রতনবাবু সহানুভূতির ভঙ্গিতে বার দুয়েক মাথা নেড়ে চুক চুক করে শব্দ করে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
সুইসাইড! তা হলে খুনের কথাটা কারুর মাথাতেই আসেনি। কী আশ্চর্য সৌভাগ্য তাঁর। খুন জিনিসটা তো তা হলে ভারী সহজ! লোকে এত ভয় পায় কেন?
রতনবাবু মনে মনে ভারী হালকা বোধ করলেন। দুদিন পরে আজ তিনি আবার একা বেড়াতে পারবেন। ভাবতেও আনন্দ লাগে।
গতকাল মণিলালবাবুকে ঠেলা দেবার সময়ই বোধহয় রতনবাবুর শার্টের একটা বোম ছিঁড়ে গিয়েছিল। একটা দরজির দোকান খুঁজে বার করে তিনি বোতামটা লাগিয়ে নিলেন। তারপর একটা মনিহারি দোকান থেকে একটা নিম টুথপেস্ট কিনলেন–নাহলে কাল সকালে দাঁত মাজা হবে না। যেটা রয়েছে সেটা টিপে টিপে একেবারে চ্যাপটার শেষ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।
দোকান থেকে বেরিয়ে এসে কিছুদূর যেতেই একটা বাড়ির ভিতর থেকে কীর্তনের আওয়াজ এল রতনবাবুর কানে। রতনবাবু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই কীর্তন শুনলেন। তারপর শহরের বাইরে একটা নতুন রাস্তা দিয়ে মাইলখানেক হেঁটে এগারোটা নাগাদ হোটেলে ফিরে এসে স্নান খাওয়া সেরে দিবানিদ্রার উদ্যোগ করলেন।
যথারীতি তিনটে নাগাদ ঘুম ভাঙল, আর ভাঙামাত্র রতনবাবু বুঝতে পারলেন যে তাঁর মন চাইছে আজ সন্ধ্যায় আরেকবার ওভারব্রিজটায় যেতে। গতকাল খুব স্বাভাবিক কারণেই রতনবাবু ট্রেনের দৃশ্যটা উপভোগ করতে পারেননি। আকাশে মেঘ অবিশ্যি কাটেনি, কিন্তু তাতে ক্ষতি নেই। বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। আজ তিনি ট্রেন আসা থেকে শুরু করে চলে যাবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আরাম করে দেখবেন।
পাঁচটার সময় চা খেয়ে রতনবাবু নীচে নামলেন। সামনেই ম্যানেজার শম্ভুবাবু বসে আছেন। রতনবাবুকে দেখে বললেন, যে ভদ্রলোকটি কাল মারা গেছেন তাঁর সঙ্গে আপনার আলাপ ছিল নাকি মশাই?
রতনবাবু প্রথমটা কিছু না বলে অবাক হবার ভান করে শম্ভুবাবুর দিকে চাইলেন। তারপর বলেন, কেন বলুন তো?
না–ইয়ে–মানে, পঞ্চা বলছিল হাটে আপনাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখেছে!
রতনবাবু অল্প হেসে শান্তভাবে বললেন, আলাপ আমার এখানে কারুর সঙ্গেই হয়নি। হাটে এক-আধজনের সঙ্গে কথা হয়েছে বটে, তবে কি জানেন কোন লোকটি যে মারা গেছেন সেটাই তো আমি জানি না।
ও হো! শম্ভুবাবু হাসলেন। ভদ্রলোক বেশ আমুদে। উনিও আপনারই মতো হাওয়া বদলাতে এসেছিলেন। কালিকা হোটেলে উঠেছিলেন।
ও, তাই বুঝি?
রতনবাবু আর কোনও কথা না বলে বেরিয়ে পড়লেন। প্রায় দুমাইল পথ, আর বেশি দেরি করলে ট্রেন দেখা যাবে না।
রাস্তায় তাঁর দিকে আর কেউ সন্দিগ্ধ দৃষ্টি দিল না। গতকাল যে ছেলেগুলো জটলা করছিল, তাদের কাউকেই আজ আর দেখা গেল না। ওই মানিকজোড় কথাটা রতনবাবুর ভাল লাগেনি। ছেলেগুলো কোথায় গেল? একটা ঢাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন রতনবাবু। পাড়ায় পুজো আছে। ছেলেগুলো নির্ঘাত সেখানেই গেছে। রতনবাবু নিশ্চিন্ত মনে এগিয়ে চললেন।
খোলা প্রান্তরের মাঝখানের পথে আজ তিনি একা। মণিলালবাবুর সঙ্গে আলাপ হবার আগেও তিনি নিশ্চিন্ত মানুষ ছিলেন, কিন্তু আজ তাঁর নিজেকে যেমন হালকা মনে হচ্ছে, তেমন হালকা এর আগে কখনও মনে হয়নি।
ওই যে বাবলা গাছ। ওটা পেরিয়ে মিনিটখানেক হাঁটলেই ওভারব্রিজ। আকাশ মেঘে ভরা, তবে ঘন কালো মেঘ নয়, ছাইয়ের মতো ফিকে মেঘ। বাতাস নেই, তাই সমস্ত মেঘ যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ওভারব্রিজটা দেখতে পেয়ে রতনবাবুর মন আনন্দে নেচে উঠল। তিনি পা চালিয়ে এগিয়ে গেলেন। বলা যায় না–ট্রেন যদি কালকের চেয়েও বেশি তাড়াতাড়ি এসে পড়ে! মাথার উপর দিয়ে একঝাঁক বক উড়ে গেল। ভিনদেশের বক কিনা কে জানে!
ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাটা রতনবাবু বেশ ভাল করে বুঝতে পারলেন। খুব মন দিয়ে কান পাতলে ক্ষীণ ঢাকের শব্দ শহরের দিক থেকে শোনা যায়। এ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
রতনবাবু রেলিঙের পাশটায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ওই যে দূরে সিগন্যাল, আর ওই যে আরও দুরে স্টেশন। রেলিং-এর নীচের দিকের কাঠের ফাটলে কী যেন একটা জিনিস চকচক করছে। রতনবাবু উপুড় হয়ে হাত বাড়িয়ে জিনিসটাকে বার করে আনলেন। সেটা একটা গোল টিনের কৌটো, তার ভিতরে এলাচ আর সুপুরি। রতনবাবু একটু হেসে সেটাকে ব্রিজের উপর থেকে নীচের লাইনে ফেলে দিলেন। ঠুং করে একটা মৃদু শব্দও পেলেন তিনি। কদ্দিন ওইখানে পড়ে থাকবে ওই সুপুরির কৌটো কে জানে!
কীসের আলো ওটা?
ট্রেন আসছে। এখনও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আলো এগিয়ে আসছে।
রতনবাবু অবাক হয়ে আলোটা দেখতে লাগলেন। হঠাৎ একটা দমকা বাতাসে তাঁর কাঁধ থেকে র্যাপারটা খসে পড়ল। রতনবাবু সেটাকে আবার বেশ ভাল করে জড়িয়ে নিলেন।
এবারে শব্দ পাচ্ছেন তিনি। গুড় গুড় গুড় গুম গুম গুম গুম গুম–যেন একটা ঝড় এগিয়ে আসছে, আর সঙ্গে ক্রমাগত একটা মেঘের গর্জন।
রতনবাবুর হঠাৎ মনে হল তাঁর পিছনে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। এ সময় ট্রেনের দিক থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল–কিন্তু তাও তিনি একবার চারিদিক চট করে চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিলেন। কেউ কোথাও নেই। আজ কালকের চেয়ে অন্ধকার কম, তাই দেখতে অসুবিধে নেই। শুধু তিনি আর ওই দ্রুত ধাবমান জাঁদরেল ট্রেনটা ছাড়া মাইলখানেকের মধ্যে আর কেউ আছে বলে মনে হয় না।
