে। চোরের শাস্তি। বাইরে আকাশের ফিকে আলোটা এক মুহূর্তের জন্য ঢেকে গিয়ে আবার দেখা গেল। চোর ঘুরেছে ডান দিকে। পাইপটা বেয়ে নামা ছাড়া আর গতি নেই তার।
সিঁড়ির পায়ের শব্দ এবার মেঝেতে। বাইরের বারান্দায়। ফণীবাবুও উঠে পড়লেন। সাবধানে কাঁচ বাঁচিয়ে ছাতাটা তুলে নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
