প্রায় কুড়ি বছর আগে, আমি বললাম। একটা পুজো প্যান্ডেলে দেখেছিলাম বলে মনে পড়ছে।
হ্যাঁ, বললেন মহিম সান্যাল। আমি অনেক পুজো প্যান্ডেলে ম্যাজিক দেখিয়েছি। শুধু দিশি ম্যাজিক দেখাতুম, তাই আমার বড় স্টেজের দরকার হত না। আমার যখন বছর পঞ্চাশ বয়স তখন থেকে আমি ম্যাজিক দেখানো ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় ম্যাজিক সম্বন্ধে চর্চা আরম্ভ করি। তার জন্য আমাকে সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। এমন জায়গা নেই যেখানে আমি যাইনি। এমনিতে আমি হোমিওপ্যাথি করতাম, তাতে রোজগার ছিল ভাল। হাজারের উপর ম্যাজিক সংগ্রহ করেছি। শুধু হাত সাফাই-ই আছে তিনশো ছাপ্পান্ন রকম। আমার গবেষণার ফল হল একটা সাড়ে চারশো পাতার হাতে লেখা ইংরিজি পাণ্ডুলিপি। নাম দিয়েছি ইন্ডিয়ান ম্যাজিক। সেই পাণ্ডুলিপি এখন টাইপ করতে হবে, কারণ বিদেশের একজন নামকরা প্রকাশক আমার পাণ্ডুলিপি ছাপার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এ কাজ পারবে তো?
একবার পাণ্ডুলিপিটা দেখতে পারি?
ভদ্রলোক তিনটে মোটা ফাইল আমাকে এনে দিলেন। দেখলাম বেশ পরিষ্কার ঝরঝরে লেখা, টাইপ করতে কোনও অসুবিধা হবে না। তখনই সব কথাবার্তা হয়ে গেল। যা মাইনে অফার করলেন ভদ্রলোক, তাতে আমার দিব্যি চলে যাবে। বুঝলাম, ভদ্রলোক ম্যাজিক দেখিয়ে আর ডাক্তারি করে বেশ ভাল পয়সা করেছেন।
এবার আমি একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না।
আপনার বাড়িতে কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছি না–আপনি কি এখানে একা থাকেন?
হ্যাঁ, বললেন ভদ্রলোক। আমার স্ত্রী গত হয়েছেন দশ বছর হল। আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে ব্যাঙ্গালোরে থাকে। আমার ছেলে অনীশ বাইরে চাকরি করে।
ভদ্রলোক একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। বুঝলাম একাকিত্বটা যে তিনি খুব উপভোগ করেন তা নয়।
আমি আমার কাজের টাইম জেনে নিলাম। সকাল দশটায় আসতে হবে, দুপুরে সান্যাল মশাইয়ের সঙ্গেই খাওয়া, আর সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত কাজ।
কাজে লেগে পড়লাম। পাণ্ডুলিপিটা যতই পড়ছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। আশ্চর্য সংগ্রহ ভদ্রলোকের। ভারতীয় জাদু যতরকম হতে পারে–মাদারি কা খেল, ভোজবাজি, ভেলকি–সবকিছুই আছে। বই হলে একটা অতি মূল্যবান জিনিস হবে সেটাও বুঝতে পারলাম।
দুপুরে খাওয়ার সময় ভদ্রলোক তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন, শুনতে গল্পের মতো লাগে। যখন জাদুকর ছিলেন তখন বেশিরভাগই নেটিভ স্টেটে রাজারাজড়াদের ম্যাজিক দেখাতেন। সব খেলাই হত ফরাসের উপর। স্টেজের কোনও বালাই নেই। এমনি ম্যাজিক ছাড়াও ভদ্রলোক যেটা খুব ভাল পারতেন সেটা হল হিনটিজম বা সম্মোহন। বিদেশি ম্যাজিক ভদ্রলোক ভাল চোখে দেখতেন না, কারণ তাতে হাত সাফাই-এর চেয়ে যন্ত্রপাতির ব্যবহারটাই বেশি। সেখানে জাদুকর হচ্ছে একজন শো-ম্যান। ভারতীয় ম্যাজিক বিদেশির চেয়ে অনেক বেশি খাঁটি। সেটা ফুটপাথে বসেও দেখানো যায়। তাতে যন্ত্রপাতির দরকার লাগে না। যেটার প্রয়োজন হয় সেটা হল জাদুকরের দক্ষতা।
এই সময়–তখন আমার টাইপিং প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে–একটা ব্যাপার হল।
কলকাতায় এক ম্যাজিশিয়ান এলেন শো দিতে। আসন নাম সূর্যকান্ত লাহিড়ী, কিন্তু তিনি নিজেকে The great Soorya বলে প্রচার করেন। তাঁর পোস্টার বা বিজ্ঞাপনে ওই নামই থাকে। মহিমবাবু কাগজে এই জাদুকরের বিজ্ঞাপন দেখে বললেন, এঁর নাম তো শুনিনি। ইনি নতুন আমদানি বলে মনে হচ্ছে। আমার একটু একটু ইচ্ছে করছিল এই ছোরার ম্যাজিক দেখতে, কিন্তু সেটা আর সান্যাল মশাইকে বললাম না।
দুদিন পরে একটা টেলিফোন এল দুপুরবেলা। আমার টেবিলেই টেলিফোন থাকে, তুলে হ্যালো বলতে উলটো দিক থেকে কথা এল–আমি সূর্যকান্ত লাহিড়ী কথা বলছি; জাদুকর দ্য গ্রেট সুরিয়া বলে আমি পরিচিত। একবার মহিম সান্যালের সঙ্গে কথা বলতে পারি কি?
আমি বললাম, আপনার প্রয়োজনটা কী জানতে পারি? আমি ওঁর সেক্রেটারি কথা বলছি।
উত্তর এল–আমি ভদ্রলোকের নাম অনেক শুনেছি। তিনি দিশি ম্যাজিক দেখাতেন সেটা আমি জানি। তাঁকে আমার শোয়ে আমন্ত্রণ জানাতে চাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে আসতে বলতে চাই।
আমি সান্যালমশাইকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি পরদিন সকালে সময় দিলেন। আমি সে কথা সূর্যকান্তকে জানিয়ে দিলাম।
পরদিন সূর্যকান্ত সকাল সাড়ে দশটার সময় এল। আমি তাকে বৈঠকখানায় বসালাম। বছর পঁয়ত্রিশেক বয়স, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, বেশ ব্রাইট চেহারা। আর চোখেমুখে কথা বলে। মহিমবাবু আসতেই তাঁকে নমস্কার করে বলল, আমি জানি আপনি বিদেশি জাদু পছন্দ করেন না, কিন্তু আমার একান্ত অনুরোধ যদি একটিবার আমার শো-এ আসেন। আমি ছেলেবেলা থেকে আপনার নাম শুনেছি, আপনার খ্যাতির কথা জানি। আমার গুরু সুলতান খাঁ আপনার ম্যাজিক দেখেছিলেন, তিনিও খুব সুখ্যাতি করেছিলেন। আশা করি আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না। আপনাদের জন্য দুখানা ঠিকিট আমি নিয়ে এসেছি–একেবারে সামনের সারির মাঝখানে। আপনারা এলে আমি কৃতার্থ হব। কালই সন্ধ্যায় শো মাত্র দু ঘণ্টা সময় আপনার যাবে।
আমি ভেবেছিলাম মহিমবাবু হয়তো আপত্তি করবেন, কিন্তু দেখলাম তিনি রাজি হয়ে গেলেন। সূর্যকান্ত অত্যন্ত খুশিমনে বিদায় নিল।
পরদিন সন্ধ্যা ছটায় মহাজাতি সদনে শো, আমরা ঠিক পাঁচ মিনিট আগে গিয়ে হাজির হলাম। লোক বেশ ভালই হয়েছে, প্রায় হাউসফুল।
