জ্যোতিপ্রকাশ বিনা বাক্যব্যয়ে আরও দুখানা ছবি তুলে দিলেন নিশিকান্তবাবুকে।
ছবির সঙ্গে তাঁর কলেজলব্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভর করে নিশিকান্তবাবু গাছের একটি বর্ণনা দিয়ে প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক বিনয় সোমের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
সাতদিনের মধ্যে উত্তর এসে গেল।
বিনয় সোম জানালেন, এমন গাছ তিনি কখনও দেখেননি।
কিন্তু নিশিকান্তবাবু সহজে ছাড়বার পাত্র নন। বর্ণনা সমেত আরেকটি ছবি তিনি পাঠালেন ইংল্যান্ডের রয়েল বোটানিক্যাল সোসাইটিতে। জ্ঞানবাবুর বাড়িতেই হুইটেকারস অ্যালম্যানাক ছিল, তাতেই পাওয়া গেল সোসাইটির ঠিকানা। উত্তর আসতে লাগল তিন সপ্তাহ।
সোসাইটির পক্ষ থেকে মর্টিমার সাহেব জানিয়েছেন যে, ফল সমেত গাছের যে ছবি পাঠানো হয়েছে। তাতে যদি কোনও কারচুপি না থাকে তা হলে বলতেই হবে যে, গাছটির জাত অজ্ঞাত।
এরপর যেটা ঘটল তাতে নিশিকান্তবাবুর চরিত্রের আরেকটি দিকের পরিচয় পাওয়া যায়। সেটা হল তাঁর ভাবুক দিক। একদিন রাত্রে বিছানায় শুয়ে নিশিকান্তবাবু ভাবলেন–এই যে মানুষ এতরকম শাকসজি ফলমূল শস্যকে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করছে, এর শুরু হল কবে? আম জাম কলা কমলা পেঁপে পেয়ারা এসব কে বা কারা প্রথম খেল, এ-কথা তো ইতিহাসে লেখে না। অমুক ফল সুস্বাদু, অমুক খাদ্য পুষ্টিকর–এসব কে কবে আবিষ্কার করল? এর মধ্যে এমনও তো অনেক কিছু আছে, যা মানুষের খাদ্য নয়, যা খেলে মানুষের অনিষ্ট হতে পারে। কয়েক শ্রেণীর ব্যাঙের ছাতা আছে। যা মানুষের পক্ষে মারাত্মক সেটা যে খাওয়া চলে না সেটাও তো একদিন মানুষকে খেয়েই বুঝতে হয়েছিল।
শাস্ত্রে যাবতীয় খাদ্যের গুণাগুণ লেখা আছে, কিন্তু শাস্ত্র লেখা হয়েছে এই তো সেদিন–মানুষ সভ্য হবার অনেক পরে। তার লক্ষ লক্ষ বছর আগেই তো সেসব খাদ্য মানুষ খেতে শুরু করে দিয়েছে। ইতিহাসে এমন একটিও নজির আছে কি যেখানে বলা হয়েছে অমুক ফল অমুক শস্য আজ প্রথম অমুক ব্যক্তি খেয়ে সেটাকে খাদ্য বলে প্রমাণ করল?
এইসব চিন্তা থেকেই নিশিকান্তবাবু একদিন স্থির করলেন যে, এই নতুন ফল–যার নাম তিনি দিয়েছেন ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট–তাঁকে খেয়ে দেখতে হবে। তাঁর এই সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তিনি বন্ধুকে কিছু বললেন। কারণ বললে তিনি হয় ঔদাসীন্য প্রকাশ করবেন, না হয় হাঁ হাঁ করে উঠবেন। দুটোর কোনওটাই নিশিকান্তবাবু চান না।
এই সিদ্ধান্ত নেবার পরদিনই নিশিকান্তবাবু প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে সোজা চলে গেলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানে।
মনে একটা সংশয় ছিল যে দেখবেন গাছে ফল নেই, সব ঝরে পড়েছে, কিন্তু গিয়ে দেখলেন ফলের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে বেশি। নিশিকান্তবাবু ঝোলা নিয়ে গিয়েছিলেন, টসটসে দেখে তিনটি ফল পেড়ে তাতে পুরে বাড়িমুখো হলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন তাঁর হৃৎস্পন্দনের মাত্রা সাধারণ অবস্থার চেয়ে বেশ খানিকটা দ্রুত। আজ তিনি যা করতে চলেছেন সেটা পৃথিবীতে আর কেউ কোনওদিন করেনি।
কিন্তু তাই কি?
গাছটা তো ছিল ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানে। তিনি নিজে কি এ ফল কোনওদিন খেয়ে দেখেননি?
এই নতুন প্রশ্নটা সাময়িকভাবে নিশিকান্তবাবুর সমস্ত উৎসাহকে ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিল। কে দিতে পারে এই প্রশ্নের উত্তর? ম্যাকেঞ্জি সাহেবের সঙ্গে করিমগঞ্জের কারুর ঘনিষ্ঠতা ছিল কিনা সেটা আগে জানা দরকার, তারপর ফল ভক্ষণ!
উত্তর মিলল তারকবাবুর কাছে।
ম্যাকেঞ্জি বিশেষ মিশতেন টিশতেন না কারুর সঙ্গে বললেন তারকবাবু। তবে শিবশরণ উকিলের সঙ্গে সাহেবকে ঘুরতে দেখেছি বারকয়েক। বোধহয় সাহেবের কোনও মামলার সূত্রে দুজনের আলাপ হয়।
শিবশরণ মিত্র ব্যাপারটাকে অনেক সহজ করে দিলেন। বললেন, মামলা নয়। তাঁরও বাগানের শখ, আমরাও বাগানের শখ, আর এই সূত্রে আমাদের আলাপ। তেতাল্লিশ রকম গোলাপ ছিল আমার বাগানে। সাহেব দেখে খুব তারিফ করেছিলেন।
নিশিকান্তবাবু ভরসা পেয়ে ঝোলা থেকে ফল বার করলেন।
এই ফল কি ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানে দেখেছেন কখনও?
শিবশরণবাবুর ভুরু কুঁচকে গেল।
সাহেবের বাগানে ছিল এই ফল?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কোনখানটায়?
নিশিকান্তবাবু বর্ণনা দিলেন।
কাছাকাছি একটা বাজে ঝলসানো আমলকী গাছ আছে কী? প্রশ্ন করলেন শিবশরণবাবু।
তা আছে। মনে পড়েছে নিশিকান্তবাবুর। এই অজানা গাছটার পুবদিকে হাত দশেক দূরে।
তার মানে মেমসাহেব যেখানে মারা গিয়েছিলেন ঠিক সেইখানেই এই গাছ, বললেন শিবশরণ উকিল। তবে সাহেব থাকাকালীন এ গাছ ছিল না। থাকলে আমার চোখে পড়ত। ও বাগানে সাহেবের সঙ্গে অনেক ঘুরিছি আমি।
হাঁফ ছাড়লেন নিশিকান্তবাবু। পায়োনিয়ার হবার পথে তাঁর আর কোনও বাধা নেই। তিনিই হবেন ম্যাকেঞ্জি ফ্রুটের প্রথম ভক্ষক।
সেই রাত্তিরে নিতাই ঠাকুরের রান্না চচ্চড়ি, মুসুরির ডাল, লাউঘণ্ট আর ট্যাংরা মাছের ঝোল খেয়ে বন্ধুর সঙ্গে উত্তরের বারান্দায় বসে আধঘণ্টাখানেক গল্প করে নিশিকান্তবাবু চলে এলেন নিজের ঘরে। বিকেল থেকেই মেঘ করেছিল, দশটা নাগাদ বজ্রবিদ্যুৎ সহ বেশ জাঁকিয়ে বৃষ্টি নামল। নিশিকান্তবাবু ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে কুঁজো থেকে এক গেলাস জল ঢেলে নিয়ে খাটের পাশে টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর একটি ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট হাতে নিয়ে দেয়ালে টাঙানো পরমহংসদেবের ছবিটা উদ্দেশ করে একটা নমস্কার ঠুকে শরীরটাকে টান করে হাতের ফলে কামড় দিলেন।
