ট্রেন এখন একশো গজের মধ্যে। রতনবাবু রেলিঙের দিকে আরও এগিয়ে গেলেন। আগেকার দিনের স্টিম এঞ্জিন হলে এতটা এগিয়ে যাওয়া নিরাপদ হত না; চোখে মুখে কয়লার ধোঁয়া ঢুকে যাবার বিপদ ছিল। এ ট্রেন ডিজেল ট্রেন, তাই ধোঁয়া নেই। শুধু বুক কাঁপানো গুরুগম্ভীর শব্দ আর চোখ ঝলসানো হেডলাইটের আলো।
ওই এসে পড়ল ট্রেন ব্রিজটার নীচে। রতনবাবু তাঁর দুকনুইয়ের উপর ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে দুটো হাত এসে তাঁর পিঠে মারল এক প্রচণ্ড ধাক্কা। রতনবাবু টাল সামলাতে পারলেন না, কারণ রেলিংটা ছিল মাত্র দুহাত উঁচু।
মেল ট্রেনটা সশব্দে ব্রিজ কাঁপিয়ে চলে গেল পশ্চিম দিকে, যেদিকের আকাশে রক্তের রঙ এখন বেগুনি হয়ে এসেছে।
রতনবাবু এখন আর ব্রিজের উপরে নেই, তবে তাঁর চিহ্নস্বরূপ একটি জিনিস এখনও রেলিং-এর কাঠের একটা ফাটলে আটকে রয়েছে। সেটা সুপুরি আর এলাচে ভরা একটি অ্যালুমিনিয়ামের কৌটো।
সন্দেশ, কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৭৭
রামধনের বাঁশি
রামধনের লোকটাকে চেনা চেনা লাগায় আরেকটু কাছে গিয়ে একটা গাছের আড়াল থেকে দেখে তার বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল। দশ বছর পেরিয়ে গেলেও চিনতে কোনও অসুবিধা নেই। এই সেই খগেশবাবু। খগেশ খাস্তগির, পুরনো ইটপাথর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন।
খগেশবাবুর সঙ্গে ছিলেন বকুলতলার সত্যপ্রকাশবাবু। তিনি বলছিলেন: কই, তেমন বদনাম তো কেউ দেয়নি এ বাড়ির। ভূতটুত এ তল্লাটে নেই। আপনি দুটো রাত এখানে অনায়াসে থাকতে পারেন। আর সঙ্গে যখন চাকর এনেছেন তখন ভাবনা কী? আপনি তো এদিকে এসেছেন আগে, দেখেছেন তো কী চমৎকার সব মন্দির। সব দেড়শো-দুশো বছরের পুরনো। আমাদের গাঁয়ে তো বড় একটা কেউ আসে না; আপনি অ্যাদ্দিন বাদে এলেন, এ আমাদের পরম ভাগ্য।
এতদিন পর মানে দশ বছর। রামধনের মেজকাকার বন্ধু হলেন খগেশ খাস্তগির। ভদ্রলোক কলকাতায় থাকেন, প্রত্নতত্ত্ব না কী জানি চর্চা করেন, তার জন্যই বার কয়েক এই জামহাটি গাঁয়ের দেড়শো-দুশো বছরের পুরনো পোড়া ইটের মন্দির দেখে গেছেন কয়েকবার। সেই নিয়ে তাঁর কিছু লেখাও কাগজে বেরিয়েছে মাঝে মাঝে।
খগেশবাবুর এই কাজ নিয়ে রামধনের মনে কৌতূহল জাগলেও সেই নিয়ে কোনওদিন কিছু বলার সাহস পায়নি। বাপরে বাপ-একটা ঘটনা সে কোনওদিন ভুলতে পারবে না। একবার খগেশবাবুর একটা পাথরের মূর্তি রামধন তুলে দেখতে গিয়ে সেটা হাত থেকে ফেলে দিয়েছিল। এমনিতেই রগচটা লোক, তার উপর এত বড় একটা ক্ষতি। খগেশবাবু শাস্তি হিসেবে এক হাতে রামধনের চুলের মুঠি আর এক হাতে তার পাতলা কোমরটা ধরে মাথার উপর তুলে একটা আছাড় মেরেছিলেন। দশ দিন ছিল গায়ে ব্যথা।
রামধন ছিল অত্যন্ত নিরীহ মেজাজের ছেলে। খগেশবাবু যখন প্রথমবার তাদের বাড়িতে এসেছিলেন তখন রামধনের বয়স মাত্র সতেরো। তখন সকলে তাকে দিয়ে ফাইফরমাশ খাটিয়ে নেয় আর কথায় কথায় ধমক লাগায়। পোস্টাপিসে চিঠি ফেলে এসো–তাও রামধন; বিশু জ্যাঠাকে ইস্টিশনে পৌঁছে দিয়ে এসো–তাও রামধন; বাদলা হয়েছে, কেষ্টর দোকান থেকে পেঁয়াজি নিয়ে এসো–তাও রামধন। ফলে রামধনকে সর্বদাই তটস্থ হয়ে থাকতে হত। পান থেকে চুনটি খসলে আর রক্ষে নেই; বাড়ির বড় কর্তা থেকে শুরু করে তেরো বছরের ছোট ভাই বিইও তার দিকে চোখ রাঙিয়ে ছাড়া কথা বলে না।
খগেশবাবু অ্যাদ্দিন বাদে গাঁয়ে এসেছেন আর গাঙ্গুলীদের বাড়িতে একটা ঘর নিয়ে থাকছেন শুনে সত্যপ্রকাশবাবু সত্যিই গদগদ হয়ে উঠলেন। বললেন, আপনার কাজের দিক দিয়ে দোতলার দক্ষিণের ঘরটা সবচেয়ে সুবিধে হবে। আলোবাতাস দুইই আছে। জানলা দিয়ে গণ্ডকী পাহাড় দেখা যাবে। আপনি দিব্যি নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন।
এইরে–কেলেঙ্কারি! ওই দক্ষিণের ঘরে রামধনের বাঁশিটা রয়ে গেছে। বড় সাধের বাঁশিরথের মেলা থেকে চার আনায় কেনা। সে কী আজকের কথা? সেই বাঁশি রামধন গাঁয়ের উত্তরের মাঠে গিয়ে। একটা নোনা বাদাম গাছের তলায় বসে বাজায়! এইভাবে তার কত সময় কেটে গেছে। বাড়িতে থাকে সে খুব কম সময়টুকু; বেশির ভাগই একা একা মাঠে ঘাটে টোটো করে বেড়ায়। এই নিয়ে কেউ আর আপত্তিও করে না। সেই ভাল। সারা জীবন অনেকের অনেক ফরমাশ সে খেটেছে; এখন তার ছুটি।
কিন্তু বাঁশিটা কী হবে? ওই বাঁশির জাতই যে আলাদা। এত বছর ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওর এমন গলা খুলেছে যেমন আর কোনও নতুন বাঁশিতে খুলবে না। এখন উপায় হচ্ছে তক্কে তক্কে থাকা। খগেশবাবু একবার। বাড়ি থেকে বেরোলে পর টুক করে গিয়ে বাঁশিটা নিয়ে আসা যাবে। ওর সামনে পড়া কোনওমতেই চলবে না। কে জানে, হয়তো দশ বছর আগের রাগ ভদ্রলোক এখনও পুষে রেখেছেন। চেহারায় যে দশ বছরে খগেশবাবুর বিশেষ পরিবর্তন হয়নি সেটা রামধন প্রথমেই লক্ষ করেছে।
খগেশবাবু এসেছিলেন সকালে। সারা দুপুর তিনি ঘর থেকে বেরোলেন না। সূর্যি যখন প্রায় ডুবুডুবু তখন কাঁঠাল গাছের আড়াল থেকে রামধন দেখল যে খগেশবাবু আড় ভাঙতে সামনের দরজা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। এবার বেরোবেন কি ভদ্রলোক? রামধন নিজেকে আরেকটু ভাল করে আড়াল করল গাছটার পিছনে।
খগেশবাবু আবার ভিতরে চলে গেলেন। তারপর একটা লাঠি নিয়ে বেরিয়ে এসে বাড়ির সামনের রাস্তাটা ধরে পুবে রওনা দিলেন। হাঁটার মেজাজ দেখেই বোঝা যায় তিনি সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছেন।
