ফটিকদা তার হামানদিস্তায় একটা আখরোট আর এক চিমটে কালোজিরে ফেলে দিয়ে বলল, জানিস না তো? রাক্ষস।
রাক্ষস? রাক্ষসের সঙ্গে জনার্দনবাবুর কী? আর আজকের দিনে রাক্ষসের কথা কেন? সে তো ছিল রূপকথার বইয়ের পাতার মধ্যে। রাক্ষস-খোক্কসের গল্প তো শিবু কত শুনেছে, পড়েছে। তাদের মুলোর মতো দাঁত, কুলোর মতো—
শিবু চমকে উঠল।
কুলোর মতো পিঠ!
জনার্দনবাবুর পিঠটা তো ঠিক সিধে নয়। কেমন যেন কুঁজোকুঁজো কুলো কুলো ভাব। শিবু কাকে যেন বলতে শুনেছে যে, জনার্দনবাবুর বাতের রোগ, তাই পিঠ টেনে চলতে পারেন না।
মুলোর মতো দাঁত, কুলোর মতো পিঠ-আর? আর যেন কী হয় রাক্ষসের?
আর ভাঁটার মতো চোখ।
জনার্দনবাবুর চোখ কি শিবু লক্ষ করেছে? না, করেনি। করা সম্ভব নয়।
কারণ জনার্দনবাবু চশমা পরেন, আর সে চশমার কাঁচ ঘোলাটে। চোখের রঙ লাল কি বেগনি কি সবুজ তা বোঝবার কোনও উপায় নেই।
শিবু অঙ্কেতে খুব ভাল। লসাগু, গসাগু, সিঁড়িভাঙা, বুদ্ধির অঙ্ক–কোনওটাতেই সে ঠেকে না। অন্তত কিছুদিন আগে অবধি সে ঠেকত না। প্যারীচরণবাবু যখন অঙ্কের মাস্টার ছিলেন তখন তো রোজ সে দশে দশ পেয়েছে। কিন্তু এই দুদিন থেকে শিবুর একটু গণ্ডগোল হচ্ছে। কাল সে মনের জোরে অনেকটা সামলে নিয়েছিল নিজেকে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে মনে মনে বলতে আরম্ভ করেছিল, রাক্ষস হতে পারে না। মানুষ রাক্ষস হয় না। আগে হলেও, এখন হয় না। জনার্দনবাবু রাক্ষস নয়, জনার্দনবাবু মানুষ। ক্লাসে বসে বসেও সে মনে মনে এই কথাগুলো আওড়াচ্ছিল। এমন সময় একটা ব্যাপার হয়ে গেল।
জনার্দনবাবু ব্ল্যাকবোর্ডে একটা অঙ্ক লিখেই কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়ে তাঁর চশমাটা খুলে সেটা সদরের খুঁট দিয়ে মুছতে লাগলেন। আর ঠিক সেই সময় তাঁর সঙ্গে শিবুর চোখাচোখি হয়ে গেল।
শিবু যা দেখলে তাতে তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
জনার্দনবাবুর চোখের সাদাটা সাদা নয়। সেটা লাল। টকটকে লাল। পন্টুর পেনসিলটার মতো লাল। এটা দেখার পরে শিবুর পর পর তিনটে অঙ্ক ভুল হয়ে গেল।
.
এমনিতেই শিবু ছুটির পরে সোজা বাড়ি ফেরে না। সে প্রথমে যায় মিত্তিরদের বাগানে। ছাতিম গাছটার গুঁড়ির আশপাশটায় যে লজ্জাবতী লতাগুলো আছে, সেগুলোর প্রত্যেকটাকে সে আঙুলে টোকা মেরে মেরে ঘুম পাড়ায়। তারপর সে যায় সরলদিঘির পাড়ে। দিঘির জলে রোজ সে খোলামকুচি দিয়ে ব্যাঙবাজি করে। সাতবারের বেশি লাফ খাইয়ে যদি খোলামকুচি ওপারে পৌঁছতে পারে তবেই সে হরেনের রেকর্ড ব্রেক করবে। সরলদিঘির পরেই ইটখোলার মাঠ। সেখানে থরে থরে কোনাকুনিভাবে মাঠ পেরিয়ে বাড়ির খিড়কি দরজায় এসে পৌঁছয়।
আজ সে মিত্তিরদের বাগানে এসে দেখল লজ্জাবতী লতাগুলো নেতিয়ে পড়ে আছে। এরকম হল সে? কেউ কি হেঁটে গেছে লতাগুলোর উপর দিয়ে? এ পথে তো বড় একটা কেউ আসে না।
শিবুর আর ইচ্ছে করল না বাগানে থাকতে। কেমন যেন একটা থমথমে-ছমছমে ভাব। সন্ধেটা যেন আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘনিয়ে আসছে। কাকগুলো কি রোজই এত চেঁচায়না আজ কোনও কারণে ভয় পেয়েছে?
সরলদিঘির পাড়ে বইগুলো হাত থেকে নামিয়ে রেখেই শিবুর মনে হল আজ আর ব্যাঙবাজি করা উচিত হবে না। আজ বেশিক্ষণ বাইরে থাকাই তার উচিত নয়। থাকলে হয়তো বিপদ হবে।
একটা বিরাট কী যেন মাছ দিঘির মাঝখানে ঘাই মেরে ঘপাৎ করে ডুবে গেল।
শিবু বইগুলো হাতে তুলে নিল। ওপারের অশ্বত্থাগাছটায় বাদুড়গুলি ঝুলে গাছটা একেবারে কালো করে দিয়েছে। একটু পরেই ওদের ওড়ার সময় হবে। ফটিকদা বলেছে বাদুড়ের মাথায় কেন রক্ত ওঠে না সেটা একদিন বুঝিয়ে দেবে।
জামরুল গাছটার পেছনের ঝোঁপড়াটা থেকে একটা তক্ষক ডেকে উঠল–খোক্কস! খোঙ্কস! খোস!
শিবু বাড়ির দিকে রওনা দিল।
ইটখোলার কাছাকাছি আসতেই সে দেখতে পেল জনার্দনবাবুকে।
ইটের পাঁজাগুলোর হাত বিশেক দূরেই একটা কুলগাছ। তার পাশেই দুটো ছাগলছানা খেলা করছে, আর জনার্দনবাবু বই আর ছাতা হাতে একদৃষ্টে ছাগলদুটোর খেলা দেখছেন।
শিবু প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে কোনও শব্দ না করে একটা ইটের পাঁজার উপর উঠে দুটো ইটের মধ্যিখানের ফাঁক দিয়ে তার মাথাটা যতদূর যায় গলিয়ে জনার্দনবাবুকে দেখতে লাগল।
সে লক্ষ করল যে, ছাগলগুলোকে দেখতে দেখতে জনার্দনবাবু দুবার তাঁর ডান হাতটা উপুড় করে ঠোঁটের নীচে বুলোলেন।
জিভ দিয়ে জল না পড়লে মানুষ কখনও ওভাবে ঠোঁটের নীচটা মোছে না।
তারপর শিবু দেখল জনার্দনবাবু ওত পাতার মতো করে নিচু হলেন।
তারপর হঠাৎ হাত থেকে বই ছাতা ফেলে দিয়ে খপ করে একটা ছাগলের বাচ্চাকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নিলেন। আর সেইসঙ্গে শিবু শুনতে পেল ছাগলছানার চিৎকার, আর জনার্দনবাবুর হাসি।
শিবু একলাফে ইটের পাঁজা থেকে নেমে আরেক লাফে আরেকটা পাঁজা টপকাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে চিৎপটাং।
কে ওখানে?
কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠতে গিয়ে শিবু দেখে জনার্দনবাবু হাত থেকে ছাগল নামিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন।
কে, শিবরাম? চোট পেয়েছ নাকি? ওখানে কী করছিলে?
শিবু কথা বলতে গিয়ে দেখল তার গলা শুকিয়ে গেছে। তার ইচ্ছে করছিল উলটে জনার্দনবাবুকে জিজ্ঞেস করে–আপনি ওখানে কী করছিলেন? আপনার কোলে ছাগল কেন? আপনার জিভে জল কেন?
জনার্দনবাবু শিবুর কাছে এসে বললেন, ধরো, আমার হাত ধরো।
