রামধন দু মিনিট অপেক্ষা করে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। চাকরটাকেও এড়াতে হবে, না হলে আবার চোর ভেবে হল্লা শুরু করবে।
চাকরটাও ছিল একতলায় রান্নাঘরে। রামধন সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে সোজা দক্ষিণের ঘরের দিকে গেল! বাইরে থেকে দরজা বন্ধ। ঘুরে গিয়ে বারান্দার দিকের জানালা দিয়ে ঢুকতে হবে। অবিশ্যি সে জানলা যদি ভোলা থাকে।
হ্যাঁ–জানালা খোলা।
রামধন ঢুকল ঘরে। চারিদিকে টেবিলের উপর নানারকম পাথরের মূর্তি ছড়ানো। তাছাড়া রয়েছে। কাগজপত্র কলম পেনসিল দোয়াত ছবি।
কিন্তু বাঁশিটা নেই। অন্তত সেটা যে কুলুঙ্গিটার মধ্যে রাখা ছিল তার মধ্যে এখন রয়েছে একটা লণ্ঠন।
বাইরে মেঘের গর্জন। রামধন এখানে আসবার আগেই দেখেছিল নৈঋত কোণে কালো মেঘ জমেছে। এখন মনে হচ্ছে সে মেঘ একেবারে মাথার উপর। ঝড়ও বইতে শুরু করেছে। বারান্দার জানলা দিয়ে কয়েকটা শিরীষ গাছের পাতা এসে ঢুকল।
রামধন এসে হন্যে হয়ে বাঁশিটা খুঁজছে। খাটের নীচে, বালিশের নীচে, টেবিলের দেরাজে, ঘুলঘুলিতে।
এমন সময় হঠাৎ সিঁড়িতে একটা পায়ের শব্দ।
রামধনের মনে কোনও সন্দেহ নেই যে খগেশবাবু এখন ফিরে আসছেন বৃষ্টির উপক্রম দেখে।
তার সেই দশ বছর আগের কথা মনে পড়ে রামধনের বুকের রক্ত আবার হিম হয়ে গেল।
পায়ের শব্দ বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে এল।
রামধন একবার মনে করল যে বারান্দার দিকের জানলা দিয়ে পালাবে। কিন্তু কেন যেন তার শরীরে একটা অবশ ভাব এসে গেছে। তা ছাড়া তার বাঁশিটা তো এখনও পাওয়া যায়নি।
একটা মচ শব্দ করে দরজার তালাটা খুলল, আর তারপরেই দরজাটা খুলে গেল। রামধন কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যা কপালে আছে হবে।
কিন্তু যা হবে ভেবেছিল তা তো হলই না, বরং হল তার উলটো।
দরজাটা খুলে রামধনকে সামনে দেখে খগেশবাবুর চোখ কপালে উঠে গেল, আর তিনি ভিরমি দিয়ে সটান পড়লেন মেঝের উপর। আর ঠিক সেই সময় তার কোটের পকেট থেকে রামধনের বাঁশিটা বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। রামধন সেটাকে তুলে নিয়ে খগেশবাবুর দেহ টপকে বাইরে এসে সটান সিঁড়ি দিয়ে নেমে বেরিয়ে গেল।
সকলের কাছে ধমক খেয়ে এসেছে বলেই রামধন এটা বোঝেনি যে তাকে এখন দেখে খগেশবাবুর এই দশাই হবে। কারণ আজ থেকে দশ বছর আগে আজকেরই মতো একটা ঝড়ের সন্ধ্যায় মাথায় একটা কৎবেল প্রমাণ শিল পড়ে রামধন মাথা ফেটে অক্কা পায়।
তাঁর মেজাজ যতই ভারিক্কি হোক, চোখের সামনে রামধনের ভূতকে দেখে যে খগেশবাবু ভিরমি যাবেন তাতে আশ্চর্যের কিছুই নেই।
রচনাকাল: ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫
লখনৌর ডুয়েল
লখনৌর ডুয়েল
ডুয়েল মানে জানিস? জিজ্ঞেস করলেন তারিণীখুড়ো।
বাঃ, ডুয়েল মানে জানব না? বলল ন্যাপলা। ডুয়েল রোল, মানে দ্বৈত ভূমিকা। সন্তোষ দত্ত গুপী গাইনে ডুয়েল রোল করেছিলেন–হাল্লার রাজা, শুণ্ডীর রাজা।
সে ডুয়েলের কথা বলছি না, হেসে বললেন তারিণীখুড়ো। ডি-ইউ-এ-এল নয়, ডি-ইউ-ই-এল। ডুয়েল। অর্থাৎ দুজনের মধ্যে লড়াই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি জানি! আমরা সকলে একসঙ্গে বলে উঠলাম।
এই ডুয়েল নিয়ে এককালে কিছু পড়াশুনা করেছিলুম নিজের শখে, বললেন তারিণীখুড়ো। মোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে ইটালি থেকে ডুয়েলিং-এর রেয়াজ ক্রমে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তরোয়াল জিনিসটা ছিল ভদ্রলোকদের পোশাকের একটা অঙ্গ, আর অসি-চালনা বা ফেনসিং শেখাটা পড়ত সাধারণ শিক্ষার মধ্যে। একজন হয়তো আরেকজনকে অপমান করল, অমনি। অপমানিত ব্যক্তি ইজ্জত বাঁচাবার খাতিরে অন্যজনকে ডুয়েলে চ্যালেঞ্জ করল; এই চ্যালেঞ্জ অগ্রাহ্য করাটা রেয়াজের মধ্যে পড়ত না, ফলে সোর্ড ফাইট শুরু হয়ে যেত। মান যে বাঁচবেই এমন কোনও কথা নেই, কারণ যিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি অসি চালনায় তেমন নিপুণ নাও হতে পারেন। কিন্তু তাও চ্যালেঞ্জ করা চাই, কারণ অপমান হজম করাটা সেকালে অত্যন্ত হেয় বলে গণ্য হত।
বন্দুক-পিস্তলের যুগে অবিশ্যি পিস্তলই হয়ে গেল ডুয়েলিং-এর অস্ত্র। সেটা অষ্টাদশ শতাব্দীর ঘটনা। এই ডুয়েলিং-এ তখন এত লোক মরত আর জখম হত, যে এটাকে বেআইনি করার চেষ্টা ইতিহাসে অনেকবার হয়েছে। কিন্তু এক রাজা আইন করে বন্ধ করলেন তো পরের রাজা ঢিলে দেওয়াতে আবার চালু হয়ে গেল ডুয়েলিং। আর কতরকম তার আইনকানুন!–দুজনকেই হুবহু একরকম অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, দুজনেরই একটি করে সেকেন্ড বা আম্পায়ার থাকবে যাতে কারচুপির রাস্তা বন্ধ হয়; দুজনকেই দাঁড়াতে হবে এমন জায়গায় যাতে পরস্পরের মধ্যে আন্দাজ বিশ গজের ব্যবধান থাকে, আর চ্যালেঞ্জারের সেকেন্ড ফায়ার বলা মাত্র দুজনের একসঙ্গে গুলি চালাতে হবে। তোরা জানিস কিনা জানি না, এই ভারতবর্ষেই–না, ভারতবর্ষ কেন–এই কলকাতাতেই, আজ থেকে দুশো বছর আগে এক বিখ্যাত ডুয়েল লড়াই হয়েছিল?
ন্যাপলাও দেখলাম জানে না; সেও আমাদের সঙ্গে মাথা নাড়ল।
যে দুজন লড়েছিলেন, বললেন তারিণীখুড়ো, তাঁদের একজন তো জগদ্বিখ্যাত। তিনি হলেন ভারতের বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস। প্রতিপক্ষের নাম ফিলিপ ফ্রানসিস। ইনি ছিলেন বড়লাটের কাউনসিলের সদস্য। হেস্টিংস কোনও কারণে ফ্রানসিসকে একটি অপমানসূচক চিঠি লেখেন। ফ্রানসিস তখন তাকে ডুয়েলে চ্যালেঞ্জ করে। আলিপুরে এখন যেখানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি, তারই কাছে একটা ভোলা জায়গায় এই ডুয়েল হয়। ফ্রানসিস চ্যালেঞ্জ করেছেন, ফলে তারই এক বন্ধুকে জোড়া-পিস্তল জোগাড় করতে হল, এবং তিনিই ফায়ার বলে চেঁচালেন। পিস্তলও চলেছিল একই সঙ্গে, কিন্তু মাটিতে পড়ে জখম হয়ে পড়ল মাত্র একজনই–ফিলিপ ফ্রানসিস। তবে সুখের বিষয় সে-জখম মারাত্মক হয়নি।
