অমিয়কান্তি লাহিড়ী?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মানে, আপনি নিজের কথা বলছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি তরুণ বয়সে রেকর্ডে গান গেয়েছিলাম। সে রেকর্ড আমার কাছে নেই।
সে রেকর্ড তো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য।
তাই বুঝি?
তবে আমার কাছে তিনখানা আছে। দুটো শ্যামাসঙ্গীত আর একটা কীর্তন।
এবারে আমার একটা অনুরোধ আছে।
কী?
এই তিনখানার অন্তত একখানা যদি আমাকে দুদিনের জন্য ধার দেন তা হলে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ বোধ করব। আমি রেকর্ডের যতটা যত্ন করা দরকার ততটা করব, এবং অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেব কথা দিচ্ছি।
তা আপনি যখন চাইছেন তখন দিচ্ছি–যদিও এমনিতে আমি রেকর্ড ধার দিই না।
এবার ভদ্রলোক একটা আলমারি থেকে বাক্সের পর বাক্স রেকর্ড বার করতে আরম্ভ করলেন। প্রত্যেকটি বাক্সের গায়ে তার ভিতর কী রেকর্ড আছে তা লেখা রয়েছে। পাঁচ নম্বর বাক্সে বেরোল অমিয়কান্তি রেকর্ড। তার মধ্যে একটি রণ্টুর দাদু নিয়ে নিলেন। তারপর বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যকে ভালভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বাড়িমুখো রওনা দিলেন।
কই, রণ্টু কোথায়? বাড়ি এসে হাঁক দিলেন অমিয়কান্তি। রণ্টু তার পড়ার ঘরে পড়ছিল, সে দাদুর ডাক শুনে বেরিয়ে এল।
এটা দ্যাখনামটা ভাল করে পড়ে দ্যাখ।
রন্টু রেকর্ডটা হাতে নিয়ে লেবেলে নাম দেখে বলল, সত্যিই তো! তুমি তা হলে ইয়াং বয়সে গান গাইতে?
কীরকম গাইতুম সেটা শুনে দ্যাখ।
সেই ঘরেই গ্রামোফোন ছিল, রণ্টু রেকর্ডটা চালিয়ে দিল। দরাজ সুরেলা গলায় গাওয়া শ্যামাসঙ্গীতে ঘরটা ভরে গেল। রণ্টু অবাক হয়ে দাদুর দিকে চাইল। দাদুর ঠোঁটের কোণে হাসি।
কী? বিশ্বাস হল?
রণ্টুর অবাক ভাবটা যায়নি; তবু সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তারপর বাবা-মাকে খবরটা দিতে বাড়ির ভিতরে ছুটে গেল।
পরদিন বিকেলে অমিয়কান্তি বাগবাজারে গেলেন রেকর্ডটা ফেরত দিতে। ভটচাষ মশাই রেকর্ডটা হাতে নিয়ে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন।
আপনি পেনেটি ছাড়লেন কবে?
পেনেটি? সেখানে তো আমি কোনওদিন ছিলাম না।
তা হলে এই রেকর্ডের অমিয়কান্তি আপনি নন। ইনি পেনেটির এক জমিদার বাড়ির ছেলে। শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে খুব নাম করেছিলেন।
রন্টুর দাদুর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
বাড়ি ফিরে এসে রণ্টুকে তিনি ব্যাপারটা বলেই ফেললেন।
কাল যে রেকর্ডটা শুনলি, সেটা আমার গাওয়া নয়; আমারই নামের আরেকজন গাইয়ের।
রণ্টু খুব বেশি অবাক হল না। বলল, আমি জানতাম তুমি বানিয়ে বানিয়ে বলছ। তুমি এককালে গান গাইলে এখনও মাঝে মাঝে গুনগুন করতে।
ঘটনাটা আর এগোলো না। রণ্টুর দাদু দুঃখটা কোনওরকমে সামলে নিলেন।
এর পর দুমাস কেটে গেছে। অমিয়কান্তির অতীতের টুকরো টুকরো স্মৃতি ফিরে আসে যখন তিনি রাত্রে বিছানায় শোন। আজও তাই হল। সবে তন্দ্রার ভাব আসছে, এমন সময় বায়স্কোপের ছবির মতো। একটা দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে হেদোর ধারে দাঁড়িয়ে তাঁর বন্ধু মোহিতলালের সঙ্গে কথা হচ্ছে। মোহিত বলছে, সেনোলাও রাজি হল না।
তা হলে আর কোন কোম্পানি বাকি রইল? হিজ মাস্টারস ভয়েস, টুইন, কোলাম্বিয়া, ওডিয়ন–সবাই-এর সঙ্গেই তো তুই কথা বলেছিস?
হ্যাঁ। আমি বলেছিলাম তোকে যে, ওস্তাদি গানের বাজার ভাল না। আর বাঙালি হিন্দু ওস্তাদকে কেউ পাত্তা দেয় না। তুই মুসলমান হলে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যেত। আর তা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার আছে।
কী?
তোর নামে আরেক গাইয়ের রেকর্ড বাজারে বেরিয়েছে। সে শ্যামাসঙ্গীত গায়। ভাল বিক্রি। এক নামে দুজন গাইয়ে একসঙ্গে বাজারে চালানো খুব মুশকিল।
বুঝেছি।
অমিয়কান্তি বাধ্য হয়ে ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর আর গান রেকর্ড করা হয়নি।
এই স্মৃতির কথাটা কি তিনি রণ্টুকে বলবেন?
অনেকে ভেবে অমিয়কান্তি নাতিকে কিছু না বলাই স্থির করলেন। সে হয়তো বিশ্বাসই করত না। আসল কথা হল এই যে, তিনি এককালে ওস্তাদি গান গাইতেন–তা সে ভালই হোক আর মন্দই হোক।
অর্থাৎ আজ যে রণ্টু গাইতে পারে তার একটা কারণ হল তার দাদু। এটা ভেবেই অমিয়কান্তির বুকটা খুশিতে ভরে উঠল।
শুকতারা, শারদীয়া ১৩৯৬
রতন আর লক্ষ্মী
ঠিক কখন থেকে রতনের মনটা খুশিতে ভরে আছে সেটা রতন জানে। দশদিন আগে ছিল চৈত্র সংক্রান্তি। রতন থাকে শিমুলিতে। সেখান থেকে চার ক্রোশ দূরে উজলপুরে সংক্রান্তির খুব বড় মেলা হয়। রতন গিয়েছিল সেই মেলা দেখতে। শুধু দেখতে নয়, মেলা থেকে বাঁশের বাঁশি কেনার শখও ছিল। তার, সেটাও একটা উদ্দেশ্য বটে। রতনের গানের কান খুব ভাল; যে কোনও গান দুবার শুনলে নিজের গলায় তুলে নিতে পারে। সে বাঁশিও বাজায়, কিন্তু ভাল বাঁশি তার নেই। জমজমাট মেলার এক জায়গায় নানারকম বাজনা বিক্রি হচ্ছিল, তার মধ্যে বাঁশিও ছিল অনেক, রতন তারই কয়েকটা হাতে তুলে ফুঁ দিয়ে দেখছিল, এমন সময় চারদিকে একটা শোরগোল পড়ে গেল। উজলপুরের রাজকন্যা লক্ষ্মী এসেছেন ডুলিতে করে মেলা দেখতে। এমনিতে রাজকন্যারা রাজবাড়ির অন্তঃপুরেই বন্দি থাকে, তাকে বাইরের লোকে দেখতে পায় না। কিন্তু লক্ষ্মী তেমন মেয়ে নয়। সে অনেক আগে থেকেই বাপ-মাকে শাসিয়ে রেখেছে-সংক্রান্তির মেলা আসছে, আমি কিন্তু তাতে যাব। ওসব পর্দাটা মানতে পারব না। লোকে আমাকে দেখলে ক্ষতি কী? তারাও মানুষ, আমিও মানুষ; আর তারা তো আমায় খেয়ে ফেলবে না। আমি ডুলিতে করে যাব। আমার কেষ্টনগরের মাটির পুতুলের খুব শখ; সেই পুতুল আমি নিজে দেখে কিনতে চাই। তোমরা না করতে পারবে না।লক্ষ্মী বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান, তাই তার আবদার না রেখে উপায় নেই।
