সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯৫
মানপত্র
শতদল সংস্থার সেক্রেটারি প্রণবেশ দত্ত বিস্ফোরক সংবাদটি ঘোষণা করবার পর উপস্থিত সদস্যদের মুখ দিয়ে প্রায় এক মিনিট কোনও কথা বেরোল না। ক্লাবঘরে জরুরি মিটিং বসেছে নববর্ষের পাঁচদিন আগে। মিটিং-এর উদ্দেশ্য প্রণবেশ জানায়নি কাউকে, কেবল বলেছে আজ সকলের আসা চাই-ই, কারণ সংকটময় মুহূর্ত সমুপস্থিত।
প্রথম মুখ খুলল জয়ন্ত সরকার।
আর ইউ অ্যাবসোলিউটলি শিওর?
জয়ন্ত লাগসই ইংরিজির হদিস পেলে বাংলা বলে না।
বিশ্বাস না হয় চিঠি দেখো,বলল প্রণবেশ। এই তো। সমরকুমারের নিজের সই। আরও শিওরিটির দরকার আছে কি?
সমরকুমারের চিঠিটা হাত ঘুরে আবার প্রণবেশের কাছেই ফিরে এল। হ্যাঁ, সমরকুমারেরই সই বটে ফিল্ম পত্রিকার দৌলতে এই সই কারুর চিনতে বাকি নেই–বিশেষ করে হ্রস্ব উ-এর ওই ডবল প্যাঁচ।
কারণটা কী বলছে? প্রশ্ন করল নরেন গুই।
শুটিং, বলল প্রণবেশ, হঠাৎ আউটডোর পড়ে গেছে কালিম্পঙে। অতএব ভেরি সরি।
আশ্চর্য, বলল শান্তনু রক্ষিত। লোকটা ইয়েস বলে স্রেফ নো করে দিল?
নরেন গুই বলল, আমি তো গোড়াতেই বলেছিলাম–ওসব চিত্রতারকা-ফারকা বাদ দে। ওদের কথার কোনও ভ্যালু নেই।
হোয়াট এ ক্যাটাসট্রফি!কপালের ঘাম মুছে বলল জয়ন্ত সরকার।
এর কোনও বিকল্প ব্যবস্থা হয় না? প্রশ্ন করল চুনিলাল সান্যাল। চুনিলাল স্থানীয় বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউটে বাংলার শিক্ষক।
এই লাস্ট মোমেন্টে আর কী বিকল্প ব্যবস্থা আশা করছ চুনিদা, বলল সেক্রেটারি প্রণবেশ। আর আমি তো চুপচাপ বসে নেই। এর মধ্যে দুবার ট্রাঙ্ককল করেছি কলকাতায়। নিমুর সঙ্গে কথা হয়েছে। বললাম গাইয়ে বাজিয়ে নাচিয়ে খেলুড়ে যা একটা ধর। সংবর্ধনা অ্যানাউন্স করা হয়ে গেছে, মানপত্র লেখা হয়ে গেছে। সম্বর্ধনা আমাদের দশ বছরের ট্র্যাডিশন, ওটা ছাড়া ফাংশন হবেনা। নিমু বললে, নো চান্স। এক কলকাতাতেই সাত-সাতটা সংস্থা সংবর্ধনার আয়োজন করেছে। ক্যানডিডেটের চয়েস তো বেশি নেই। নামকরা যে কজন আছে সবাই এংগেজড। পন্টু ব্যানার্জিকে তো একদিন দু-জায়গায় সংবর্ধনা নিতে হচ্ছে; তাও একই শহরে বলে পারছে। শ্যামল সোম, রজত মান্না, হরবিলাস গুপ্ত, দেবরাজ সাহাসব বেটাকে একধার থেকে কোনওনা-কোনও ক্লাব বুক করে রেখেছে।
তুমি যে মানপত্রের কথা বললে, বললেন ইন্দ্রনাথ রায়–যিনি এখানে সকলের বয়োজ্যষ্ঠ–সমরকুমারের জন্য যে মানপত্র লেখা হয়েছে সেটা তুমি অন্যের ঘাড়ে চাপাবে কী করে?
আপনি বোধহয় মানপত্রটা দেখেননি, ইন্দ্রদা, বলল প্রণবেশ।
না, দেখিনি।
তাই। ওর কোথাও ফিল্মস্টার বা ফিল্মের কোনও কথা নেই। অ্যাড্রেস করা হয়েছে হে সুধী বলে। সুধী তো এনিওয়ান হতে পারে।
দেখি মানপত্রটা।
দেরাজ থেকে একটা পুরু পাকানো কাগজ বার করে সেটা ইন্দ্রনাথ রায়ের হাতে দিয়ে দিল প্রণবেশ।–এটা লিখতে মনোতোষের ঝাড়া সাতদিন লেগেছে। ভাষাটা অবিশ্যি চুনিদার।
চুনিলাল খুক করে একটা কাশি দিয়ে তার অস্তিত্বটা জানান দিল।
তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই–এ কী, এ কী–এ যে চেনা-চেনা মনে হচ্ছে।
পাকানো কাগজটা খুলে ধরেছেন ইন্দ্রনাথ। তাঁর কপালে খাঁজ, দৃষ্টি চুনিলালের দিকে।
তা তো হবেই, বলল চুনিলাল, রবীন্দ্র-জয়ন্তীতে উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে স্যার জগদীশ বোস কবিগুরুকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ভাষাটা শরৎচন্দ্রের। এটা তার প্রথম লাইন।
সে লাইন তুমি বেমালুম লাগিয়ে দিলে?
কোটেশনে আপত্তি কীসের ইন্দ্রদা? এ তো বিখ্যাত পঙক্তি, শিক্ষিত বাঙালি মাত্রেই চিনবে। এর চেয়ে ভাল ধরতাই হয় না।
আর কটা কোটেশন আছে এতে?
আর নেই ইন্দ্রদা, বলল চুনিলাল। বাকিটা সম্পূর্ণ মৌলিক।
মানপত্র টেবিলের উপর ফেলে দিয়ে একটা হাই তুলে ইন্দ্রনাথ বললেন, তা হলে বোঝো এখন তোমরা কী করবে।
অক্ষয় বাগচীর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, মেজাজও বেশ ভারিক্কি। তিনি একটা উইলস ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, নামের মোহটা যদি ত্যাগ করতে পারো তো আমি একজনের নাম সাজেস্ট করতে পারি। সংবর্ধনা ছাড়া যখন ফাংশন হবে না, তখন তার কথাটা তোমরা ভেবে দেখতে পারো।
নামের কথাটা যে এখন ভুলে যেতে হবে সে তো বুঝতেই পারছি, বলল প্রণবেশ। তবে তাই বলে তো আর রাস্তা থেকে তোক ডেকে রিসেপশন দেওয়া যায় না। কোনও একটা কনট্রিবিউশন তো থাকতে হবে লোকটার!
আছে, বললেন অক্ষয় বাগচী, এঁর আছে।
কার কথা বলছেন আপনি? ঈষৎ অসহিষ্ণুভাবে প্রশ্ন করল প্রণবেশ।
হরলাল চক্রবর্তী।
নামটা উচ্চারণ করার পরে ক্লাবঘরে বেশ কয়েক মুহূর্তের নৈঃশব্দ্য। উপস্থিত সভ্যদের অনেকেই যে এ নামটা শোনেনি সেটা বোঝা যাচ্ছে। কেবল ইন্দ্রনাথ রায় কিছুক্ষণ কুঞ্চিত করে থেকে অক্ষয় বাগচীর দিকে চেয়ে বললেন, হরলাল চক্রবর্তী মানে আর্টিস্ট হরলাল চক্রবর্তী?
হ্যাঁ, আর্টিস্ট, মাথা নেড়ে বললেন অক্ষয় বাগচী। আমরা ছেলেবেলা থেকে তাঁর আঁকা ছবি দেখে এসেছি গল্পের বইয়ে। বেশিরভাগ পৌরাণিক ছবি। এককালে খুব পপুলার ছিলেন। ছেলেদের পত্রিকাতেও ছবি আঁকতেন রেগুলারলি। আমার মনে হয় তেলা মাথায় তেল দেওয়ার চেয়ে এইটে অনেক ভাল হবে।
কথাটা মন্দ বলোনি অক্ষয়, সোজা হয়ে উঠে বসে বললেন ইন্দ্রনাথ। আমি এ প্রস্তাব সমর্থন করছি। আমারও এখন পষ্ট মনে পড়ছে তাঁর আঁকা ছবি। আমাদের বাড়িতে কাশীদাসের একটা এডিশন ছিল, তাতে তাঁরই আঁকা ছবি ছিল।
