তা আছে। আমি গত দুবছর ছুটিই নিইনি।
তা হলে দিন সাতেকের ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরে আসুন। আপনার চেঞ্জের দরকার। অবিশ্যি আমি একটা ওষুধও লিখে দিচ্ছি, কিন্তু শুধু ওষুধে কাজ হবে না।
মৃগাঙ্কবাবু দশদিনের ছুটি নিলেন। কোথায় যাওয়া যায়?
কাশীতে তাঁর এক খুড়তুতো ভাই থাকেন। চৌষট্টি ঘাটের উপরেই বাড়ি। চব্বিশ ঘণ্টা গঙ্গার হাওয়ায় উপকার হবার সম্ভাবনা আছে। ভাই মৃগাঙ্কবাবুকে অনেকবার যেতে লিখেছেন, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মৃগাঙ্কবাবু কাশীই যাওয়া স্থির করলেন।
কাশীতে যে চতুর্দিকে এত বাঁদর সেটা মৃগাঙ্কবাবুর খেয়াল ছিল না। রাস্তায় ঘাটে বাড়ির ছাদে গাছের ডালে মন্দিরের গায়ে সর্বত্র বাঁদর। ভাই নীলরতনকে বলাতে তিনি বললেন, এখানে কী বাঁদর দেখছেন। চলুন আপনাকে দুর্গাবাড়ি দেখিয়ে আনি। বাঁদর কাকে বলে বুঝতে পারবেন।
ভাইয়ের সঙ্গে দুর্গাবাড়িতে গিয়ে মৃগাঙ্কবাবুর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। ফটক দিয়ে চত্বরে ঢুকতেই প্রায় পঞ্চাশ-ষাটটা বাঁদর এদিক থেকে ওদিক থেকে ছুটে এসে মৃগাঙ্কবাবুকে ঘিরে ধরল–তাদের কিচির মিচির শব্দে কান পাতা যায় না।
দাঁড়ান–চিনেবাদাম কিনে আনি, বললেন নীলরতন।
আশ্চর্য এই যে, বাঁদরের মধ্যে পড়েও মৃগাঙ্কবাবুর অসোয়াস্তি লাগছিল না। এসব বাঁদর যেন সকলেই তাঁর চেনা! অনেকদিন পরে বহু আপনজনের মধ্যে এসে পড়েছেন তিনি।
মৃগাঙ্কবাবু দুর্গাবাড়িতে গিয়েছিলেন কাশী আসার তিনদিন পরে। পঞ্চম দিন তিনি প্রথম অনুভব করলেন যে তিনি কথা বলার সময় খেই হারিয়ে ফেলছেন। তাঁকে বার বার ইয়ে বলতে হচ্ছে। অতি সহজ সাধারণ বাংলা কথাও তিনি ভুলে যাচ্ছেন। নীলরতন শুধু বলেছেন, মৃগাঙ্কদা, আজ দশাশ্বমেধ ঘাটে ভাল কেৰ্তন আছে। আমি আপিস থেকে ফিরে তোমায় নিয়ে যাব।নীলরতন একটা ব্যাঙ্কে চাকরি করেন।
মৃগাঙ্কবাবুর কানে কের্তন কথাটাও যেন কেমন অচেনা মনে হল। বললেন, কোথায় যাবার কথা বলছিস?
দশাশ্বমেঘ ঘাট। যাবে?
ইয়ে–দশা-দশাশ্বমেধ ঘাট। কেন? সেখানে কী আছে?
বললাম যে–আজ সন্ধ্যায় ভাল কেৰ্তন আছে। তোমার খুব ভাল লাগবে। তুমি তো কের্তনের খুব ভক্ত ছিলে।
ও–কের্তন। ইয়ে–তা যারা করবে কের্তন তারা মানুষ তো?
এ আবার কী কথা মৃগাঙ্কদা–মানুষ ছাড়া কি বাঁদরে করবে নাকি কেন? ইয়ে–মানুষ তো মানে, এককালে বাঁদরই ছিল।
যাঃ, তুমি বড় আজেবাজে বকছ, মৃগাঙ্কদা। এ ধরনের রসিকতা ভাল লাগে না। আমি চলি আপিসে। সাড়ে পাঁচটায় এসে তোমাকে নিয়ে যাব।
.
সন্ধ্যায় নীলরতনের সঙ্গে কীর্তন শুনতে গিয়ে মৃগাঙ্কবাবু একটা আশ্চর্য জিনিস অনুভব করলেন। তাঁর বারবার মনে হতে লাগল যেন বাঁদরের দলই খোল করতাল বাজিয়ে গান গাইছে। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
কীর্তন থেকে ফিরে এসে খাওয়াদাওয়া সেরে নীলরতন বললেন যে, তাঁকে একবার মাধববাবুর কাছে। যেতে হবে বাঙালিটোলায়।
আধঘণ্টার মধ্যেই ঘুরে আসছি, মৃগাঙ্কা। আমার হোমিওপ্যাথিক ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে। উনি ডাক্তার–নিজেই ওষুধ বানিয়ে দেন।
নীলরতন চলে যাবার পর মৃগাঙ্কবাবু বুঝতে পারলেন যে, তাঁর একবার বাঁদরের মতো হেঁটে দেখতে ইচ্ছে করছে। খাটের পাশে মেঝের উপর উপুড় হয়ে সামনের হাত দুটোকে পায়ের মতো ব্যবহার করে মৃগাঙ্কবাবু ঘরে কয়েকটা চক্কর মারলেন। বার চারেক চক্কর খাবার পর ঘরের দরজায় চোখ পড়তে দেখলেন নীলরতনের চাকর রামলাল চোখ ছানাবড়া করে মুখ হাঁ করে চৌকাঠের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মৃগাঙ্কবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর রামলালের দিকে চেয়ে বললেন, ইয়ে–অত অবাক হবার কী আছে? কাশীতে থাকি আর বাঁদর দেখিসনি কখনও?
রামলাল কিছু না বলে ঘরে ঢুকে বিছানা করতে লাগল।
মৃগাঙ্কবাবু বাকি যে কদিন ছিলেন কাশীতে, সে কদিন প্রায় কথাই বলেননি। নীলরতন একবার বললেন, কী হল, মৃগাঙ্কদা–আপনি অমন চুপ মেরে গেলেন কেন? শরীর-টরীর খারাপ হয়নি তো?
মৃগাঙ্কবাবু বললেন, শরীর–ইয়েকই শরীর তো ঠিকই আছে। মানে, আসলে–ইয়ে বাঁদর থেকে মানুষ যেমন হয়–তেমনই মানুষ থেকেও বাঁদর-মানে, বিবর্তনের উলটো আর কী।
নীলরতন বেশ অবাক হয়ে গেলেন–যদিও খুলে কিছু বললেন না। মৃগাঙ্কদার মাথাটা ঠিক আছে। তো? একবার মাধব ডাক্তারকে দেখালে হত না?
দুদিন পরে মৃগাঙ্কবাবু কলকাতায় ফিরে এলেন। হাতে সুটকেস নিয়ে হাজরা লেনে তাঁর বাড়িতে ঢুকতেই সামনে চাকর দাশরথি পড়ল। পুরনো চাকর, একগাল হেসে বলল, বাবু ফিরেছেন? সব মঙ্গল তো?
মৃগাঙ্কবাবু বললেন, হুপ।
দাশরথি হো হো করে হেসে বলল, কাশীতে খুব বাঁদর–না বাবু? আমি একবার গেসলাম ছেলেবেলায়।
মৃগাঙ্কবাবু বললেন, হুপ।
.
এই ঘটনার চারদিন পরে কলকাতার সব খবরের কাগজেই খবরটা বেরোল। চিড়িয়াখানার একজন কর্মচারী গতকাল ভোরে শিম্পাঞ্জির খাঁচার সামনে মাটিতে একটি বাঁদর শ্রেণী জীবকে পড়ে থাকতে দেখে। জানোয়ারটা ঘুমোচ্ছিল। বোধ হয় মাঝরাত্তিরে পাঁচিল টপকে ঢুকেছে। চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট জানিয়েছেন এই শ্রেণীর বাঁদর আগে দেখা যায়নি। ঘোড়া ও গাধার সংমিশ্রণে যেমন নতুন জানোয়ার খচ্চরের সৃষ্টি হয়, এও হয়তো দুই শ্রেণীর বাঁদরের সংমিশ্রণে সৃষ্ট একটি নতুন প্রাণী। প্রাণীটি বেঁচে আছে–এবং বাঁদরের মতোই হুপ হাপ কিচির মিচির শব্দ করছে।
