হবি তো হ, বাজনার দোকান মাটির পুতুলের দোকানের ঠিক পাশেই। রতন সবে একটা বাঁশিতে একটা মন-মাতানো সুর তুলেছে এমন সময় শোরগোল শুনে পাশ ফিরে দেখে রাজকন্যা। শুধু দেখা নয়, একেবারে চোখে চোখে দেখা। রাজকন্যার বয়স ষোলো, রতনের উনিশ। রতনের চেহারাটাও ভাল। সে ব্রাহ্মণ পুরুতের একমাত্র ছেলে। পাঁচ ঘর যজমান নিয়ে পুরুত হরিনারায়ণের মোটামুটি চলে যায়, কিন্তু তার স্ত্রী অন্নপূর্ণা ছেলে রতনকে এই অবস্থার মধ্যেই মানুষ করেছে খুব যত্ন করে। তাই রতনের চেহারায় কোনও দারিদ্র্যের ছাপ পড়েনি।
রাজকন্যা লক্ষ্মীর চোখে চোখ পড়তেই রতনের মন খুশিতে ভরে উঠল। এমন সুন্দর মেয়ে সে দেখেনি কখনও। আহা, একে যদি গান শোনাতে পারত সে, তা হলে কেমন ভাল হত!
অবিশ্যি চোখ পড়তেই রাজকন্যা আবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু তাতে কী হয়? তাকে দেখে রাজকন্যার খারাপ লাগেনি এটা রতন বুঝেছে। আর কী চাই? সে একটার জায়গায় তিনটে বাঁশি কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরল। সে পুরুতগিরি করবে না, গান-বাজনা নিয়েই থাকবে, এটা সে বাপকে বলে দিয়েছে। তার বিয়ের কথাও বাপ দু-একবার তুলেছেন, তাতে রতন কিছু বলেনি। এবার যদি তোলেন তা হলে রতন বলবে উজলপুরের রাজকন্যার মতো সুন্দরী মেয়ে হলেই সে বিয়ে করবে, নইলে নয়।
আজ ছিল রবিবার। সময়টা দুপুর; রতন সকালে দুঘণ্টা বাঁশি বাজানো অভ্যাস করে একবার গিয়েছিল গোপীনাথ মুদির দোকানে। বাড়ি ফিরে এসে দেখে এক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সন্ন্যাসীর চোখ দুটো লাল, গলায় চারখানা বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা। হাতে চিমটে আর কমণ্ডলু। রতনকে দেখেই বাবাজি হাত তুলে আশীর্বাদ করে বললেন, সেই চাঁদপুর থেকে আসছি, এখনও যেতে হবে তিন ক্রোশ পথ; তোরা তো ব্রাহ্মণ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমাকে এক ঘটি খাবার জল এনে দে তো দেখি।
নিশ্চয়ই; আপনি বসুন।
রতন তাড়াতাড়ি বাবাজির জন্য দাওয়ায় আসন পেতে দিল। তারপর বাড়ির ভিতরে গেল জল আনতে। মা শুনে বললেন, শুধু জল কেন? অতিথি এসেছেন, পিঠে আছে, দু খানা দিয়ে দে জলের সঙ্গে।
আসলে বাবাজির চেহারাটা–বিশেষ করে জবাফুলের মতো চোখ দুটো রতনের খুব ভাল লাগেনি। তাই মা-র কথা শুনে সে বলল, আবার পিঠে কেন? চেয়েছেন তো শুধু জল।
অন্নপূর্ণা ধমকের সুরে বললেন, অতিথিসেবায় যত পুণ্যি তত আর কিছুতে হয় না, জানিস? যা বলছি তাই কর।
রতন অনিচ্ছাসত্ত্বেও জলের সঙ্গে রেকাবিতে করে পিঠে নিয়ে গিয়ে বাবাজিকে দিল। বাবাজি দুই গ্রাসে দুটো পিঠে খেয়ে ঢকঢক করে পুরো ঘটি জলটা খেয়ে ফেলে বললেন, আঃ, বড় তৃপ্তি হল!
কথাটা বলে আরও আরাম করে বসে পা দুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, তোর নাম তো রতন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।…
রতন বুঝল, বাবাজি যেমন-তেমন লোক নন; ইনি গুনতে জানেন। কিন্তু তাও তাঁকে রতনের ভাল লাগল না। এমনভাবে পা ছড়িয়ে দিলেন কেন? দুপুরটা এখানেই কাটাবেন নাকি? তা বাবা রতন, বললেন বাবাজি, একটু পা দুটো ডলে দে তো দেখি। এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।
রতন এটা আশা করেনি। তার কাছে অনুরোধটা একটু বাড়াবাড়ি বলে মনে হল।
সে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বাবা আবার বললেন, কই, একটু পদসেবা কর! তোর পুণ্যি হবে। হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন?
রতনের মনটা হঠাৎ শক্ত হয়ে উঠল। ইনি যত বড়ই সাধু হন, রতন পরোয়া করে না। এই লোকটার পা টিপে দেবে না। রাজ্যির ধুলোকাদা লেগে আছে পায়ে, এতখানি পথ হেঁটে।
সে মাথা নেড়ে বলল, না ঠাকুর, আমায় মাফ করবেন। আমি আমার বাবার পা টিপতে পারি, আর কারুর নয়।
বাবাজি ছড়ানো পা দুটো টেনে নিলেন। রতন দেখল তাঁর চোখ দুটো যেন আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলে উঠল।
কী বললি? আবার বল তো!
রতন আবার বলল। এবার আরও স্পষ্ট করে। তার ভয় কেটে গেছে। যতবড় সাধুই হোককী আর করতে পারে? এ তো দুর্বাসা মুনি নয় যে অভিশাপ দেবে!
আমি কে জানিস? এবার বাবাজি জিজ্ঞেস করলেন।
রতন চুপ।
আমি তোর কী করতে পারি জানিস? বাবাজি আবার জিজ্ঞেস করলেন। তোর ভবিষ্যৎ আমার হাতের মুঠোয়। আমি বিপুলানন্দ তান্ত্রিক। আমি ত্রিকালজ্ঞ। আমার তেজে চরাচর ভস্ম হয়ে যায়। আমাকে অপমান করার সাহস হল তোর?
রতন এখনও চুপ। সে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে বাবাজির দিকে। বুকে সামান্য দুরু দুরু ভাব। কী করবে তাকে বাবাজি? কী করতে পারে একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে?
কিন্তু বাবাজি যে মানুষের বাড়া সে কথা রতন জানবে কী করে?
আজ অমাবস্যা, বলে চললেন বাবাজি। আজ সায়াহ্নে তুই আর মানুষ থাকবি না। তুই হয়ে যাবি রাক্ষস। আয়তনে তিনগুণ বেড়ে যাবি তুই। সভ্য সমাজে থাকা আর চলবে না তোর। তোর খাদ্য হবে বন্য পশু। আমার পদসেবা করলে তোর মঙ্গলই হত। তাতে যখন তোর এত আপত্তি তখন তোর একটু শিক্ষা হওয়াই দরকার। আমি আসি।
বাবাজি চিমটে কমণ্ডলু নিয়ে উঠে পড়লেন। রতন পাথর। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। হ্যাঁ, একটা পন্থা আছে। নরহরি খুড়োর কাছে যাওয়া। সায়াহ্ন মানে কখন? সূর্যি ডোবার আগে তো নয়। তার মানে সময় আছে অন্তত তিন ঘণ্টা।
বাবাজি ব্যোম ভোলানাথ বলে চলে গেলেন।
রতন তাঁকে বেশ কিছুদুর যেতে দিয়ে একছুটে গিয়ে পৌঁছল নরহরি জ্যোতিষীর বাড়ি।
