এবার আগন্তুকের গলার স্বর শুনেও রতনবাবু চমকে উঠলেন। একবার তাঁর পাড়ার ছেলে সুশান্ত একটা টেপ রেকর্ডারে রতনবাবুর গলা রেকর্ড করে শুনিয়েছিল। সে গলা আর এই লোকটির গলায় কোনও তফাত নেই বললেই চলে।
ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম মণিলাল মজুমদার। আপনি তো বোধহয় নিউ মহামায়া হোটেলে উঠেছেন, তাই না?
রতনলালমণিলাল। নামেও কেমন আশ্চর্য মিল। রতনবাবু কোনওরকমে অবাক ভাবটা কাটিয়ে তাঁর নিজের পরিচয়টা দিলেন।
আগন্তুক বললেন, আপনার বোধহয় আমাকে মনে পড়বে না–আমি কিন্তু এর আগেও আপনাকে দেখেছি।
কোথায় বলুন তো?
আপনি গত পুজোয় ধুলিয়ান যাননি?
রতনবাবুর ভুরু কপালে তুলে বললেন, আপনিও সেখানে গেসলেন নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি প্রতিবারই পুজোয় কোথাও না কোথাও যাই। একা মানুষ, বন্ধুবান্ধবও বিশেষ নেই। আর নতুন নতুন জায়গায় একা একা বেড়াতে দিব্যি লাগে। সিনির কথাটা আমার আপিসের এক সহকর্মী আমাকে বলেন। বেশ জায়গা কী বলেন?
রতনবাবু ঢোক গিলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কেমন যেন অবিশ্বাস আর অসোয়াস্তি মেশানো একটা ভাব বোধ করছেন তিনি।
ওদিকের পুকুরটা দেখেছেন–যার পাশে পাখির জটলা হয় বিকেলবেলার দিকটা? মণিলালবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
রতনবাবু বললেন, হ্যাঁ, দেখেছেন।
মনে হল কিছু ভিদেশের পাখিও জড়ো হয়েছে ওখানে। কিছু পাখি দেখলাম যা বাংলাদেশে আগে দেখিনি। আপনার কী মনে হল?
এতক্ষণে রতনবাবু খানিকটা স্বাভাবিক বোধ করছেন। বললেন, আমারও তাই ধারণা। আমিও কতগুলো পাখি দেখে চিনতে পারিনি।
দূর থেকে একটা গুন্ গুন্ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ট্রেন আসছে। পুব দিকে চেয়ে দেখলেন দূরে সার্চলাইট দেখা যাচ্ছে। আলোটা ক্রমশ বড় হয়ে এগিয়ে আসছে। রতনবাবু আর মণিলালবাবু দুজনেই ব্রিজের রেলিং-এর ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। বিরাট শব্দ করে ব্রিজটাকে থরথর করে কাঁপিয়ে ট্রেনটা উলটো দিকে চলে গেল। দুজন ভদ্রলোকই হেঁটে ব্রিজটার উলটোদিকে গিয়ে যতক্ষণ না ট্রেনটা অদৃশ্য হয় ততক্ষণ সেদিকে চেয়ে রইলেন। রতনবাবুর মনে ছেলেমানুষি রোমাঞ্চের ভাব জেগে উঠেছে। মণিলালবাবু বললেন, আশ্চর্য! এত বয়স হল, তবু ট্রেন দেখার আনন্দটা গেল না!
বাড়ি ফেরার পথে রতনবাবু জানালেন যে, মণিলালবাবু তিনদিন হল সিনিতে এসেছেন, আর কালিকা হোটেলে উঠেছেন। কলকাতাতেই তাঁর পৈতৃক বাড়ি, কাজও করেন তিনি কলকাতার এক সওদাগরি আপিসে। মাইনের কথাটা কেউ কাউকে সাধারণত জিজ্ঞেস করে না, কিন্তু রতনবাবু একটা অদম্য ইচ্ছের ফলে লজ্জার মাথা খেয়ে সেটা জিজ্ঞেস করে ফেললেন। উত্তর যা পেলেন তাতে তাঁর কপালে ঘাম ছুটে গেল। এমনও কি সম্ভব? মণিলালবাবু আর রতনবাবুর মাইনে একদুজনেই পান চারশো সাঁইত্রিশ টাকা, দুজনেই ঠিক একই বোনাস পেয়েছেন পুজোয়।
লোকটা যে তাঁর নাড়িনক্ষত্র কোনও ফিকিরে আগে থেকেই জেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গে একটা ধাপ্পাবাজির খেলা খেলছে, একথাটা রতনবাবু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। প্রথমত, তাঁর রোজকার জীবনে কী ঘটনা না-ঘটছে তা নিয়ে কেউ কোনওদিন মাথা ঘামায়নি। তিনি নিজের তালে নিজেই ঘোরেন। আপিসের বাইরে বাড়ির চাকর ছাড়া কারুর সঙ্গে কথা বলেন না, কারুর বাড়িতে গিয়ে কখনও আড্ডা মারেন না। মাইনের ব্যাপারটা না হয় বাইরে জানাজানি হতে পারে, কিন্তু তিনি রাত্রে কখন ঘুমোন, কী খেতে ভালবাসেন, কোন খবরের কাগজটা পড়েন, কোন থিয়েটার বা কোন বাংলা সিনেমা তিনি ইদানীং দেখেছেন–এসব তো তিনি নিজে ছাড়া আর কেউই জানে না। অথচ এর সবকিছুই যে ভদ্রলোকের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
রতনবাবু কিন্তু কথাটা মুখ ফুটে মণিলালবাবুকে বলতে পারলেন না। সারা রাস্তা তিনি শুধু মণিলালবাবুর কথাই শুনলেন, আর নিজের সঙ্গে মিল দেখে বারবার অবাক হলেন, চমকে উঠলেন। নিজের সম্বন্ধে তিনি এগিয়ে গিয়ে কিছুই বললেন না।
রতনবাবুর হোটেলটাই আগে পড়ে। হোটেলের সামনে এসে মণিলালবাবু বললেন, আপনার এখানে খাওয়া-দাওয়া কেমন?
রতনবাবু বললেন, মাছের ঝোলটা মন্দ করে না। বাকি সব চলনসই।
আমার হোটেলে রান্নাটা আবার তেমন সুবিধের নয়। শুনেছি এখানে জগন্নাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে নাকি ভাল লুচি আর ছোলার ডাল করে। আজ রাতের খাওয়াটা সেখানে সারলে কেমন হয়?
রতনবাবু বললেন, বেশ তো, আমার আপত্তি নেই। ধরুন এই আটটা নাগাদ? ১১০
ঠিক আছে। আমি ওয়েট করব আপনার জন্য। তারপর একসঙ্গে যাওয়া যাবে।
মণিলালবাবু চলে যাবার পর রতনবাবু হোটেলে না ঢুকে কিছুক্ষণ বাইরে রাস্তায় পায়চারি করলেন। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এসেছে। আকাশ পরিষ্কার–এতই পরিষ্কার যে, তারার মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া ছায়াপথটাকে পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আশ্চর্য! এতকাল রতনবাবুর আফসোস ছিল যে তাঁর সঙ্গে মনের আর মতের মিল হয় এমন কোনও বন্ধু তিনি খুঁজে পাননি; অথচ এই সিনিতে এসে হঠাৎ এমন একজন লোকের সাক্ষাৎ পেয়েছেন যাকে তাঁরই একটি ডুপ্লিকেট সংস্করণ বলা যেতে পারে। চেহারায় খানিকটা তফাত থাকলেও, স্বভাবে আর রুচিতে এমন মিল যমজ ভাইদের মধ্যেও দেখা যায় কিনা। সন্দেহ।
তার মানে কি এতদিনে তাঁর বন্ধুর অভাব মিটল?
রতনবাবু এ প্রশ্নের উত্তর চট করে খুঁজে পেলেন না। হয়তো মণিলালবাবুর সঙ্গে আরেকটু মিশলে তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। একটা জিনিস তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন যে, তাঁর একা ভাবটা যেন কেটে গেছে। এ পৃথিবীতে ঠিক তাঁরই মতো আরেকটি লোক এতদিন ছিল, আর তিনি আকস্মিকভাবে তার সাক্ষাৎ পেয়ে গেছেন।
