কী রে রত্না–এই অসময়ে? কী ব্যাপার?
খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি নরহরি খুড়ো!
কী বিপদ?
সেটা আর খুলে বলা যাবে না। আপনি একটু শুনে যদি বলেন আমার সামনের কটা দিন কেমন যাবে!
রতনের গানের গলা আর মিষ্টি স্বভাবের জন্য গাঁয়ের সকলেই তাকে স্নেহ করে। নরহরি জ্যোতিষী এমনিতে একটু খিটখিটে মানুষ, কিন্তু রতনের দিশাহারা ভাব দেখে তার অনুরোধ ঠেলতে পারলেন না।
দাঁড়া দেখি। তোর করকোষ্ঠী আমিই করেছিলাম, তাই না?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কর্কট রাশি, কৃষ্ণ পক্ষ….হুঁ…
নরহরি জ্যোতিষী কাগজে কিছুক্ষণ হিজিবিজি কাটলেন, তারপর হঠাৎ ভয়ানক গম্ভীর হয়ে রতনের দিকে চেয়ে বললেন, এ যে মহাসংকট! তোর উপর তো শনির দৃষ্টি পড়েছে দেখছি। সামনের কটা দিন তো ঘোর দুর্বিপাকের সময় রে রতন!
কিন্তু তার পরে? ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল রতন।
নরহরি জ্যোতিষী আবার নকশার দিকে চেয়ে কিছুক্ষণ কুটি করে রইলেন। তারপর তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা দিল। তিনি তিনবার পর পর বাঃ! বলে বললেন, সব মেঘ কেটে যাবে। শনি সরে গিয়ে বৃহস্পতি উঠবে তুঙ্গে। তোর কষ্ট থাকবে না, অভাব থাকবে না, কিচ্ছু থাকবে না।
কিন্তু সেটা কদিন পরে নরহরি খুড়ো?
বেশি দিন নয়, বেশিদিন নয়। এক পক্ষকাল। আজ অমাবস্যা। পূর্ণিমায় দেখবি মেঘ কেটে গেছে। বুঝেছিস?
রতন বুঝল।
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিমে নামতে শুরু করেছে, তাই রতন আর থাকতে পারল না। নরহরি খুডোর কাছে ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার করে জেনে নিতে পারলে ভাল হত, কিন্তু তার আর উপায় নেই। মোটামুটি যা জানবার তা রতন জেনে নিয়েছে। কিছুদিনের জন্য তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। অভিশাপের কথা মা বাবাকে বলবে না। তারপর আবার কপাল ফিরলে সে বাড়ি ফিরবে।
বাড়ি ফিরে এসে রতন দেখল তার বাপও ফিরেছে। বাপ-মা দুজনকেই একসঙ্গে পেয়ে রতন বলল, তাকে দু হপ্তার জন্য নারানপুর যেতে হচ্ছে। সেখানে এক নামকরা গাইয়ে এসেছেন, তাঁর কাছে থেকে যদি কিছু শেখা যায় তার চেষ্টা দেখবে রতন।
ছেলের যে গানের নেশা এটা তার বাপ-মা দুজনেই জানে। কাজেই তাকে এ ব্যাপারে নিরস্ত করার চেষ্টা বৃথা। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুজনকে মত দিতে হল। রতন লাঠির আগায় একটা পোঁটলা বেঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
গাঁয়ের পশ্চিমপ্রান্তে ঝলসির বন, সেটা পেরোলেই দিগনগর। ঝলসির বনে রতন গেছে একবারই, কারণ সেখানে অনেক জানোয়ারের বাস। প্রায় তিনশো বছর আগে ঝলসি ছিল এক সমৃদ্ধ শহর; তখন তার নাম ছিল আজিনগড়। এই আজিনগড়ের ভাঙা কেল্লা দেখতেই রতন গিয়েছিল তার দুই বন্ধু সুবল আর মুকুন্দর সঙ্গে। বিশাল কেল্লা, কিন্তু তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। সাপ-বিচ্ছুর বাস বলে আর ভিতরে কেউ যায় না, আর রতন সেখানেই থাকবে বলে মনস্থির করেছে। একটা ডেরা তার চাই; লোকের কাছ থেকে গা ঢাকা দিতে হবে তো!
রতন বনের ধারে গিয়ে একটা ছোট নদী থেকে আঁজলা করে জল নিয়ে খেল। অনেকখানি পথ, বেশ জলপিপাসা পেয়েছিল। এখনও সূর্য ডুবতে এক ঘণ্টা দেরি। বাবাজির কথা যদি ফলেই যায়, তা হলেই সে কেল্লায় গিয়ে ঢুকবে। না হলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বাড়ি ফিরে যাবে; বলবে, ওস্তাদ ছাত্র নিতে নারাজ তাই সে বাড়ি ফিরে এল।
কিন্তু রতনের মন বলছে বাবাজির কথা ফলবে; কারণ এর মধ্যেই তার শরীরের ভিতরে কতকগুলো লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। হাড়ে কেমন যেন টান টান ভাব। সঙ্গে পোঁটলায় চিড়ে বাঁধা ছিল, কিন্তু সেটা আর খেতে ইচ্ছা করছে না; অথচ একটা খিদের ভাব রয়েছে, কিন্তু তার জন্য যেন চাই অন্য খাদ্য।
বনের মধ্যে ক্রমে অন্ধকার হয়ে আসছে। সূর্য এখন দূরের গাছপালার ঠিক মাথার উপর নেমে এসেছে। রতন তার নিজের হাত-পায়ের দিকে চেয়ে দেখল। এত লোম তো তার ছিল না!
আর নখও তো এত ধারালো ছিল না!
সামনে একটা শুয়োর। দাঁতাল বুনো শুয়োর। বন থেকে বেরিয়ে একটা খোলা জায়গায় এসে তার দিকে চেয়ে দেখছে একদৃষ্টে।
রতন একটা আমলকী গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিল। গাছের ডাল ছিল তার মাথার চেয়ে প্রায় দশ হাত উপরে। হঠাৎ রতন বুঝল ডালটা যেন ক্রমে কাছে এগিয়ে আসছে।
শুয়োরটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। রতনের দিকে চেয়ে একটা চাপা গর্জনের মতো শব্দ করল। তারপর উলটো দিকে ঘুরে ছুটে পালাল।
রতন দেখল যে, তার মাথা আমলকী গাছের ডাল ছাড়িয়ে উপরে উঠেছে। তার মুখ সে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু গালে হাত দিয়ে বুঝল সেখানেও লোম।
এবার রতন বড় বড় পা ফেলে জঙ্গল ভেদ করে রওনা দিল আজিনগড়ের কেল্লার উদ্দেশে।
.
০২.
আজিনগড়ের কেল্লায় যে একটা রাক্ষস এসে বাস করছে, সে খবর শিমুলির লোকে শুনেছে রামদাস কাঠুরের কাছ থেকে। রামদাস কাঠ কাটতে গিয়েছিল ঝলসির বনে। দিনের আলো থাকতে থাকতেই গিয়েছিল যাতে বাঘের খপ্পরে না পড়তে হয়। কেল্লার কাছাকাছি এসে একটা বারো হাত উঁচু দু-পেয়ে প্রাণী দেখতে পেয়ে সে চম্পট দেয়। প্রাণীটার সর্বাঙ্গে লোম, হাতপায়ের নখ বড় বড়, দু পাশের দাঁতগুলো জানোয়ারের মতো ছুঁচোলো আর বড়, চোখ দুটো লাল, আর মাথাভর্তি জটপাকানো চুল।
রামদাস এই বর্ণনা দেবার পর থেকে ঝলসির বনের ধারেকাছে আর কেউ যায় না। এই দানবের ভয়ে সারা শিমুলি গাঁ কাঁপতে শুরু করেছে, যদিও এটাও ঠিক যে, মানুষের কোনও অনিষ্ট এই রাক্ষস এখন অবধি করেনি।
