সবকিছু মিলিয়ে তাঁর বারবার মনে হতে লাগল যে মণিলাল মজুমদার লোকটি তাঁর জীবনে না এলেই যেন ভাল ছিল। ঠিক একই রকম দুজন লোক যদি জগতে থাকে, তাদের পরস্পরের কাছাকাছি আসাটা কোনও কাজের কথা নয়। সিনি থেকে কলকাতা ফিরে গিয়েও মণিলালবাবুর সঙ্গে হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে একথা ভাবতেই রতনবাবু শিউরে উঠলেন।
একটা দোকানে বাঁশের লাঠি বিক্রি হচ্ছিল। রতনবাবুর অনেকদিনের শখ একটা লাঠি কেনার, কিন্তু মণিলালবাবু দর করছেন দেখে রতনবাবু অনেক কষ্টে তাঁর লোভ সংবরণ করলেন। শেষটায় দেখেন কি মণিলালবাবু নিজেই একটার জায়গায় দুটো লাঠি কিনে তার একটি তাঁকে উপহার দিলেন। দেবার সময় আবার বললেন, এই সামান্য লাঠিটা বন্ধুত্বের চিহ্ন হিসাবে নিতে আপনার নিশ্চয়ই আপত্তি হবে না।
হাটের পর হোটেলের দিকে ফেরার পথে মণিলালবাবু অনেক কথা বললেন। তাঁর ছেলেবেলার কথা, তাঁর মা বাবার কথা, তাঁর ইস্কুল কলেজের কথা। রতনবাবুর শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল যে, তাঁর নিজের জীবনকথাই যেন কেউ তাঁকে গড়গড় করে শুনিয়ে যাচ্ছে।
বিকেলবেলা চা খেয়ে দুজনে মাঠের মাঝখানের পথ দিয়ে ব্রিজের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রতনবাবুর মাথায় ফন্দিটা এল। কথা তাঁকে বেশি বলতে হচ্ছে না, তাই মাথাটা কাজ করছিল ভাল। দুপুর থেকেই মনে হচ্ছে এই লোকটাকে হটাতে পারলে ভাল হয়, কিন্তু উপায়টা মাথায় আসছিল না। ঠিক এই মুহূর্তে পশ্চিমের আকাশে কালো মেঘটা চোখে পড়তেই রতনবাবু উপায়টা যে তাঁর চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত দৃশ্য হিসাবে দেখতে পেলেন।
তিনি দেখলেন যে, তাঁরা দুজন যেন ওভারব্রিজের রেলিং-এর ধারটায় দাঁড়িয়ে আছেন। দুরে পশ্চিম দিক থেকে ছটার মেল ট্রেনটা ঝড়ের মতো এগিয়ে আসছে। এঞ্জিনটা যখন বিশ গজের মধ্যে এসে পড়েছে, তখন তিনি মণিলালবাবুর কাঁধে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে–
রতনবাবু হাঁটা অবস্থাতেই চোখ বন্ধ করলেন। তারপর চোখ খুলে আড়চোখে একবার মণিলালবাবুর দিকে দেখে নিলেন। মণিলালবাবুকে কিছুমাত্র চিন্তিত বলে মনে হল না। কিন্তু দুজনের মধ্যে যদি এতই মিল হয়, তা হলে মণিলালবাবুও হয়তো মনে মনে তাঁকে হটাবার কোনও ফন্দি আঁটছেন!
কিন্তু তাঁর চেহারা দেখে তা মনে হল না। সত্যি বলতে কি, ভদ্রলোক দিব্যি মনের আনন্দে গুনগুন করে গান গাইছেন। হিন্দি সিনেমার এই গানের সুরটা রতনবাবুও মাঝে মাঝে গুনগুন করে থাকেন।
পশ্চিমের কালো মেঘটা এগিয়ে এসেছে, সুর্য মেঘের পিছনে ঢাকা। বোধহয় আর কয়েক মিনিটেই অস্ত যাবে। রতনবাবু চারিদিকে চেয়ে ত্রিসীমানায় আর অন্য কোনও মানুষের চিহ্ন দেখতে পেলেন না। ভালই হয়েছে। কাছাকাছির মধ্যে কোনও তৃতীয় ব্যক্তি থাকলে তাঁর প্ল্যান ভেস্তে যেত।
আশ্চর্য একটা মানুষকে খুন করার কথা ভেবেও রতনবাবু নিজেকে দোষী মনে করতে পারলেন। মণিলালবাবুর যদি কোনও বিশেষত্ব থাকত–এমনকী তাঁর স্বভাবচরিত্র যদি রতনবাবুর চেয়ে সামান্য অন্যরকমও হত–তা হলে রতনবাবু তাঁকে মারবার কথা কল্পনাই করতে পারতেন না। রতনবাবুর বিশ্বাস হয়েছে যে, একই রকম দুজন লোকের একসঙ্গে বেঁচে থাকার কোনও সার্থকতা নেই। তিনি নিজে আছেন, নিজে থাকবেন এটাই যথেষ্ট! মণিলালবাবু থেকেও যদি তাঁর থেকে দূরে থাকতে পারতেন–যেমন এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলেন–তাতে তাঁর আপত্তি করার কিছু ছিল না। কিন্তু এখন এই আলাপের পর সেটা সম্ভব নয়, তাই তাঁকে সরিয়ে ফেলা নেহাতই দরকার।
দুই ভদ্রলোক এসে ওভারব্রিজটায় পৌঁছলেন।
বেশ গুমোট করেছে, মণিলালবাবু বললেন। রাত্রের দিকে বৃষ্টিও হতে পারে। আর তার মানেই কাল থেকে জাঁকিয়ে ঠাণ্ডা পড়বে।
রতনবাবু এই ফাঁকে একবার ঘড়িটা দেখে নিলেন। ছটা বাজতে বারো মিনিট। ট্রেনটা নাকি খুব টাইমে যাতায়াত করে। আর বেশিক্ষণ নেই। রতনবাবু তাঁর জড় ভাবটা ঢাকবার জন্য একটা হাই তুলে বললেন, বৃষ্টি হলেও ঘণ্টা চার-পাঁচের আগে কোনও সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।
সুপুরি খাবেন?
মণিলালবাবু পকেট থেকে একটা গোল টিনের কৌটো বার করে ঢাকনা খুলে রতনবাবুর দিকে এগিয়ে দিলেন। রতনবাবুর পকেটেও একটা কৌটোতে সুপুরি ছিল। তিনি সেটা আর বার না করে, সেটার কথা উল্লেখ না করে মণিলালবাবুর কৌটো থেকে একটা সুপুরি নিয়ে মুখে পুরে দিলেন।
আর প্রায় সেই মুহূর্তেই ট্রেনের আওয়াজটা শোনা গেল।
আজ ট্রেনটা ছটার একটু আগেই চলে এসেছে।
মণিলালবাবু রেলিংএর দিকে এগিয়ে গিয়ে ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে বললেন, সাত মিনিট বিফোর টাইম।
পশ্চিমে মেঘ থাকার জন্য আজ অন্যদিনের চেয়ে চারিদিক একটু বেশি অন্ধকার, তাই হেডলাইটের আলোটা আরও বেশি উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে। এখনও অনেক দূরে ট্রেন, তবে আলোটা দ্রুত বেড়ে চলেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে চোখে জল এসে যায়।
ক্রিং ক্রিং!
সাইকেল চেপে একটা লোক রাস্তা দিয়ে ব্রিজের দিকে এসেছে। সর্বনাশ! লোকটা থামবে নাকি?
না, রতনবাবুর আশঙ্কা ভুল। লোকটা তাঁদের পাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে সাইকেল চালিয়ে উলটোদিকের রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ট্রেনটা প্রচণ্ড দাপটে এগিয়ে এসেছে। চোখ ঝলসানো হেডলাইটে দূরত্ব আন্দাজ করা কঠিন। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওভারব্রিজ কাঁপতে শুরু করবে।
