কিছুই না। ছটা নাগাদ আমরা এসে আপনাকে নিয়ে যাব গাড়িতে করে। সন্ধ্যা ছটা। আপনার আইটেমটা একদম শেষে। আপনাকে একটা মানপত্র দেওয়া হবে, ইনি–মিস্টার বাগচী–আপনার সম্বন্ধে দুটো কথা বলবেন, আর শেষে আপনিও যদি দুকথা বলেন তা হলে তো কথাই নেই। নটার মধ্যে ফাংশন শেষ।
হুঁ–।
আপনার বাড়ির লোক, মানে, আপনার স্ত্রী…
উনি তো বাতের রুগি।
ও। তা আপনি যদি আর কাউকে নিয়ে যেতে চান…
সেটা দেখা যাবেখন।
এবার অক্ষয় বাগচী একটা কাজের কথা পাড়লেন।
আপনার সম্বন্ধে একটা ইনট্রোডাকশন দিতে পারলে ভাল হত।
ঠিক আছে। আমি কিছু তথ্য লিখে রাখব একটা কাগজে। আপনারা কাল যদি কাউকে পাঠিয়ে দেন–
আমি নিজেই এসে নিয়ে যাব, বলল প্রণবেশ।
শতদল সংস্থার তিন সদস্য উঠে পড়লেন। হরলাল চক্রবর্তী যেন এতক্ষণে ব্যাপারটা উপলব্ধি করেছেন। তাঁর চোখের কোণ চিকচিক করছে বলে মনে হল প্রাণবেশের।
অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার যে সুনাম আছে শতদল সংস্থার, এই পয়লা বৈশাখেও সেটা অক্ষুণ্ণ রইল। হরলাল চক্রবর্তীর নাম শুনে ইনি আবার কিনি বলে যে প্রশ্ন উঠেছিল, সংবর্ধনার পরে সে প্রশ্ন আর কেউ করেনি। সরকারি আর্ট স্কুলে তাঁর ছাত্রজীবন, পেশাদারি শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার পিছনে তাঁর অক্লান্ত স্ট্রাগল, পৌরাণিকী সিরিজের ছাপ্পান্নখানা বই ও অজস্র শিশু পত্রিকার পাতায় তাঁর ছবি, রায়বাহাদুর এল. কে. গুপ্তর প্রশংসাপত্র, বর্ধমান মহারাজাধিরাজ কর্তৃক প্রদত্ত রৌপ্য পদক এবং সবশেষে ডান হাতের বুড়ো আঙুলে আরথ্রাইটিস রোগের আক্রমণ হেতু বাষট্টি বছর বয়সে চিত্রাঙ্কন থেকে অবসর গ্রহণ–এ সবই তথ্য আজ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলেই অবগত হলেন। হরলাল নিজে শতদল সংস্থার উদ্যমের প্রশংসা করে শুধু একটি কথাই বললেন–এই প্রশংসাপত্র আমার প্রাপ্য নয়। তাঁর বিনয়সূচক এই উক্তি অবিশ্যি সকলের মনেই গভীরভাবে রেখাপাত করল।
পুষ্পমাল্য ও ফ্রেমে বাঁধানো মানপত্র নিয়ে হরলাল যখন ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট নীহার চৌধুরীর গাড়িতে উঠছেন তখন তিনি বেশি খুশি না শতদল সংস্থার সভ্যরা বেশি খুশি তা বলা শক্ত। শেষ কথা বললেন ইন্দ্রনাথ রায়, আগামী বছরের সম্বর্ধনা তোমরা বাগচীকেই দিও, প্রণবেশ ভায়া। সেই তো ক্লাবের মানটা বাঁচালো।
.
পরদিন সকালে সংস্থার আপিসে একটি লোক এসে সেক্রেটারির নামে একটি মোড়ক দিয়ে গেল। প্রণবেশ মোড়টা খুলে ভারী অবাক হয়ে দেখলে তাতে রয়েছে হরলাল চক্রবর্তীর মানপত্র। সঙ্গের চিঠি রহস্য উদঘাটন করবে মনে করে সেটি খুলে প্রণবেশ যা পড়ল তা হল এই–
শতদল সংস্থার সেক্রেটারি মহাশয় সমীপে সবিনয় নিবেদন–
সেদিন আপনাদের কথায় মনে হয়েছিল আপনারা নেহাত বিপাকে পড়ে হরলাল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আপনাদের ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করতে পেরে আমি পুলক বোধ করছি। তবে মানপত্রটি ফেরত দিতে বাধ্য হলাম। তার কারণ, প্রথমত, পড়ে দেখলাম যে নাম ও তারিখ বদল করে এটি আপনারা স্বচ্ছন্দে আগামী বছর কাজে লাগাতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, এই মানপত্র সত্যিই আমার প্রাপ্য নয়। চিত্রশিল্পী হরলাল চক্রবর্তী আজ তিন বছর হল এই শহরেই দেহরক্ষা করেছেন। তিনি ছিলেন আমার দাদা। আমি কাঁথিতে পোস্টাপিসের সামান্য কর্মচারী। এখানে এসেছিলাম সাতদিনের ছুটিতে।
ইতি ভবদীয়
রসিকলাল চক্রবর্তী
সন্দেশ, শ্রাবণ ১৩৯০
মিঃ শাসমলের শেষ রাত্রি
মিঃ শাসমল আরাম কেদারাটায় গা এলিয়ে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
মোক্ষম জায়গা বেছেছেন তিনি উত্তর বিহারের এই ফরেস্ট বাংলো। এর চেয়ে নিরিবিলি নিরাপদ নিরুপদ্রব জায়গা আর হয় না। ঘরটিও দিব্যি। সাহেবি আমলের মজবুত, সুদৃশ্য টেবিল চেয়ার সাজানো, প্রশস্ত খাটে বালিশ বিছানা ততকে পরিষ্কার, ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমটিও বেশ বড়। পশ্চিমের জানালাটা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস আসছে, আর সেই সঙ্গে আসছে ঝিঁঝির একটানা শব্দ। বিজলি না থাকলেও কোনও ক্ষতি নেই; কলকাতার লোড শেডিং-এ কেরোসিনের আলোয় পড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। বাংলোর আলোতে সাদা কাঁচের শেড থাকার ফলে তাঁর কলকাতার আলোর চেয়ে বেশি বলেই মনে হচ্ছে। সঙ্গে বই আছে–গোয়েন্দা উপন্যাস; মিঃ শাসমলের প্রিয় পাঠ্য।
এক চৌকিদার ছাড়া বাংলোয় অন্য কোনও বাসিন্দা নেই। অর্থাৎ আর কারুর মুখ দেখতে হবে, কারুর সঙ্গে কথা বলতে হবে না। চমৎকার। কলকাতার ট্যুরিস্ট আপিসে গিয়ে দশদিন আগে থেকে বলে এসেছিলেন এই বাংলোর কথা; দিন চারেক আগে মিঃ শাসমল তাদের কাছ থেকে চিঠিতে জানেন যে ঘর বুক করা হয়ে গেছে। অন্তত তিনটে দিন এখানে থেকে তারপর অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবা যাবে। সঙ্গে টাকা আছে যথেষ্ট; মাসখানেক চালিয়ে নেওয়া যাবে অক্লেশে। নিজের গাড়ি আছে সঙ্গে; স্বভাবতই তিনি নিজেই চালিয়ে এসেছেন এই সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার পথ।
চৌকিদার তার কথামতো সাড়ে নটায় ডিনার দিয়ে দিল। হাতের রুটি অড়হরের ডাল, একটা তরকারি আর মুরগির কারি। ডাইনিং রুমেও সাহেবি আমলের চিহ্ন রয়েছে। টেবিল, চেয়ার, চীনেমাটির পাত্র, বাহারের সাইনবোর্ড–সবই সেই কালের।
এখানে মশা আছে কি? খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন মিঃ শাসমল। কলকাতায় যে অঞ্চলে তাঁর ফ্ল্যাট, সেখানে মশা নেই। আজ বছর দশেক হল মশারির অভ্যেসটা চলে গেছে। ওটা ব্যবহার না করতে পারলে আরও নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
