পায়ের শব্দ তাঁর ঘরের দরজার বাইরে থামল।
মিঃ শাসমল জানেন কে এসেছে। অধীর। অধীর চক্রবর্তী। তাঁর পার্টনার। এককালে বন্ধু ছিল, কিন্তু সম্প্রতি পরস্পরে প্রায় কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মিঃ শাসমলের ব্যবসায়িক কারচুপি অধীরের পছন্দ হয়নি। তাঁকে শাসিয়েছিল পুলিশে ধরিয়ে দেবে বলে। মিঃ শাসমল উলটে বলেছিলেন ব্যবসার ক্ষেত্রে সিধে রাস্তাটা হল মূখের রাস্তা। অধীর সেটা মানেনি। এটা আগে জানা থাকলে কখনই তাকে অংশীদার করতেন না মিঃ শাসমল। তিনি বুঝেছিলেন অধীর তাঁর পরম শত্রু। শত্রুর শেষ রাখতে নেই। শেষ রাখেননি মিঃ শাসমল। গতকাল রাত্রে অধীরেরই বৈঠকখানায় দুজনে মুখোমুখি বসেছিলেন। মিঃ শাসমলের পকেটে রিভলভার। খুনের অভিপ্রায় নিয়েই এসেছেন তিনি। মাত্র চার হাত দূরে বসে অধীর। অধীরের গলা যখন ভর্ৎসনার সপ্তমে। চড়েছে, তখন রিভলভার বার করে গুলি চালান মিঃ শাসমল। তাঁর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে এককালের বন্ধু অধীর চক্রবর্তীর মুখের অবস্থা কী হয়েছিল সেটা ভাবতে হাসি এল মিঃ শাসমলের। খুনটা করার দশ মিনিটের মধ্যেই তিনি গাড়িতে বেরিয়ে পড়েন। রাতটা বর্ধমান স্টেশনের ওয়েটিং রুমে কাটিয়ে আজ সকালে এই দশ দিন আগে রিজার্ভ করা বাংলোর উদ্দেশে রওনা দেন।
দরজায় আঘাত পড়ল। একবার, দুবার, তিনবার।
মিঃ শাসমল চেয়ে আছেন দরজার দিকে। তাঁর সর্বাঙ্গে কাঁপুনি ধরেছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে।
দরজা খোল, জয়ন্ত। আমি অধীর। দরজা খোল।
যাকে তিনি গতকাল রাত্রে খুন করে এসেছেন, এই সেই অধীর। একটা কারণে তাঁর মনে সন্দেহ ছিল খুনটা ঠিক হয়েছে কি না, কিন্তু এখন আর সন্দেহ নেই। ওই কুকুর, ওই বেড়াল, ওই সাপ, ওই পাখি–আর এখন দরজার বাইরে অধীর। সবাই যখন এসেছে মৃত্যুর পরে, তখন অধীরও আসবে এটাই সঙ্গত।
আবার দরজায় ঘন ঘন করাঘাত।
মিঃ শাসমলের দৃষ্টি ঝাঁপসা, কিন্তু তিনি দেখতে পাচ্ছেন কুকুরটা তাঁর দিকে এগোচ্ছে, বেড়ালের চোখ তাঁর নিজের চোখের এক হাতের মধ্যে, সাপটা টেবিলের পায়া বেয়ে মেঝেতে নামছে তাঁরই দিকে এগোবে বলে, পাখিটা এসে তাঁর খাটের উপর বসল, তাঁর বুকে গেঞ্জির ওপর অজস্র পিঁপড়ে এসে হাজির হয়েছে…
.
শেষ পর্যন্ত দুই কনস্টেবলের ঠেলায় দরজা ভাঙল।
অধীরবাবুই পুলিশ নিয়ে এসেছেন কলকাতা থেকে। মিঃ শাসমলের কাগজপত্র থেকে ট্যুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা চিঠি বেরোয়; এই বাংলো রিজার্ভ করার খবর ছিল তাতে।
ঘরে ঢুকে মিঃ শাসমলকে মৃত অবস্থায় দেখে ইনস্পেক্টর সামন্ত অধীরবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর পার্টনারের হার্টের ব্যারাম ছিল কি না। অধীরবাবু বললেন, হার্টের কথা জানি না, তবে ইদানীং ওর মাথাটা গোলমাল করছিল। যে ভাবে টাকা এদিক-ওদিক করেছে, আমাকে যে ভাবে ঠকিয়েছে, সেটা সুস্থ-মস্তিষ্ক লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। অবিশ্যি ওর হাতে রিভলভার দেখে সে ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। সত্যি বলতে কী, ও যখন ওটা বার করল পকেট থেকে, তখন আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। ও গুলি মেরে পালানোর পর দশ মিনিট লেগেছিল আমার সংবিৎ ফিরে পেতে। তখনই ঠিক করি এই উন্মাদকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। আমি যে খুন হইনি, সেটা নেহাতই দৈবক্রমে।
মিঃ সামন্ত ভুকুঞ্চিত করে বললেন, কিন্তু এত কাছ থেকে আপনাকে মিস্ করলেন কী করে?
অধীরবাবু মৃদু হেসে বললেন, কপালে মৃত্যু না থাকলে আর মানুষ কী করে মরে বলুন! গুলি তো আমার গায়ে লাগেনি। লেগেছিল আমার সোফার গায়ে। অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা আর কজনের থাকে? রিভলভার বার করার সঙ্গে সঙ্গে যে আমার পাড়ায় লোড শেডিং হয়ে যায়!
সন্দেশ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৬
মৃগাঙ্কবাবুর ঘটনা
মৃগাঙ্কবাবু তাঁর সহকর্মী সলিল বসাকের কাছ থেকে প্রথম জানতে পারলেন যে বাঁদর থেকে মানুষের উদ্ভব হয়েছে। এ খবর আজকের দিনে শিক্ষিত লোকমাত্রই জানে, কিন্তু ঘটনাচক্রে খবরটা মৃগাঙ্কবাবুর গগাচরে আসেনি। আসলে তাঁর জ্ঞানের পরিধিটা নেহাতই সংকীর্ণ। ইস্কুলে মাঝারি ছাত্র ছিলেন, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কোনও বই পড়তেন না, পরেও বই পড়ার অভ্যাসটা একেবারেই হয়নি।
বলেন কী মশাই। তাজ্জব ব্যাপার! বাঁদর থেকে মানুষ হয়েছে? মৃগাঙ্কবাবু চরম বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
ঠিক তাই, বললেন সলিলবাবু, লক্ষ লক্ষ বছর আগে মানুষ ছিল এক শ্রেণীর চতুষ্পদ বাঁদর। বাঁদর জাতটা অবিশ্যি এখনও আছে, কিন্তু যে শ্রেণীর বাঁদর থেকে মানুষের উদ্ভব হয়েছে সে শ্ৰেণী লোপ পেয়ে গেছে।
মৃগাঙ্কবাবু এবং সলিলবাবু দুজনেই হার্ডিঞ্জ ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কেরানিগিরি করেন। মৃগাঙ্কবাবু বাইশ বছর হল কাজ করছেন, আর সলিল পনেরো; দুজনে পাশাপাশি টেবিলে বসেন, তাই একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, না হলে মৃগাঙ্কবাবু মোটেই মিশুকে লোক নন।
বাঁদর থেকে মানুষ হওয়ার খবরটা মৃগাঙ্কবাবুর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করল। তিনি কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকান ঘেঁটে একটা বিবর্তনের বই জোগাড় করে পড়ে ফেললেন। সলিল ভুল বলেনি। ছাপার অক্ষরে তথ্যটা দেখে মৃগাঙ্কবাবু আর সেটা উড়িয়ে দিতে পারলেন না। আশ্চর্য-বাঁদর থেকে মানুষের আসতে এত লক্ষ বছর লেগেছে! আদিম অবস্থাটা, এবং পরিবর্তনের ব্যাপারটা এখনও কিছুটা অন্ধকারে রয়েছে, তবে এ ব্যাপারে প্রাণিবিজ্ঞা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ও বাঁদর, এই দুই-এর মাঝামাঝি অবস্থাকে যে বলা হয় মিসিং লিঙ্ক, এ খবরও মৃগাঙ্কবাবু জানলেন।
