ট্রেনের শব্দে কান পাতা যায় না।
মণিলালবাবু রেলিংধারে দাঁড়িয়ে ট্রেনের দিকে চেয়ে আছেন। একটা বিদ্যুতের চমকআর সেই সঙ্গে সঙ্গে রতনবাবু তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দু হাত দিয়ে মণিলালবাবুর পিঠে মারলেন ধাক্কা। তার ফলে মণিলালবাবুর দেহটা দু হাত উঁচু কাঠের রেলিং-এর উপর দিয়ে উলটে সটান চলে গেল। নীচে একেবারে রেললাইনের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তেই রতনবাবু বুঝতে পারলেন যে, ওভারব্রিজটা কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে।
রতনবাবু আজ আর ট্রেন চলে যাবার দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করলেন না। কাঠের ব্রিজটার মতোই তাঁর মধ্যেও একটা কাঁপুনি শুরু হয়েছে। পশ্চিমের মেঘটা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে–আর মাঝে। মাঝে বিদ্যুতের চমক।
রতনবাবু র্যাপারটা বেশ ভালভাবে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে হোটেলের দিকে রওনা দিলেন।
বৃষ্টির প্রথম পশলাটা এড়াবার ব্যর্থ চেষ্টায় শেষের রাস্তাটুকু প্রায় দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে রতনবাবু হোটেলে ঢুকলেন।
ঢুকেই তাঁর কেমন যেন খটকা লাগল।
এটা কোথায় এলেন তিনি? মহামায়া হোটেলের সামনে ঘরটা তো এরকম নয়। এরকম টেবিল, এরকমভাবে চেয়ার সাজানো, দেয়ালে এরকম ছবি…!
এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ দেয়ালে একটা কাঠের বোর্ড তাঁর চোখে পড়ল। কী বিদঘুঁটে ভুল রে বাবা! এ যে কালিকা হোটেলে এসে ঢুকেছেন তিনি! এইখানেই তো মণিলালবাবু ছিলেন না?
বৃষ্টিতে ভিজলেন নাকি?
কে একজন প্রশ্ন করল তাঁকে। রতনবাবু ঘুরে দেখলেন মাথায় কোঁকড়া চুল সবুজ র্যাপার গায়ে দেওয়া একজন লোক–বোধহয় এই হোটেলেরই বাসিন্দা–তাঁর দিকে মুখ করে হাতে চায়ের পেয়ালা নিয়ে বসে আছে। রতনবাবুর মুখ দেখে ভদ্রলোক যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, সরি–ভুল হয়ে গেছে। আপনাকে দেখে হঠাৎ মণিলালবাবু বলে মনে হয়েছিল!
এই প্রশ্নটা শুনে এই প্রথম রতনবাবুর মনে একটা সন্দেহ জাগল–তিনি যে খুনটা করলেন–সেটা সবদিক বিচার করে আটঘাট বেঁধে করেছেন কি? তাঁরা দুজন যে একসঙ্গে বেরিয়েছেন সেটা হয়তো অনেকেই দেখেছে; কিন্তু দেখা মানেই কি লক্ষ করা? যারা দেখেছে তাদের কি কথাটা মনে থাকবে? আর যদি থাকেও, তার মানেই কি সন্দেহটা তাঁর উপরেই পড়বে? হাট থেকে বেরিয়ে খোলা রাস্তায় পড়বার পর আর তাঁদের কেউ দেখেনি–একথা রতনবাবু খুব ভালভাবেই জানেন। আর ওভারব্রিজে পৌঁছনোর পরও হ্যাঁ–সেই সাইকেলওয়ালা তো তাঁদের দুজনকে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। কিন্তু তখন রীতিমতো অন্ধকার হয়ে এসেছে। ওইভাবে দ্রুতবেগে সাইকেল চালিয়ে যাবার সময় কি সে লোক তাঁদের মুখ চিনে মনে করে রেখে দিয়েছে? অসম্ভব!
রতনবাবু যতই ভাবলেন, ততই তিনি নিশ্চিন্ত বোধ করতে লাগলেন। মণিলালবাবুর মৃতদেহ আবিষ্কার হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু তার ফলে রতনবাবুর উপর সন্দেহ পড়বে, তাঁর বিচার হবে, শাস্তি হবে, তাঁকে খুনি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে–এসব কথা রতনবাবুর কিছুতেই বিশ্বাস হল না।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে দেখে রতনবাবু কালিকা হোটেলে বসে এক পেয়ালা চা খেলেন। সাড়ে সাতটা নাগাদ বৃষ্টি থামল। রতনবাবু সটান নিউ মহামায়ায় চলে এলেন। কী অদ্ভুতভাবে ভুল করে তিনি ভুল হোটেলে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন সেটা ভাবতেও তাঁর হাসি পাচ্ছিল।
রাত্রে পেটভরে খেয়ে বিছানায় শুয়ে দেশ পত্রিকা খুলে অস্ট্রেলিয়ার বুনো জাতিদের সম্বন্ধে একটা প্রবন্ধ পড়ে রতনবাবু ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুজলেন। আবার তিনি একা এবং অদ্বিতীয়। তাঁর সঙ্গী নেই, সঙ্গীর কোনও প্রয়োজনও নেই। তিনি এতকাল যেমনভাবে কাটিয়েছেন, আবার ঠিক তেমনিভাবেই কাটাবেন। এর চেয়ে আরাম আর কী হতে পারে?
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর তার সঙ্গে বিদ্যুতের চমক আর মেঘের গর্জন। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না, কারণ রতনবাবুর নাক ডাকতে শুরু করেছে।
.
পরদিন সকালে চা দেবার সময় পঞ্চা বলল, ওই লাঠিটা কাল হাটে কিনলেন নাকি বাবু?
রতনবাবু বলেন, হ্যাঁ।
কত নিল?
রতনবাবু দাম বললেন। তারপর গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে বললেন, তুমি গিয়েছিলে হাটে?
পঞ্চা একগাল হেসে বলল, হ্যাঁ বাবু। দ্যাখলাম তো আপনাকে। আপনি আমায় দেখতে পাননি?
কই, না তো!
এর পরে পঞ্চার সঙ্গে তাঁর আর কোনও কথা হয়নি।
চা খাওয়া শেষ করে হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি কালিকা হোটেলের সামনে এসে পৌঁছলেন। কালকের সেই কোঁকড়া চুলওয়ালা ভদ্রলোকটি আরও কয়েকজন বাঙালি ভদ্রলোকের সঙ্গে দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে চিন্তিতভাবে কথাবার্তা বলছেন। মণিলালবাবুর নাম, আর সুইসাইড কথাটা রতনবাবুর কানে এল। তিনি ভাল করে শোনার জন্য আরেকটু এগিয়ে গেলেন। শুধু তাই না–একটা প্রশ্নও করে বসলেন।
কে আত্মহত্যা করল মশাই?
গতকালের ভদ্রলোক বললেন, কাল আপনাকে দেখে যে লোক বলে ভুল করেছিলুম, তিনি।
সুইসাইড?
সেইরকমই তো মনে হচ্ছে। রেললাইনের ধারে লাশ পাওয়া গেছে। একটা ওভারব্রিজ আছে, তারই ঠিক নীচে। মনে হয় উপর থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন। ভদ্রলোক এমনিতেই একটু অদ্ভুত গোছের ছিলেন। কারুর সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলতেন না। আমরা ওঁকে নিয়ে বলাবলি করতুম।
ডেডবডি–?
পুলিশের জিম্মায় চেঞ্জে এসেছিলেন ভদ্রলোক। চেনাশুনা কেউ নেই এখানে। কলকাতা থেকে এসেছিলেন। এর বেশি আর কিছুই নাকি জানা যায়নি।
