বারতিনেক চিবোবার পর ফলের রস খাদ্যনালীতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝলেন এ একেবারে দেবভোগ্য ফল। এর সঙ্গে অন্য কোনও ফলের সাদৃশ্য নেই। তুলনাও নেই।
একটি আস্ত ফল শেষ করতে পাঁচ মিনিট লাগল নিশিকান্তবাবুর। তখন রাত পৌনে এগারোটা।
ঘুমোনোর কোনও প্রশ্ন ওঠে না। একে তো আবিষ্কারের উত্তেজনা, তার উপর একটা সংশয় আছে–ফলে যদি কোনও অনিষ্ট হয় সেটা হয়তো রাতারাতিই জানা যাবে।
নিশিকান্তবাবু ঘন ঘন নিজের নাড়ি টিপে দেখতে লাগলেন। চেহারায় কোনও অনিষ্টের ছাপ পড়ছে কিনা জানার জন্য আধঘণ্টা অন্তর অন্তর দেয়ালে টাঙানো আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। শেষটায় মাঝরাতেই ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পায়চারি করে শরীরে মাংসপেশিগুলো সব ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা পরীক্ষা করে দেখলেন।
পাঁচটার ঠিক পরে যখন ভোরের প্রথম পাখি ডাকতে শুরু করেছে, তখন নিশিকান্তবাবু উপলব্ধি করলেন যে তাঁর কোমরের বাত সম্পূর্ণ সেরে গেছে, এবং এমন সুস্থ তিনি গত ত্রিশ বছরের মধ্যে কখনও বোধ করেননি।
.
০২.
ম্যাকেঞ্জি ফলের এই আশ্চর্য স্বাদ তিনি একাই ভোগ করবেন এটা নিশিকান্তবাবুর কাছে ন্যায্য বলে মনে হল না। সেইসঙ্গে তিনিই যে ফলের সন্ধান পেয়েছেন এবং তিনিই যে প্রথম এই ফল খেয়ে দেখেছেন সেটা তো জানানো দরকার। বন্ধুর এ ব্যাপারে কোনও উৎসাহ নেই সেটা নিশিকান্তবাবু ভালভাবেই জানেন। ব্যাপারটা কোনও গণ্যমান্য ব্যক্তির গোচরে আনা উচিত এটা মনে করে জ্ঞান চৌধুরীর নামটাই সবচেয়ে আগে মনে পড়ল। মানুষে মানুষে রুচিভেদ হয় এটা নিশিকান্তবাবু জানেন, কিন্তু এমন সুস্বাদু ফল কারুর খারাপ লাগতে পারে এটা যেন তাঁর বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই একটি ফল সঙ্গে নিয়ে তিনি গেলেন চৌধুরী নিবাসে।
বৈঠকখানায় জ্ঞানবাবুর সঙ্গে একটি অবাঙালি ভদ্রলোককে দেখে কিছুটা দমে গেলেও, নিশিকান্তবাবু ভণিতা না করে তাঁর আসার কারণটা জানিয়ে দিয়ে থলি থেকে ফলটা বার করে চৌধুরী মশাইয়ের সামনে টেবিলে উপর রাখলেন।
নাম জানলেন এ ফলের? জ্ঞান চৌধুরী প্রশ্ন করলেন। নিশিকান্তবাবু জানালেন রয়্যাল বোটানিক্যাল সোসাইটি পর্যন্ত ছবি দেখে ফলটাকে চিনতে পারেনি।–আপনি খেয়ে দেখুন, অতি সুস্বাদু ফল।
জ্ঞানবাবু আপত্তি করলেন না, তবে কামড় দিয়ে না খেয়ে চাকরকে ডেকে ছুরি আর দুটো প্লেট আনিয়ে নিজে এক টুকরো নিয়ে এক টুকরো দিলেন অন্য ভদ্রলোকটিকে। খাওয়ার পর দুজনের মুখের ভাব দেখে নিশিকান্তবাবুর মন খুশিতে ভরে গেল।
এ যে অতি সুস্বাদু মশাই! বললেন জ্ঞানবাবু।
ওয়ান্ডারফুল! বললেন অন্য ভদ্রলোকটি। ডিলিশাস! ইয়ে ফল কোথায় মিলল?
নিশিকান্তবাবু সরল মনে সবকিছুই বলে দিলেন। এমনকী তাঁর বাত সেরে যাওয়ার ব্যাপারটা পর্যন্ত।
ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট? এ কি আপনি দিলেন নাম? অবাঙালি ভদ্রলোকটি জিজ্ঞেস করলেন।
নাম তো একটা দেওয়া দরকার, বললেন নিশিকান্তবাবু। এ ছাড়া আর কিছু মনে পড়ল না।
নামটা যে বেশ জবরদস্ত হয়েছে সেটা দুই ভদ্রলোকই স্বীকার করলেন। আর বেশি কথা না বাড়িয়ে দুজনকেই নমস্কার জানিয়ে নিশিকান্তবাবু বিদায় নিলেন।
চৌধুরী নিবাস থেকে রাস্তায় বেরিয়ে নিশিকান্তবাবু ভারী প্রসন্ন বোধ করলেন। একটা কীর্তি রেখে যেতে চলেছেন তিনি। এমন যে হবে সেটা তাঁর এই বাষট্টি বছরের জীবনের ঘটনা থেকে কারুর বোঝার সাধ্যি ছিল কি? না, ছিল না। মাঝারি মানুষের মাঝারি জীবন তাঁর। আর লক্ষ লক্ষ মাঝারি জীবনের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই। কিন্তু আজ তিনি অনন্য, শুধু বাঙালিদের মধ্যে নয়, নিজ-দেশবাসীদের মধ্যে নয়, সারা পৃথিবীর মধ্যে।
কিন্তু কীর্তির শেষ তো এখানেই না। এই ফল যদি দশজনের হাতে তুলে দেওয়া যায় তবেই না। কীর্তি! ফলের ব্যাপক চাষ হলে দেশের লোকের যে কত উপকার হবে সেটা ভাবতেই নিশিকান্তবাবুর বুক দশহাত হয়ে গেল। ফলের বীজ তো আছে তাঁর কাছে! হালকা বেগুনি শাঁসের ভিতর কালো রঙের বীজ। সেটা পুঁতলে গাছ হবে না কী? তাঁর বাড়ির পিছনদিকে লাউ মাচার পাশে তো খানিকটা জমি রয়েছে। সেখানে পরীক্ষা করে দেখতে ক্ষতি কী?
কিন্তু সে-গুড়ে বালি। বিচি পুঁতে জলটল দিয়ে কোনও ফল হল না। সাতদিন অপেক্ষা করেও অঙ্কুরের কোনও চিহ্ন দেখতে পেলেন না নিশিকান্তবাবু।
ইতিমধ্যে ফলের আশ্চর্য গুণের আরও পরিচয় পেয়েছেন তিনি। পড়শি অবনী ঘোষের আট বছরের ছেলে ভুতো তাঁর কাছে মাঝে মাঝে অঙ্ক দেখাতে আসে। তার ফ্যারিনজাইটিস সেরে গেছে ফল খেয়ে। পাড়ার একটা ঘেয়ো কুকুর তারকবাবুর বাড়ির রাস্তার দিকের বারান্দার সামনে এসে রোজ ঘুরঘুর করে। নিশিকান্তবাবু তাকে ফলের একটা টুকরো খেতে দেওয়ায় দুদিন পরে দেখলেন তার ঘা শুকিয়ে গেছে। এমনকী বন্ধুকে না বলে তার চায়ে এক চামচ ম্যাকেঞ্জির রস মিশিয়ে দেওয়ার ফলে ভদ্রলোকের দশদিনের বসা সর্দি একদিনে হাওয়া।
কিন্তু শুধু করিমগঞ্জের লোকেরাই ফলের কথা জানবে, বাইরের আর কেউ জানবে না, এটা কি হয়? জ্যোতিপ্রকাশবাবুর তোলা একটা ছবি এখনও আছে নিশিকান্তবাবুর কাছে। ইংরিজিতে ফুলস্ক্যাপের চার পাতা একটি প্রবন্ধ লিখে ছবি সমেত স্টেটসম্যান পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলেন তিনি। প্রবন্ধের নাম এ ওয়ান্ডারফুল নিউ ফুট। বলা বাহুল্য, তিনি নিজেই ফলের আবিষ্কর্তা সেটা বেশ পরিষ্কার ভাবে লিখে দিলেন নিশিকান্তবাবু। এ অবস্থায় আত্মপ্রচারের লোভটা সামলানো কি সহজ কথা?
