বাগানের মধ্যে দিয়ে পাথরে বাঁধানো পথ এঁকেবেঁকে চলে গেছে। আশেপাশে ছড়ানো রয়েছে শ্বেতপাথরের স্ট্যাচু, লোহার বেঞ্চি, জল শুকিয়ে যাওয়া ফোয়ারা। শৌখিন লোক ছিলেন ম্যাকেঞ্জিরা, তাতে সন্দেহ নেই।
বাংলোর পিছন দিকটায় পৌঁছে গন্ধটা পেলেন নিশিকান্তবাবু। কোনও ফুল কিংবা ফলের গন্ধ। তবে চেনা নয়। স্নিগ্ধ মিষ্টি গন্ধ।
নিশিকান্তবাবু এগিয়ে গেলেন অনুসন্ধান করতে। শরৎকালের দিন ছোট হয়ে এসেছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে পড়বে। গন্ধের কারণটা কী সেটা তার আগেই জানা দরকার।
একটা সিংহের মূর্তি পেরিয়ে তিন পা যেতেই নিশিকান্তবাবুকে থেমে যেতে হল। সামনে বাঁয়ে একটা করবী গাছ, তার ঠিক পিছনে একটা অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গায় একটা অচেনা গাছের গায়ে পশ্চিম দিক থেকে ঢলে পড়া সুর্যের রশ্মি এসে পড়ে তার একটা দিককে যেন সোনার পাতে মুড়ে দিয়েছে।
নিশিকান্তবাবু এগিয়ে গেলেন গাছটার দিকে। গন্ধ যে এই গাছটা থেকেই আসছে তাতে সন্দেহ নেই। গাছের ফল থেকে। সাদা রঙের ফল। ওপর দিকটা গোল। তলাটা ঈষৎ ছুঁচোলো। গোল অংশটার ব্যাস একটা মাঝারি সাইজের কমলালেবুর মতো। গাছের পাতাগুলো লক্ষ করলেন নিশিকান্তবাবু। আর সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসে শেখা বটানির কিছু নামও মনে পড়ে গেল। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ, কম্পাউন্ড লিফ, অবলং, সেরেট। গাছটা দেড় মানুষ উঁচু। ফলের সংখ্যা কম করে পঞ্চাশ। তাদের গা থেকে সোনালি রোদ ক্রমে সরে যাচ্ছে, কিন্তু ফলের রঙটার যেন একটা নিজস্ব ঔজ্জ্বল্য আছে, যাতে মনে হয় অন্ধকার হবার পরও সেগুলো চোখ টানবে।
প্রায় মিনিট দশেক ধরে গাছটার এদিক ওদিক ঘুরে অবশেষে নিশিকান্তবাবুর মায়া কাটাতে হল। পোকামাকড় সরীসৃপের অভাব নেই এই পরিত্যক্ত বাগানে। এইবেলা বেরিয়ে পড়া দরকার। খালি হাতে ফিরবেন কি না? না। এই অভিনব গাছের একটি ফল সঙ্গে নেওয়া দরকার।
নিশিকান্তবাবু হাত বাড়িয়ে একটি ফল ছিঁড়ে নিয়ে বাড়িমুখো হলেন।
তারকবাবু ফলটা দেখে নিশিকান্তবাবুর মতো না হলেও, খানিকটা বিস্মিত হলেন বইকী!
এ আবার কী আনলে সঙ্গে করে?
নিশিকান্তবাবু বললেন। তারকবাবু ফলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, এ জিনিস তো কস্মিনকালে দেখিনি হে! অস্ট্রেলিয়ার ফলই হবে বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু সেটা সঠিক জানা যায় কী করে বলো তো?
ফলের নাম না জানা অবধি নিশিকান্তবাবুর শান্তি নেই।
তুমি জ্ঞানবাবুকে দেখাও গিয়ে, বললেন তারক বাগচী। ওঁর দেশ-বিদেশ অনেক ঘোরা আছে। দেখো উনি যদি চিনতে পারেন।
জ্ঞানবাবু অর্থাৎ জ্ঞানপ্রকাশ চৌধুরী। চৌধুরীরা করিমগঞ্জের জমিদার ছিলেন। জ্ঞানপ্রকাশের ছিল ভ্রমণের নেশা। এখন তাঁর বয়স পঁয়ষট্টি। তবে যুবা বয়সে যখন জমিদারি উচ্ছেদ হয়নি তখন বাপের, পয়সায় অনেক ঘুরেছেন। অনেক দেশের অনেক কিছু জিনিস সংগ্রহ করে এনে বাড়ি ভরিয়ে ফেলেছেন।
নিশিকান্তবাবু তাঁর বন্ধুর কথামতো ফলটি থলিতে ভরে নিয়ে গেলেন জ্ঞান চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে। ভদ্রলোক তখন তাঁর বৈঠকখানায় বসে কলের গান শুনছেন। আজকাল ভদ্রলোকের নেশা পুরনো বাংলা গানের রেকর্ড আর ডাকটিকিটে এসে দাঁড়িয়েছে। চৌধুরীমশাই হালফ্যাশানের রেকর্ডপ্লেয়ারে বিশ্বাস করেন না। তাঁর গ্রামোফোনের চোঙা আছে, এবং সেটি হাতে ঘুরিয়ে দম দিয়ে চালাতে হয়। কাজেই কলের গান বলাটাই ঠিক।
তিন মিনিটের রেকর্ড–জোহরা বাঈ-এর গান শেষ হতে চাবি টিপে মেশিন বন্ধ করে ভদ্রলোক নিশিকান্তবাবুকে বসতে বললেন। হাতের ফলটা থলি থেকে বার করে শ্বেতপাথরের টেবিলের উপর রেখে পাশের সোফায় আসন গ্রহণ করলেন নিশিকান্তবাবু।
ওটা আবার কী?
জ্ঞানবাবুর দৃষ্টি ফলের দিকে। নিশিকান্তবাবু নম্রভাবে বললেন, আজ্ঞে ওটার জন্যই আপনার কাছে আসা। এই ফলটা পেয়েছি ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানে, কিন্তু কী ফল সেটা বুঝতে পারছি না। আপনি তো অনেক ঘুরেছেন-টুরেছেন, তাই…
দেখি।
নিশিকান্তবাবু ফলটা দিলেন চৌধুরীমশাইয়ের হাতে। সেটাকে নেড়েচেড়ে কেটুকে দেখে মাথা নাড়লেন জ্ঞান চৌধুরী।
উঁহুঁ। এ ফল তো দেখছি আমার অজানা। আপনি বরং কোনও বটানিস্টকে জিজ্ঞেস করুন। প্রেসিডেন্সির বটানির অধ্যাপক এখন বোধ করি বিনয় সোম। সেদিন কাগজে যেন দেখলাম নামটা। সে যদি বলতে পারে।
নিশিকান্তবাবু চিন্তায় পড়লেন। তাঁকে কি তা হলে কলকাতায় যেতে হবে এই ফল নিয়ে?
আপনি এক কাজ করুন,–তাঁর চিন্তাটা আঁচ করেই যেন বললেন জ্ঞান চৌধুরী–আমার মেজো ছেলের পোলারয়েড ক্যামেরা আছে। সে আপনাকে ফলসমেত গাছের রঙিন ছবি তুলে দেবে। তারই এক কপি আপনি সোমকে পাঠিয়ে দিন। তারপর দেখুন কী বলে?
মেজো ছেলে জ্যোতিপ্রকাশ চৌধুরী কানাডায় প্রোফেসারি করেন, সম্প্রতি বিয়ে করতে এসেছেন করিমগঞ্জে। তিনি খুশি হয়েই তাঁর ক্যামেরার শাটার টেপার সঙ্গে সঙ্গে একটি সাদা কাগজ সড়াৎ করে ক্যামেরার গায়ে একটি খাঁজের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর চোখের সামনে এক মিনিটের মধ্যে ভেলকির মতো সেই কাগজে গাছের রঙিন ছবি ফুটে বেরোলো। জ্যোতিপ্রকাশ ছবিটা ছিঁড়ে নিশিকান্তবাবুকে দিয়ে দিলেন।
ছবিটা হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করে নিশিকান্তবাবু বললেন, একটা ছবি, যদি হারিয়ে টারিয়ে যায়…
