কেন বলছেন এ-কথা?
ও পাথর শয়তান পাথর। যখন কিনি তখন আমি এটা জানতাম না। ওর প্রথম মালিক ছিল লুক্সেমবুর্গের কাউন্ট ড্ডারিয়ান। সে তার কেল্লার ছাত থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। তার দেহের একটা হাড়ও আস্ত ছিল না। তারপর এই পান্না উনিশ জনের হাতে ঘোরে। উনিশ জনই আত্মঘাতী হয়। আমি এটা জেনেও পান্নাটি হাতছাড়া করিনি, কারণ এমন আশ্চর্য সুন্দর পাথরের সঙ্গে যে এত ট্র্যাজিডি জড়িয়ে থাকতে পারে সেটা আমি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আমার মৃত্যুর জন্য ওই পাথরই দায়ী। আজ যে আমার ছেলের মাথাখারাপ হয়েছে তার জন্যও ওই পাথর দায়ী। আমার নাতির এখনও কিছু হয়নি, কিন্তু ভবিষ্যতে…
প্রেতাত্মা কথা থামালেন। আমি বললাম, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমি ওই পান্নাকে বিদায় করতে পারব।
তবে আমি আসি।
চাঁদের আলোয় প্রেতাত্মা ক্রমে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি বাকি রাত আর ঘুমোতে পারলাম না।
.
পরদিন সকালে দেওয়ানকে বললাম রাত্রের ঘটনা। দেওয়ান তো শুনে থ। বললেন, কিন্তু আমি এমন পাথরের কথা জানি না। আমি বললাম, যাই হোক, আলমারির দেরাজটা একবার খুলে দেখতে হয়।
আলমারির দেরাজ খুলে লাল মখমলের বাক্সে পান্নাটা পেতে কোনওই অসুবিধা হল না। পাথর দেখে আমার চক্ষুস্থির। এমন পান্না আমি জীবনে দেখিনি।
এবার সাহেবকে ডেকে বললাম, সাহেব তুমি পাথর চাইছিলে, একটা আশ্চর্য পাথর আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে বটে, কিন্তু সেটা আমার বাবার কেনা, তাই হাতছাড়া করতে দ্বিধা হচ্ছিল। পরে ভেবে দেখলাম, তুমি সম্মানিত অতিথি, এবং দূর থেকে এসেছ, তোমাকে বিমুখ করার কোনও মানে হয় না। দেখো তো এই পান্নাটা তোমার পছন্দ হয় কিনা।
পান্না দেখে সাহেবের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। দুবার অস্ফুট স্বরে বললেন, ইট এ বিউটি…ইটস এ বিউটি! তারপর বললেন, আমি আর কিছু নেব না।
পান্না সাহেবের হাতে চলে গেল, আর আমাদের হাতে এল একটা চেক।
আশ্চর্য এই যে, বিকেলে হাসপাতাল থেকে খবর এল যে, রাজা অনেকটা সুস্থ বোধ করছেন।
সাহেবের তরফ থেকে শিকার তেমন জমল না, কারণ জঙ্গল হাঁকোয়াদের কেনেস্তারা পেটানোর চোটে বাঘ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সাহেবের হাতির কাছে এসে পড়া সত্ত্বেও সাহেবের নিশানা অব্যর্থ হল না। শেষটায় আমার গুলিতেই বাঘ মরল।
পরের দিন সাহেব দিল্লি চলে গেলেন।
দু দিন পরে কাগজে দেখলাম দিল্লির এয়ারপোর্ট থেকে একটি প্যান অ্যামেরিকান বিমান টেক অফ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার এঞ্জিনে একটা শকুন ঢুকে পড়ে। প্লেন বিকল হয়ে গোঁৎ খেয়ে মাটিতে পড়ে। যদিও কেউ মারা যায়নি, যাত্রীদের মধ্যে জনা পঁচিশেককে নাভাস শকের জন্য হাসপাতাল যেতে হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন ধনকুবের অস্কার এম. হোরেনস্টাইন।
নীলকমল লালকমল শারদ সংখ্যা, ১৩৯৩
মহিম সান্যালের ঘটনা
তারিণীখুড়ো তাকিয়াটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, চমকালের কথা তো তোদের বলেছি, তাই না?
হ্যাঁ হ্যাঁ, বলল ন্যাপলা। সেই ম্যাজিশিয়ান তো? যাঁর আপনি ম্যানেজার ছিলেন?
হ্যাঁ। কিন্তু আরেকজন জাদুকর আছেন–অবিশ্যি যখনকার কথা বলছি তখন তিনি রিটায়ার করেছেন–যাঁর আমি সেক্রেটারি ছিলাম।
রিটায়ার করলে আবার সেক্রেটারির কী দরকার? বলল ন্যাপলা।
তাঁর ক্ষেত্রে দরকার ছিল। সেটা ব্যাপারটা শুনলেই বুঝতে পারবি।
তা হলে বলুন সে গল্প।
বলছি–আগে এই জানলাটা বন্ধ করে দে তো। বৃষ্টির ছাট আসছে।
আমি উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিলাম।
তারিণীখুড়ো দুধ চিনি ছাড়া গরম চায়ে একটা সশব্দ চুমুক দিয়ে তাঁর গল্প আরম্ভ করলেন।
বছর পনেরো আগের ঘটনা। আমি তখন সবে কানপুরে একটা ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে কলকাতায় এসেছি। হাতে কাজ নেই, কিন্তু পকেটে পয়সা জমেছে বেশ কিছু। নতুন কী করা যায় ভাবছি, এমন সময় আমার এক পুরনো আলাপী জগন্নাথ পাকড়াশির সঙ্গে দেখা। সে বলল, তোমাকেই খুঁজছিলুম। আমি বললাম, কেন, কী ব্যাপার? মহিম সান্যালের নাম শুনেছ? জাদুকর মহিম সান্যাল? হ্যাঁ হ্যাঁ। তিনি অবিশ্যি এখন রিটায়ার করেছেন, কিন্তু কেন জানি তাঁর একজন সেক্রেটারির দরকার পড়েছে। ইংরিজি আর টাইপিং জানা চাই। আমার তোমার কথা মনে পড়ল।
আমি বললাম, চাকরি একটা হলে মন্দ হত না। কিন্তু এ ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ করব কী করে?
মহিম সান্যাল থাকেন পাম এভিনিউতে। দাঁড়াও দেখি, আমার কাছে হয়তো তাঁর ঠিকানা রয়েছে। পাকড়াশির নোটবুকে মহিম সান্যালের ঠিকানাটা ছিল, সেটা আমার নোটবুকে টুকে নিলাম।
দুদিন পরে ছিল রোববার। সকালে সোজা চলে গেলুম সান্যাল মশাইয়ের বাড়ি। বেশ গোছালো, ছিমছাম একতলা বাড়ি, যদিও বেশি বড় না।
ভদ্রলোককে দেখেই ভাল লেগে গেল। বয়স ষাট-বাষট্টি, মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে, চেহারায় একটা শান্ত গাম্ভীর্য, অথচ ঠোঁটের কোণে একটা হাসি লেগে আছে সব সময়।
আমি নিজের পরিচয় দিলাম। ভদ্রলোক মিনিট পনেরো ধরে আমাকে নানারকম প্রশ্ন করে একটু বাজিয়ে দেখে নিলেন। বোধহয় ভালই ইমপ্রেশন দিলাম, কারণ ভদ্রলোক বললেন, তোমাকে দিয়ে আমার কাজ চলবে বলে মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, কাজটা কী সেটা জানতে পারি কি?
আমার ম্যাজিক দেখেছ কখনও? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।
