ভাল ছবি? প্রশ্ন করল জয়ন্ত সরকার। মানে, যাকে দেওয়া হবে সংবর্ধনা–ডাজ হি ডিজার্ভ ইট?
এবার নরেন গুঁই নড়েচড়ে বসল।মনে পড়েছে। আমার বাড়িতে একটা হাতেমতাই ছিল। তার ছবিতে এইচ চক্রবর্তী সই ছিল। মনে পড়েছে।
এনি গুড? জিজ্ঞেস করল জয়ন্ত সরকার।
বটতলার বাবা।
কথাটা বলে নরেন গুই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বয়োজ্যেষ্ঠদের দৃষ্টির আড়ালে সিগারেটে দুটো টান মেরে আসতে হবে।
ছবি ভাল কি মন্দ সেটা বড় কথা নয়, বললেন ইন্দ্রনাথ রায়। লোকটা একটানা বহুঁকাল ধরে কাজ করে গেছে। অক্লান্ত কর্মী। চাহিদা যখন ছিল তখন নিশ্চয়ই পপুলারিটি ছিল। অথচ বাগচী যেটা বলল, যাকে বলে রেকগনিশন, সে জিনিস সে নিশ্চয়ই পায়নি! সেটা শতদল সংস্থা তাকে দেবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, বললেন অক্ষয় বাগচী, আর সুবিধের কথা–সে এই শহরেরই লোক। তার জন্য কলকাতা ছুটোছুটি করতে হবে না।
আরেব্বাস, বলল প্রণবেশ, এটা তো জানা ছিল না!
তথ্যটা উপস্থিত সকলের কাছেই নতুন বলে ক্লাবঘরে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু তিনি কোথায় থাকেন…? প্রণবেশ অক্ষয় বাগচীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিল।
আমি জানি, বললেন বাগচী। কুমোরপাড়ার শেষ মাথায় যেখানে রাস্তা দুভাগ হয়ে গেছে, সেটা ধরে বাঁয়ে কিছুদূর গেলেই মন্মথ ডাক্তারের বাড়ি। তিনি একবার বলেছিলেন হরলাল চক্রবর্তী তাঁর প্রতিবেশী।
আপনি তাঁকে চেনেন? হরলালকে?
চিনি মানে, বছর পাঁচেক আগে একবার মুখুজ্যেদের বাড়িতে দেখেছিলাম। এক ঝলকের দেখা আর কি। বোধহয় ওদের বাড়ির জন্য কিছু ছবি আঁকছিলেন।
কিন্তু–প্রণবেশের মনে এখনও খটকা।
কিন্তু কী? জিজ্ঞেস করলেন ইন্দ্রনাথ রায়।
না, মানে, নামটা তো অ্যানাউন্স করতে হবে যদি উনি রাজি হন সংবর্ধনা নিতে।
তাতে কী হল? লোকে যদি সে নাম না শুনে থাকে, তা হলে…।
তা হলে ভাববে এ আবার কাকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে–তাই তো?
হ্যাঁ, মানে—
কিছু না। নামের আগে জুড়ে দেবে প্রখ্যাত প্রবীণ চিত্রশিল্পী–ব্যস। যারা তাঁর নাম জানে না তারা জানুক। এটাও তো শতদল সংস্থার একটা দায়িত্ব, নয় কি?
রেসকিউইং ফ্রম ওবলিভিয়ন,বললে জয়ন্ত সরকার। ভেরি গুড আইডিয়া।
আইডিয়াটা যে ভেরি গুড সেটা মোটামুটি সকলেই মেনে নিল। উৎসাহের নিভু নিভু আগুন ইন্ধন পেয়ে আবার হলকে উঠল। সকলেই স্বীকার করল যে, এতে শতদল সংস্থার প্রেস্টিজ বাড়বে বই কমবে না। তারা যেটা করতে চলেছে সেটা মামুলি সংবর্ধনা নয়, সেটা একটা সামাজিক কর্তব্যও বটে! হয়তো এটাই হবে ভবিষ্যতের রেওয়াজ। বাংলার যেসব কৃতী সন্তান অন্ধকারে পড়ে আছেন তাঁদের আলোতে তুলে ধরা।
ঠিক হল অক্ষয় বাগচী নিজে যাবেন প্রণবেশ ও ক্লাবের আরেকটি সভ্যকে নিয়ে হরলাল চক্রবর্তীর বাড়ি। কাল সকালেই যাওয়া দরকার, কারণ আর সময় নেই। চক্রবর্তী মশাই রাজি হলে, ক্লাবের প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে পোস্টারে সমরকুমারের জায়গায় নতুন নাম বসিয়ে দিতে হবে। নামের আগে অবিশ্যি প্রখ্যাত প্রবীণ চিত্রশিল্পী কথাটা বাদ দিলে চলবে না।
.
গোলাপি রঙের একতলা বাড়ির ফটকে হরলাল চক্রবর্তী, আর্টিস্ট ফলক থাকায় কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। অক্ষয় বাগচী ভুল বলেননি; এই বাড়ির দুটো বাড়ি পরেই মন্মথ ডাক্তারের বাসস্থান। প্রণবেশ ও বাগচীমশাই ছাড়া সঙ্গে এসেছেন বাংলার শিক্ষক চুনিলাল সান্যাল।
তিনজনে গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন।
বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা ফুলের বাগান, তাতে একটা আমড়া গাছ। পরিবেশ ছিমছাম হলেও সচ্ছলতার কোনও পরিচয় নেই। বোঝাই যাচ্ছে হরলাল চক্রবর্তীর ভাগ্যে যে শুধু খ্যাতিই জোটেনি তা নয়, অর্থোপার্জনের ব্যাপারেও তিনি তেমন সুবিধে করতে পারেননি।
দরজায় টোকা দেবার আর দরকার হল না, কারণ পৰু গুম্ফবিশিষ্ট চশমাপরিহিত এক ভদ্রলোক, হয়তো জানলা দিয়ে আগন্তুকদের দেখেই, দরজা খুলে এলেন। পরনে লুঙ্গি করে পরা ধুতির উপর লম্বাহাতা জালিদার গেঞ্জি।
অক্ষয় বাগচী নমস্কার করে এগিয়ে গিয়ে বললেন, আপনার বোধহয় মনে নেই, বছর পাঁচ-সাত আগে ধরণী মুখুজ্যের বাড়িতে একবার আপনার সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল।
ও–
একটা ইয়ে, মানে, কথা ছিল আপনার সঙ্গে, বলল প্রণবেশ। একটু বসা যায় কি?
আসুন না।
দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁয়ে বৈঠকখানা। কিছু বাঁধানো পেন্টিং, তাতে ইংরিজিতে এইচ চক্রবর্তী সই সুস্পষ্ট। এ ছাড়া অনাড়ম্বর পরিবেশ। তক্তপোশ ও কাঠের চেয়ার মিলিয়ে সকলেরই বসার জায়গা হয়ে গেল।
আমরা আসছি শতদল সংস্থার পক্ষ থেকে, বলল প্রণবেশ।
শতদল সংস্থা?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটা ক্লাব। এখানের খুব নামকরা ক্লাব। বরদাবাবুবরদা মজুমদার এম, এল, এ আমাদের প্রেসিডেন্ট।
ও।
আমরা প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ একটা ফাংশন করি। একটু গান-বাজনা হয়, একটা একাঙ্ক নাটিকা, আর তার সঙ্গে, বাংলার সংস্কৃতির ব্যাপারে যাঁর কিছু অবদান আছে এমন একজনকে আমরা সংবর্ধনা দিই। এবার আপনার কথাটাই মনে পড়ল। আপনি আমাদের শহরের লোক, অথচ, মানে, তেমন করে তো কেউ আপনাকে চেনে না…
হুঁ…। পয়লা বৈশাখ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
সে তো আর মাত্র চারদিন।
হ্যাঁ। মানে, একটু লেট হয়ে গেল। কতকগুলো–প্রণবেশ গলা খাঁকরে নিল–অসুবিধা ছিল।
বুঝলাম। তা, সম্বর্ধনা মানে…?
