দ্য গ্রেট সুরিয়া দেখলাম পাংচুয়ালিটিতে বিশ্বাস করে, কারণ ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় ছটার সময় পর্দা সরে গেল।
বিদেশি ম্যাজিক যেমন হয়, তার তুলনায় সূর্যকান্তের শো নেহাত নিন্দের নয়। ম্যাজিক ছাড়াও দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য নানারকম বন্দোবস্ত রয়েছে, তার মধ্যে এক হল রঙচঙে সেট সেটিং, দুই হল বাজনা, আর তিন হল ছজন মেয়ে সহকারী–তারা সকলেই বেশ সুশ্রী।
সবচেয়ে অবাক লাগল মহিম সান্যালের প্রতিক্রিয়া দেখে। তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শো দেখছিলেন এবং প্রত্যেক আইটেমের পর হাততালি দিচ্ছিলেন। আমি একবার ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বেশ ভাল লাগছে বলে মনে হচ্ছে?
ভদ্রলোক বললেন, প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এ জিনিস দেখছি। শেষ দেখেছি চিনে জাদুকর চ্যাং-এর ম্যাজিক। যৌবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, মন্দ লাগছে না। তবে সবই যন্ত্রের কারসাজি আর রঙতামাশা দিয়ে লোকের মন ভোলানো। আসল ম্যাজিক যাকে বলে সে জিনিস এটা নয়। আর এ দেখছি হিটিজম জানে না।
শেষ আইটেমের আগে সূর্যকান্ত একটা ব্যাপার করল। মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে এসে দর্শকদের উদ্দেশ করে বলল, আজ আমাদের বিশেষ সৌভাগ্য যে, সামনের সারিতে উপস্থিত রয়েছেন এমন একজন জাদুকর, যাঁর নাম আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে লোকের মুখে মুখে ফিরত। ইনি ভারতীয় জাদুর জন্য যা করেছেন তার তুলনা হয় না। আমি মহিম সান্যালকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি উনি মঞ্চে তাঁর অন্তত একটা জাদু দর্শকদের দেখান। তিনি সরঞ্জাম কিছুই আনেননি। কিন্তু সরঞ্জাম উনি ব্যবহার করতে চাইলে আমি অত্যন্ত গর্ব বোধ করব, এবং তিনি আমার অনুরোধ রক্ষা করলে আমার আনন্দের সীমা ছাড়িয়ে যাবে। মহিমবাবু!
মহিমবাবু আমার হাতে একটা মৃদু চাপ দিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠে মঞ্চে হাজির হলেন। দর্শকরা সকলে চুপ। কী ঘটতে চলেছে তা কারুরই ধারণায় নেই। আমিও চুপ।
মহিমবাবু দর্শকদের দিকে ফিরে বললেন, বহুদিন পরে এ জিনিস করছি, কিন্তু ত্রুটি হলে আশা করি আপনারা ক্ষমা করবেন। আমি আপনাদের দুটো খেলা দেখাব। দুটোই দিশি। তার প্রথমটা হল হাত সাফাই। সূর্যকান্ত, তোমার তিনটি বল যদি আমাকে দাও।
সূর্যকান্তর এক সহকারী তৎক্ষণাৎ দুটো লাল এবং একটা সাদা বল মহিমবাবুকে এনে দিল।
সেই বল নিয়ে মহিমবাবু যা করলেন তার চমৎকারিত্ব বর্ণনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। হাত সাফাই যে এমন হতে পারে তা আমার ধারণা ছিল না।
এখন হলে হাততালির চোটে কান পাতা দায়, এবং সে হাততালিতে সূর্যকান্তও যোগ দিল।
হাত সাফাই দেখিয়ে মহিমবাবু বলগুলো সূর্যকান্তকে ফেরত দিয়ে বললেন, এবার আমি আমার দ্বিতীয় জাদু দেখাতে চাই। আমি সম্মোহন বা হিপনটিজম শিখেছিলাম অমৃতসরে এক ফুটপাথের জাদুকরের কাছ থেকে। তারই সামান্য নিদর্শন আমি আপনাদের দেখাচ্ছি। আমি সূর্যকান্তবাবুর অনুরোধ রক্ষা করেছি। আশা করি তার প্রতিদানে তিনিও আমার একটি সামান্য অনুরোধ রক্ষা করবেন। আমি তাঁকেই সম্মোহিত করতে চাই।
সূর্যকান্ত দেখলাম বেশ স্পোর্টিং; সে রাজি হয়ে গেল।
মহিমবাবু সূর্যকান্তকে একটা চেয়ারে বসিয়ে তার সামনে নিজেও একটা চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন, আপনি আমার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকুন।
সূর্যকান্ত আদেশ পালন করল। তিন মিনিটের মধ্যে লক্ষ করলাম সূর্যকান্তর চোখের চাউনি বদলে গেছে। তার চোখ দুটো যেন পাথরের চোখ। সে যেন সামনের জিনিস দেখেও দেখতে পারছে না।
মহিম সান্যাল এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। সূর্যকান্তর দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে তিনি বললেন, আপনাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।
করুন,ভাবলেশহীন কণ্ঠে উত্তর দিল সূর্যকান্ত।
আপনি কতদিন হল ম্যাজিক দেখাচ্ছেন?
পাঁচবছর।
কার কাছে আপনি ম্যাজিক শিখেছেন?
সুলতান খাঁ।
কবে থেকে শিখতে আরম্ভ করেছেন?
আমার যখন পঁচিশ বছর বয়স!
আপনার এখন বয়স কত?
পঁয়ত্রিশ।
ম্যাজিক দেখানোর আগে আপনি কী করতেন?
দিল্লিতে চাকরি করতাম।
কী চাকরি?
খবরের কাগজের রিপোর্টার।
তার আগে?
আমি কলকাতায় থাকতাম।
কোথায়?
চব্বিশ নম্বর ল্যান্সডাউন রোড।
কার সঙ্গে থাকতেন আপনি?
আমার বাবা।
আপনার বাবার নাম কী?
মহিম সান্যাল।
আমি স্তম্ভিত। হলে পিন পড়লে তার আওয়াজ পাওয়া যেত।
আপনার আসল নাম কী? প্রশ্ন করলেন মহিমবাবু।
অনীশ সান্যাল।
আপনি আপনার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান?
হ্যাঁ।
এখনও বাবার উপর রাগ আছে?
না, আর নেই। আমি ভুল করেছিলাম, অন্যায় করেছিলাম।
এর পরে সূর্যকান্ত ওরফে অনীশের চোখের সামনে হাত নেড়ে তাকে হিপনোটাইজড অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেন মহিম সান্যাল।
দর্শক কিছুক্ষণ হতভম্ব থেকে হঠাৎ তুমুল হাততালিতে ফেটে পড়ল। এদিকে অনীশও হতভম্ব। সে তো কিছুই জানে না এতক্ষণ কী হয়েছে। এবার মহিমবাবু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, কেমন বোধ করছ, অনীশ–কোনও কষ্ট হয়নি তো?
এতক্ষণে অনীশ বুঝতে পারল। সে তার বাবাকে প্রণাম করে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।
.
পরে মহিমবাবু আমাকে বলেছিলেন যে, সূর্যকান্তর গলার আওয়াজ আর কানের লতি থেকেই ছেলেকে চিনতে পেরেছিলেন তিনি। পরদিন সকালে অনীশ আবার এসেছিল। বলল, এর পরে ওর উত্তরপ্রদেশে টুর আছে। তারপর পনেরো দিন অবসর। সেই সময়টা সে পাম এভিনিউতে বাবার কাছে এসেই থাকবে।
