জগন্নাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে টেবিলের দুদিকে মুখোমুখি বসে খেতে খেতে রতনবাবু লক্ষ করলেন যে, তাঁরই মতো মণিলালবাবুও বেশ পরিষ্কার করে চেটেপুটে খেতে ভালবাসেন, তাঁরই মতো খাবার মাঝখানে জল খান না, তাঁরই মতো ডালের মধ্যে পাতিলেবু কচলে নেন। সব খাবার পরে দই না খেলে রতনবাবুর চলে না, মণিলালবাবুরও না।
খাবার সময় রতনবাবুর একটু অসোয়াস্তি লাগছিল এই কারণে যে, তাঁর সবসময়ই মনে হচ্ছিল যে, অন্য টেবিলের লোকেরা তাঁদের দিকে ফিরে ফিরে দেখছে। এরা কি তাঁদের দুজনের মধ্যে মিলটা লক্ষ করেছে? এই মিলটা কি এতই স্পষ্ট যে, বাইরের লোকের চোখেও ধরা পড়ে?
খাবার পরে রতনবাবু আর মণিলালবাবু চাঁদনি রাতে রাস্তায় কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। একটা প্রশ্ন রতনবাবুর মাথায় অনেকক্ষণ থেকে ঘুরছিল, এক ফাঁকে সেটা বেরিয়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে?
মণিলালবাবু হেসে বললেন, এই পেরোলো বলে। এগারোই পৌষে পঞ্চাশ কমপ্লিট করব। রতনবাবুর মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। দুজনের জন্মও একই দিনে–১৩২৩ সালের এগারোই পৌষ!
আধঘণ্টাখানেক পায়চারি করার পর বিদায় নেবার সময় মণিলালবাবু হেসে বললেন, আপনার সঙ্গে আলাপ করে বড় আনন্দ পেলুম। আমার সঙ্গে সহজে কারুর একটা বনে না কিন্তু আপনার বেলা সেকথাটা খাটে না। বাকি ছুটিটা বেশ আনন্দে কাটবে বলে মনে হচ্ছে।
.
অন্যান্য দিন রতনবাবু দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। সঙ্গে দু-একটি বাংলা মাসিক পত্রিকা নিয়ে বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ পাতা ওলটানোর পর আপনা থেকেই ঘুমে চোখ বুজে আসে। শোয়া অবস্থাতেই হাত বাড়িয়ে বাতির সুইচটা পাওয়া যায়, সেটা নেভানোর মিনিটখানেকের মধ্যেই রতনবাবুর নাক ডাকতে শুরু করে। আজ কিন্তু তিনি দেখলেন যে, তাঁর ঘুম আসতে চাইছে না। পড়বারও ইচ্ছে নেই। পত্রিকাটা হাতে তুলে নিয়ে আবার পাশের টেবিলে রেখে দিলেন।
মণিলাল মজুমদার… রতনবাবু কোথায় যেন পড়েছিলেন যে, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে কোথাও এমন কোনও দুজনকে পাওয়া যাবে না যাদের চেহারা হুবহু একরকম। অথচ চোখ কান নাক হাত পা ইত্যাদির সংখ্যা সকলেরই এক। চেহারার হুবহু মিল না হয় অসম্ভব, কিন্তু দুজনের মনের এই আশ্চর্য মিল কি সম্ভব? শুধু মন কেন বয়স, পেশা, গলার স্বর, হাঁটা ও বসার ভঙ্গি, চোখের চশমার পাওয়ার ইত্যাদি আরও অনেক কিছু হুবহু মিলে যাচ্ছে। ভাবলে মনে হয় অসম্ভব ব্যাপার, কিন্তু সেটাও যে সম্ভব হয়েছে তার প্রমাণ তো গত চার ঘণ্টায় রতনবাবু অনেকবার পেয়েছেন।
রাত বারোটা নাগাদ রতনবাবু বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের কুঁজো কাত করে আঁজলা করে খানিকটা জল নিয়ে নিজের মাথায় দিলেন। তাঁর মাথা গরম হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ঘুম আসবে না। ভিজে মাথায় আলতো করে গামছাটা একবার বুলিয়ে নিয়ে আবার বিছানায় গিয়ে শুলেন। বালিশটা ভিজে গেল। ভালই। যতক্ষণ না শুকোয় ততক্ষণ মাথা ঠাণ্ডা থাকবে।
পাড়া নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। একটা প্যাঁচা বিকট স্বরে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে হোটেলের পাশ দিয়ে উড়ে চলে গেল। জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে বিছানায় পড়েছে। কখন জানি আপনা থেকেই রতনবাবুর মন থেকে ভাবনা মুছে গিয়ে তাঁর চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল।
রাত্রে ঘুমোতে দেরি হবার ফলে রতনবাবুর সকালে ঘুম ভাঙতে প্রায় আটটা হয়ে গেল। নটায় মণিলালবাবুর আসার কথা। আজ মঙ্গলবার। মাইলখানেক দূরে একটা জায়গায় আজ হাট বসবে। গতকাল খেতে খেতে দুজনে প্রায় একসঙ্গেই হাটে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কেনার বিশেষ কিছু নেই, খালি ঘুরে দেখা আর কি।
চা খেতে খেতেই প্রায় নটা বাজল। সামনে প্লেটে রাখা মৌরির খানিকটা মুখে পুরে হোটেল থেকে বাইরে বেরোতেই রতনবাবু দেখলেন মণিলালবাবু হাসিমুখে এগিয়ে আসছেন।
কাছে এসে মণিলালবাবুর প্রথম কথা এল, আপনার সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল সেকথা ভাবতে ভাবতে কাল ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে গেল। উঠে দেখি আটটা বাজতে পাঁচ। এমনিতে ঠিক ছটায় উঠি।
রতনবাবু একথার কোনও জবাব দিলেন না। দুজনে হাটের দিকে রওনা দিলেন। পাড়ার কতগুলো ছোঁকরা জটলা করছিল; রতনবাবুরা তাদের সামনে দিয়ে যাবার সময় তাদের মধ্যে একজন টিটকিরির সুরে বলে উঠল, মানিকজোড়! রতনবাবু যথাসম্ভব কথাটাকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চললেন। মিনিট কুড়ির মধ্যে দুজনে হাটে পৌঁছে গেলেন।
বেশ গমগমে হাট। ফলমূল শাকসবজি তরিতরকারি থেকে বাসনকোসন হাঁড়িকুঁড়ি জামাকাপড় মুরগিছাগল ইত্যাদি সবকিছুরই দোকান বসেছে। ভিড়ও হয়েছে বেশ। সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এ-দোকান সে-দোকান দেখতে দেখতে রতনবাবু আর মণিলালবাবু এগিয়ে চললেন।
ওটা কে? পঞ্চা না? রতনবাবু কেন জানি তাঁর হোটেলের চাকরটাকে সামনে ভিড়ের মধ্যে দেখে তাঁর দৃষ্টি নামিয়ে মুখটাকে আড়াল করে দিলেন। ছোঁকরাদের মানিকজোড়কথাটা কানে যাওয়া অবধি তাঁর ধারণা হয়েছে তাঁদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে লোকেরা মনে মনে হাসে।
ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় আচমকা রতনবাবুর মনে একটা চিন্তার উদয় হল। হঠাৎ কেন জানি মনে হল যে, তিনি একাই ছিলেন ভাল। বন্ধুর তাঁর কোনও দরকার নেই। আর বন্ধু হলেও, সে লোক যেন মণিলালবাবুর মতো না হলেই ভাল। মণিলালবাবুর সঙ্গে তিনি যতবারই কথা বলেছেন, ততবারই তাঁর মনে হয়েছে তিনি যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন। প্রশ্ন করলে কী উত্তর পাওয়া যাবে সেটা যেন আগে থেকেই জানা, তর্ক করার কোনও সুযোগ নেই, আলোচনার প্রয়োজন নেই, ঝগড়াঝাঁটির কোনও সম্ভাবনাই নেই। এটা কি বন্ধুত্বের লক্ষণ? তাঁর অফিসের কার্তিক রায়ের সঙ্গে মুকুন্দ চক্কোত্তির তো গলায় গলায় ভাব; কিন্তু তা বলে কি দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় না? আলবত হয়। কিন্তু তবু তো তারা বন্ধু, সত্যি করেই বন্ধু।
