সাতদিন বাদে একটি বছর পঁচিশেকের যুবক তাঁর বাড়িতে এল দেখা করতে। ইনি অঞ্জন সেনগুপ্ত, স্টেটসম্যানের রিপোর্টার। স্মার্ট চেহারা, চোখে পুরু চশমা, সঙ্গে ক্যামেরা ও টেপরেকর্ডার। নিশিকান্তবাবু যে ফলটার কথা লিখেছেন সেটা সম্বন্ধে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে পাঠানো হয়েছে তাঁকে।
নিশিকান্তবাবু খুশি হলেন। এই তো চাই। এটাই তো আশা করছিলেন তিনি।
আমার লেখাটা যাচ্ছে তো? নিশিকান্তবাবু প্রশ্ন করলেন।
লেখার চেয়ে, মানে, সাক্ষাৎকারটা আজকাল লোকে পছন্দ করে বেশি, বললেন অঞ্জন সেনগুপ্ত। ইয়ে, আমি কি গাছটা একবার দেখতে পারি?
নিশ্চয়ই পারেন, বললেন নিশিকান্তবাবু, তবে মাইলখানেক হাঁটতে হবে।
দুজনে মিলে বেরিয়ে পড়লেন ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানের উদ্দেশে। দিনদশেক যাওয়া হয়নি বাগানে। শেষ যেদিন গেছেন সেদিনও নিশিকান্তবাবু দেখেছেন গাছ ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। এ ফলের কি তা হলে সিজন নেই? সারা বছরই কি গাছে ফল ফলে? যাবার পথে এইসব প্রশ্ন নিশিকান্তবাবুর মনে ঘুরছিল।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! যে বাগানে তিনি ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করেনি গত কয়েক মাস–এক ক্যামেরা নিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ চৌধুরী ছাড়া–সেখানে আজ এত লোক কেন?
দুজন লোককে চিনতে পারলেন নিশিকান্তবাবু–জ্ঞানপ্রকাশ চৌধুরী ও তাঁর ঘরে সেদিন যে অবাঙালি ভদ্রলোকটি ছিলেন, তিনি। আজ তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন জ্ঞানবাবু।
এঁকে সেদিন দেখেছেন আপনি। ইনি হচ্ছেন চুনিলাল মানসুখানি। আপনার দেওয়া সেই ফলটি খেয়ে অবধি এঁর মাথায় নানান ফন্দি খেলছে।
তাই বুঝি?
নিশিকান্তবাবুর বুকের মধ্যে কেন জানি দুরু দুরু আরম্ভ হয়ে গেছে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে সেটা তিনি বেশ বুঝতে পারছেন।
ওই ফলের চাষ করার ইচ্ছে মিঃ মানসুখানির। ব্যবসাদার মানুষ তো, নতুন ব্যবসার সুযোগ পেলে ওঁকে সামলানো দায়!
নিশিকান্তবাবু কথাটা না বলে পারলেন না।
কিন্তু আমি বীজ পুঁতে দেখেছি। চারার কোনও লক্ষণ দেখিনি।
মানসুখানি হেসে উঠলেন। গাছ শুধু এই বাগানের মাটিতেই জন্মায়। ওই দেখুন–সাতদিন আগে পোঁতা বীজে কেমন চারা গজিয়েছে।
নিশিকান্তবাবু অবাক হয়ে দেখলেন আগের গাছটা থেকে হাতদশেক ডাইনে একটি সতেজ গাছের চারা, পাতা দেখে তাকে চিনতে কোনও অসুবিধা হয় না।
সাংবাদিক অঞ্জন সেনগুপ্ত জোর খবরের গন্ধ পেয়ে নিশিকান্তবাবুকে ছেড়ে মানসুখানিকে ধরেই ইন্টারভিউ করে নিয়ে গেলেন। নিশিকান্তবাবুর প্রবন্ধের বদলে সেই ইন্টারভিউটাই বেরোলো কাগজে।
ছমাসের মধ্যে ম্যাকেঞ্জি ফলের গাছে ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগান ভরে গেল। এক মাসের মধ্যে জ্ঞান চৌধুরীর সঙ্গে পার্টনারশিপে মানসুখানির ব্যবসা চালু হয়ে গেল। মাত্র একশো বাষট্টিটা গাছ। কিন্তু তা থেকে ফল পাওয়া যায় সারা বছর ধরে। ইতিমধ্যে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে জানা গেছে ফলে সাতরকম ভিটামিন আছে, এবং সেইসঙ্গে আরও এমন কিছু আছে, যার সঙ্গে রাসায়নিকদের এখনও পরিচয় হয়নি।
স্বাদ গন্ধ উপকারিতা ও দুষ্প্রাপ্যতার জন্য ফলের দাম হল আকাশ-ছোঁয়া। এক-একটি টিনে দুটুকরো করে কাটা সংরক্ষক রসে ভাসমান চারটি করে খোসা ছাড়ানো বীজবিহীন ফল। প্রতি টিনের দাম ভারতীয় টাকার হিসেবে সাড়ে তিনশো। দেশের লোক সে ফলের শুধু নামই শুনেছে, তাদের ঘরে সে ফল পৌঁছয় না, কারণ সব ফল চলে যায় জাপান, ইউরোপ ও আমেরিকায়। ফলের খ্যাতি সারা বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু বহু চেষ্টা সত্ত্বেও ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানের বাইরে সে। ফল গজানো সম্ভব হয়নি।
যেমন বাগানে, তেমনই করিমগঞ্জের লাগোয়া বীরসিংহপুরে, ফল যেখানে টিনে ভরা হয় সেই কারখানায় পুলিশের কড়া বন্দোবস্ত করা হয়েছে। বাগানের চারপাশ ঘিরে নতুন পাঁচিল উঠেছে, দেখে মনে হয় জেলখানার পাঁচিল। বাংলো ভেঙে মানসুখানির ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট কোম্পানির আধুনিক অফিস তৈরি হয়েছে। রোজ সকাল নটায় জার্মান মার্সিডিজ গাড়িতে ভদ্রলোককে সেই অফিসে আসতে দেখা যায়। তাঁর কয়েকজন খুব কাছের লোকও মাঝে মাঝে সেখানে আসেন, আর যাবার সময় সঙ্গে একটি করে ফলের টিন নিয়ে যান কনসেশন রেটে। এ ছাড়া অফিসের কর্মীর বাইরে আর কারুর প্রবেশাধিকার নেই।
আজ দেড় বছর হল এই ব্যবসা চালু হয়েছে। কিন্তু নিশিকান্তবাবুর হতভম্ব ভাবটা এখনও কাটেনি। অফিস খোলার দুদিন বাদে তিনি গিয়েছিলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগান দেখতে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে ঢুকতে দেয়নি। তিনি ভারী অবাক হয়ে বলেন, হাম নিশিকান্ত বোস হ্যায়–ইয়ে ফল হমারি আবিষ্কার হ্যায়–তুমহারা বাবুকো যাকে বোলো। কিন্তু সশস্ত্র দ্বাররক্ষক তাঁর কথায় কান দেয়নি। জ্ঞান চৌধুরীর বাড়িতে গিয়েও কোনও লাভ হয়নি। তিনি এখন আর যার-তার সঙ্গে দেখা করেন না।
তারক বাগচী অবশ্য এতদিনে সবই জেনেছেন। তিনি ভর্ৎসনার সুরে বন্ধুকে বলেন, তোমার বন্ধু উকিল, তুমি তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে ফস করে কতগুলো ব্যাপার করে বসলে–ধুরন্ধর লোকের মতিগতি তুমি বুঝবে কী করে? তোমাকে বোকা পেয়ে তারা যে লেঙ্গি মারবে এতে করে আশ্চর্য কী?
তবে একটি ফল নিশিকান্তবাবুর কাছে রয়ে গিয়েছিল। বীরসিংহপুরে গিয়ে একটি খালি টিন তিনি সংগ্রহ করে এনেছিলেন অনেক কষ্টে। সেই ফল তার মধ্যে তিনি রেখে দিয়েছেন। তাঁরই আবিষ্কার এই ফল, তিনিই প্রথম খেয়েছিলেন, তিনিই নামকরণ করেছিলেন ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট।
