এবার বাঁয়ে ঘুরতে হবে। সামনে দড়িতে ঝোলানো একটা খালি পাখির খাঁচা পড়বে। তাঁর পড়শি নরেশ বিশ্বাসকে তিনি অনেকদিন থেকে বলছেন যে ময়নাটা যখন মরেই গেছে তখন আর খালি খাঁচাটাকে পথের মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখা কেন। ভদ্রলোক এখনও পর্যন্ত কথাটা কানেই তোলেননি।
ফণীবাবু শরীরটাকে হাঞ্চব্যাকের মতো বেঁকিয়ে খাঁচা বাঁচিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়ালে ভর করে তাঁর ঘরের দিকে এগোলেন। এই ভাবে দেয়াল হাতড়ে তিন চার পা এগোলেই ডাইনে তাঁর ঘরের দরজা।
একটা গানের শব্দ আসছে। রবীন্দ্রসংগীত। বোধ হয় পাশের বাড়ি থেকে। ট্রানজিস্টারই হবে। লোড শেডিং-এর আদিম ভুতুড়ে পরিবেশে এই জাতীয় শব্দ মনে অনেকটা সাহসের সঞ্চার করে। অবিশ্যি এটাও বলা দরকার যে ফণীবাবুর ভূতের ভয় নেই মোটেই।
দরজার চৌকাঠ হাতে ঠেকতে ফণীবাবু হাঁটা থামিয়ে পকেট থেকে চাবি বার করলেন। দুটো চাবির একটা থাকে ফণীবাবুর কাছে; আরেকটা রাখে নবীন। তালার জায়গা আন্দাজ করা সহজ ব্যাপার, কিন্তু কড়া হাতড়ে ফণীবাবু তালা পেলেন না। অথচ তাঁর স্পষ্ট মনে আছে যে আপিসে যাবার সময় তিনি তালা লাগিয়ে পকেটে চাবি পুরেছেন। এটাও কি তা হলে নবীনের কীর্তি? সে কি তা হলে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে?
ফণীবাবু দরজায় ধাক্কা দিতে গিয়ে বোকা বনে গেলেন; কারণ দরজা দিব্যি খুলে গেল।
নবীন।
কোনও উত্তর নেই। নবীন ঘুমকাতুরে নয় সেটা ফণীবাবু জানেন।
ফণীবাবু চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকলেন। অবিশ্যি ঘরে ঢুকলেন কথাটা বোধহয় ঠিক হল না। কারণ দরজার পিছনে কী আছে তা বুঝতে হলে বেড়ালের চোখ দরকার। ফণীবাবু একবার চোখ বন্ধ করে আবার খুলে দেখলেন দুটো অবস্থার মধ্যে কোনও তফাত নেই। বাকি কাজ তিনি ইচ্ছে করলে চোখ বন্ধ করেই করতে পারেন। একেই বলে নিরেট অন্ধকার, যাকে দুহাত দিয়ে ঠেলে সামনে এগোতে হয়।
দরজার বাঁ পাশে এক ফালি দেয়াল, তাতে সুইচবোর্ড। তারপর দেয়াল ঘুরে গিয়ে পাশের ঘরের দরজা, আর দরজা পেরিয়ে ব্র্যাকেট আলনা। ফণীবাবুর হাতে ছাতা, সেটাকে আলনায় টাঙানো দরকার। গরম লাগছে, গায়ের জামাটা খুলে সেটাও আলনায় যাবে। তবে জামা খোলর আগে বুক পকেট থেকে মানিব্যাগটা বার করে আলনার পরেই বাঁ দিকে টেবিলের দেরাজে রাখতে হবে।
ফণীবাবু হাত বাড়ালেন সুইচ আন্দাজ করে। এখন বাতি জ্বলবে না ঠিকই, তবে বিজলি এলেই নিঃশব্দে আলো জ্বলে ওঠার মজাটা থেকে ফণীবাবু বঞ্চিত হতে চান না।
দুটো সুইচের একটার মাথা খোলা। নবীন একদিন লোড শেডিং-এর মধ্যেই হাতড়াতে গিয়ে শক খেয়েছিল। ফণীবাবু মোক্ষম আন্দাজে সেটাকে এড়িয়ে দ্বিতীয়টা বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মৃদু চাপে নীচে নামিয়ে দিলেন। খুট শব্দটা শুনতে ভালই লাগল।
সুইচ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে দ্বিতীয় দরজার ফাঁকটা পেরোতেই আবার দেয়াল ঠেকল হাতে। এর পরেই তাঁর মাথার সমান হাইটে–
কিন্তু না।
আলনার বদলে একটা অন্য জিনিস হাতে ঠেকল। শুধু ঠেকল না। আঙুলের একটা বেআন্দাজি খোঁচা লাগায় সেটা স্থানচ্যুত হয়ে মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
একটা ছবি। না হয় আয়না। ফণীবাবু বুঝলেন তাঁর পায়ের উপর কাঁচের টুকরো এসে পড়েছে। পায়ে চটি, তাই কাঁচ ফোঁটার ভয় নেই, কিন্তু আলনাটা গেল কোথায় সে ভাবনা তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য অনড় করে দিল। তাঁর ঘরে একটা ছবি আছে বটে, পরমহংসদেবের, কিন্তু সেটা থাকবার কথা উলটোদিকের দেয়ালে। আয়নাটা থাকে টেবিলের উপর। এটা নির্ঘাত নবীনের কীর্তি। ঘরের জিনিস এখান-ওখান করার বাতিক তার আছে বটে! তাঁর চটিজোড়া তিনি রাখেন টেবিলের নীচে, আর বারণ সত্ত্বেও নবীন প্রতিদিন সেটাকে চালান দেয় খাটের তলায়।
ফণীবাবু হাতের জীর্ণ ছাতাটা মাটিতে নামিয়ে হাতলটা দেয়ালে ঠেকিয়ে সেটাকে সাবধানে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। তারপর পকেট থেকে মানিব্যাগটা বার করে এগিয়ে গেলেন অদৃশ্য টেবিল লক্ষ্য করে। এগগাবার পথে পায়ের চাপে কাঁচ ভাঙল চিড় চিড় চিড়।
এবার বাঁ হাতটা টেবিলের কোণে ঠেকলেই দেরাজের হাতল খুঁজে পাওয়া সহজ ব্যাপার। কিন্তু বাঁ হাত টেবিলে ঠেকল না। আন্দাজে ভুল হয়েছে। আরও এক পা এগিয়ে গেলেন ফণীবাবু। অন্ধকার এখনও নিরেট। রাস্তার দিকের জানলাটা খুললে হয়তো খানিকটা সুবিধে হত।
এবার বাঁ হাতটা বাধা পেল।
একটা আসবাব। কাঠের আসবাব। কিন্তু টেবিল নয়। আলমারি কি?
হ্যাঁ, এই তো হাতল। খাড়াখাড়ি হাতল। কাঁচের হাতল। পলকাটা। কাট-গ্লাস। যেমন অনেক পুরনো আলমারিতে থাকে। ফণীবাবুর একটা পুরনো আলমারি আছে বটে, কিন্তু তার হাতল কাঁচের কিনা সেটা মনে পড়ল না।
কিন্তু একী–আলমারি যে খোলা!
ফণীবাবু হাতলটা ছেড়ে দিলেন। অল্প টান দিতেই দরজা খুলে এসেছে।
সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। তাঁর আলমারি স্বভাবতই তিনি কখনও খোলা রেখে যান না। যদিও ধনদৌলত বলতে তাঁর কিছুই নেই, কিন্তু জামাকাপড় আছে, কিছু পুরনো দলিল আছে, টাকা পয়সা যা কিছু থাকে আলমারির দেরাজে।
আজ সকালে কি তা হলে চাবি দিতে ভুলে গিয়েছিলেন ফণীবাবু?
কিন্তু টেবিলটা গেল কোথায়? তা হলে কি–?
ঠিক। তাই হবে। কারণটা খুঁজে পেয়েছেন ফণীবাবু।
গতকাল ছিল রবিবার। দুপুরে এল তুমুল বৃষ্টি। আর তখনই ফণীবাবু দেখলেন যে তাঁর ঘরের সিলিং থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে ঘরের ভিতর। টেবিলের উপরেও জল পড়ছিল, তাই নবীন খবরের কাগজ চাপা দিয়েছিল। আসলে বাড়িটা বেশ পুরনো। বাড়িওয়ালাকে ছাত সারানোর কথা বলতে হবে এ কথাটা তখনই মনে হয়েছিল ফণীবাবুর। আজও যে এ পাড়ায় দুপুরের দিকে বৃষ্টি হয়েছে সেটা ফণীবাবু রাস্তা ভিজে দেখেই বুঝেছিলেন। নবীন যদি টেবিলটাকে জানলার দিকে সরিয়ে থাকে এবং কাপড় সমেত আলনাটা উলটো দিকের দেয়ালে টাঙিয়ে থাকে, তা হলে বলতে হবে সে সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছে।
