কিন্তু এতেই মৃগাঙ্কবাবুর আশ মিটল না। তিনি প্রথমে জাদুঘর গেলেন আদিম মানুষের মূর্তি আর তার হাড়গোড় দেখতে। দেখে বুঝলেন যে, আদিম দ্বিপদ মানুষের চেহারার সঙ্গে বাঁদরের চেহারার বিশেষ মিল ছিল। তারপর মৃগাঙ্কবাবু গেলেন চিড়িয়াখানায়। সেখানে অনেকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। এক হল লেজবিশিষ্ট মাঙ্কি, আর আরেক হল লেজবিহীন এপ। এর মধ্যেও নানারকম শ্ৰেণী। দিশি বাঁদর আর হনুমানের বাইরে রয়েছে আফ্রিকার গোরিলা, শিম্পাঞ্জি, বেবুন ইত্যাদি, আর তা ছাড়া আছে সুমাত্রার ওরাং ওটাং বা বনমানুষ। এই যে মানুষ কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে এটা মৃগাঙ্কবাবুর কাছে খুব অর্থপূর্ণ বলে মনে হল।
তাঁর আরও মনে হল যে, সবরকম বাঁদরের মধ্যে আফ্রিকার শিম্পাঞ্জির সঙ্গেই মানুষের সবচেয়ে বেশি মিল। শুধু তাই না, একটি বিশেষ শিম্পাঞ্জি তো মৃগাঙ্কবাবুর সম্পর্কে বিশেষ কৌতূহলী বলে মনে হল। বারবার তাঁর দিকে চাওয়া, এগিয়ে এসে খাঁচার শিক ধরে দাঁড়িয়ে তাঁর দিয়ে চেয়ে মুখভঙ্গি করা, এমনকী দাঁত বার করে হাসা পর্যন্ত। মৃগাঙ্কবাবুর মনে হচ্ছিল যেন জানোয়ারটিকে তিনি অনেকদিন থেকেই চেনেন।
চিড়িয়াখানায় ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মৃগাঙ্কবাবুর হঠাৎ কালুমামার কথা মনে পড়ে গেল। মৃগাঙ্কবাবুর যখন বছর পঁচিশেক বয়স তখন কালুমামা একবার কিছুদিনের জন্য তাঁদের বাড়িতে এসে ছিলেন। তখন তিনি মৃগাঙ্কবাবুকে মাঝে মাঝে মর্কট বলে সম্বোধন করতেন। এই মর্কট, মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে আন তো।
মৃগাঙ্কবাবু একদিন না জিজ্ঞেস করে পারেননি। আচ্ছা কালুমামা, তুমি আমায় মর্কট বলো কেন?
কালুমামার উত্তর দিতে সময় লাগেনি।
তোর চেহারাটা মর্কটের মতো তাই। আয়নায় নিজের মুখ দেখেও বুঝতে পারিস না? কপাল ছোট, কুতকুতে চোখ, নাক আর ঠোঁটের মাঝখানে এতবড় ফাঁক–মর্কট বলব না তো কী বলব? তোর হাতের আংটিটায় যে এম লেখা রয়েছে সেটা আসলে মৃগাঙ্ক নয়–ওটা মর্কট। অথবা মাঙ্কি। তোর আর চাকরি খুঁজতে হবে না–চিড়িয়াখানায় খাঁচায় তোর জন্য ভেকেন্সি রয়েছে সবসময়।
মৃগাঙ্কবাবু অবিশ্যি এর পরে আয়নায় নিজের চেহারাটা খুব ভাল করে দেখেছিলেন। কালুমামা খুব ভুল বলেননি। একটা বাঁদুরে ভাব আছে বটে তাঁর চেহারার মধ্যে। তখন মনে পড়ল ইস্কুলেও মহেশ স্যার তাঁকে এই বাঁদর, তোর বাঁদরামো থামা জাতীয় কথা বলে ধমক দিতেন। তখন মৃগাঙ্কবাবুর বয়স বারো-তেরো। নিজের চেহারা যে বাঁদরের মতো হতে পারে এ খেয়াল তাঁর হয়নি।
শুধু মুখে নয়, পিঠে একটা কুঁজো ভাব, তার শরীরের লোমের আধিক্য–এ দুটোও তাঁকে কিছুটা বাঁদরের কাছাকাছি এনে দেয়। সলিলের কথাটা তাঁর আবার মনে পড়ল। সুদূর অতীতে যে বানর থেকে মানুষের উদ্ভব হয় তার কিছুটা ছাপ এখনও মৃগাঙ্কবাবুর চেহারায় রয়ে গেছে। চিন্তাটা তাঁকে বিব্রত করতে লাগল। আপিসে টাইপ করতে করতে মনে হয়–আমার মধ্যে বিবর্তন পুরো হয়নি, আমার মধ্যে খানিকটা বাঁদর এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে-বাঁদর কি আপিসে ডেস্কে বসে টাইপ করতে পারে? তাঁর চেহারার সঙ্গে বাঁদরের যেটুকু সাদৃশ্য সেটা সম্পূর্ণ আকস্মিক। সেরকম তো অনেক লোকের চেহারার সঙ্গেই জানোনায়ারের মিল আছে। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের সুরেশবাবুর মুখের সঙ্গে তো ছুঁচোর আশ্চর্য সাদৃশ্য। মৃগাঙ্কবাবু ষোলো আনাই মানুষ। এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।
এরই মধ্যে একদিন মৃগাঙ্কবাবুর খেয়াল হল যে তিনি কলা আর চিনেবাদামের বিশেষ ভক্ত। আপিস থেকে ফেরার পথে রোজই দুটোর একটা কিনে খান। আর এ দুটোই হল বাঁদরেরও প্রিয় খাদ্য। এই বাঁদর তুই কলা খাবি? জয় জগন্নাথ দেখতে যাবি?–ছেলেবেলার এই ছড়াটা তাঁর মাথায় ঘুরতে লাগল। এই মিলটাও কি আকস্মিক? নিশ্চয়ই তাই। কলা তো অনেকেই খায়, আর চিনেবাদামও খায়। মৃগাঙ্কবাবু চিন্তাটা জোর করে মন থেকে দূর করে দিলেন।
কিন্তু যতই স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করুন না কেন, মৃগাঙ্কবাবুর চিন্তাটা কিছুতেই যেতে চায় না। বাঁদর থেকে মানুষ…বাঁদর থেকে মানুষ…আমি কি তা হলে পুরোপুরি মানুষ হইনি? আমার মধ্যে কি বাঁদরত্ব খানিকটা রয়ে গেছে?
টাইপিং-এ ভুল হতে লাগল, আর এবার মেজোসাহেবের কাছ থেকে ডাক পড়ল।
আপনার কী হয়েছে বলুন তো? মেজোসাহেব জিজ্ঞেস করলেন। আগে তো আপনার টাইপিং-এ ভুল থাকত না। আজকাল এটা হচ্ছে কেন?
মৃগাঙ্কবাবু আর কী বলবেন। বললেন, কদিন শরীরটা একটু খারাপ হয়েছিল স্যার।
তা হলে ডাক্তার দেখান। আপিসের ডাক্তার তো রয়েইছে। ডাঃ গুপ্তকে বলুন।
না স্যার। তার দরকার হবে না। আর ভুল হবে না, আমি কথা দিচ্ছি। আমার ত্রুটি মাফ করবেন স্যার।
মেজোসাহেব মৃগাঙ্কবাবুর কথা মেনে নিলেন, কিন্তু মৃগাঙ্কবাবু নিজে মনে শান্তি পেলেন না। তিনি ডাঃ গুপ্তের শরণাপন্ন হলেন। বললেন, আমায় একটা কোনও ওষুধ দিন তো, যাতে আমার অন্যমনস্কতা কিছুটা কমে। কাজে বড় অসুবিধা হচ্ছে।
ডাঃ গুপ্ত মৃগাঙ্কবাবুর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, আপনার চেহারাটাও দেখে ভাল লাগছে। আপনার ওজন কমেছে, চোখের তলায় কালি পড়েছে। শুধু ওষুধে তো কাজ হবে না। আপনার ছুটি পাওনা আছে?
