আমি মনে মনে ঠিকই করে রেখেছিলাম যে, সাহেব মেজাজ দেখালেও আমি দেখাব না। আমার সঙ্গে দেখা হতে রাগ আর রসিকতা মিলিয়ে সাহেব বললেন, ওয়েল, মহারাজ–হোয়াট কাইন্ড অফ এ ওয়েলকাম ইজ দিস? মাঝরাস্তায় আমাকে পনেরো মিনিট রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হল!
আমি যথাসাধ্য অ্যাপলাইজ করলুম, বললুম যে আর কোনও গলতি হবে না সে গ্যারান্টি দিচ্ছি। সাহেব চেয়ারে বসলেন, তাঁর জন্য শরবত এল, সেটা খেয়ে যেন মাথাটা ঠাণ্ডা হল। আমি বললাম, তুমি এখানে কী কী করতে চাও সেটা আমাকে বলো। অবিশ্যি আমার মোটামুটি জানাই আছে, আর সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও করেছি, কিন্তু আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।
সাহেব বললেন, আমার শিকারের শখ আছে, আমি বাঘ মারতে চাই–সে ব্যবস্থা করেছ?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম, করেছি।
আর আমি তোমার সংগ্রহ থেকে কিছু জিনিস কিনতে চাই আমার সংগ্রহের জন্য। বিশেষ করে সামনের বছর আমাদের বিয়ের রজতজয়ন্তী। আমার স্ত্রীর জন্য একটা ভাল উপহার আমি নিয়ে যেতে চাই। আশা করি তেমন জিনিস আছে তোমার সংগ্রহে।
সেটা তুমি দেখলেই বুঝতে পারবে। ভাল জিনিসের অভাব নেই আমার দেড়শো বছরের সংগ্রহে।
দুপুরে খাবার পর সাহেবকে সংগ্রহশালায় নিয়ে যাওয়া হল। আমিও অবশ্য প্রথম দেখলুম জিনিসগুলো। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। এমন মহামূল্য জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাবে ভাবতে আমার খারাপ লাগছিল। হোরেনস্টাইন দেখলাম সমঝদার লোক। সে চটপট কেনবার মতো জিনিস আলাদা করে রাখতে লাগল। সবসুদ্ধ প্রায় দশ লাখ টাকার জিনিস এইভাবে বাছল। কিন্তু তাও তার কপাল থেকে ভ্রূকুটি যায় না। ব্যাপার কী? শেষটায় সে বলল, সবই হল, কিন্তু ক্যাথলিনের উপযুক্ত কিছু পেলাম না এখনও কোনও ভাল ডায়মন্ড ব্রোচ জাতীয় জিনিস তোমার নেই? আমার স্ত্রীর পাথরের উপর ভীষণ ফ্যান্সি। একখানা ভাল পাথরও যদি পেতাম তার জন্য!
আমি মাথা নেড়ে আক্ষেপ জানালাম। ভেরি সরি, মিঃ হোরেনস্টাইন। পাথর থাকলে আমি তোমাকে নিশ্চয়ই দিতাম।
দিনের বেলাটা সাহেবকে রাজার বড় গাড়ি লাগতে ঘুরিয়ে শহরের নানান দৃশ্য দেখানো হল। সন্ধ্যায় দুজনে বসে কিছুক্ষণ দাবা খেললাম। বুঝতেই পারছিলাম সাহেব তাঁর গিন্নির জন্য লাগসই উপহার পেলেন না বলে তাঁর মনটা ভারী হয়ে রয়েছে, এবং তাই তাঁর চালে ভুল হচ্ছে। কিন্তু মেজাজের কথা মাথায় রেখে আমি আরও বেশি ভুল চাল দিয়ে তাঁকে জিতিয়ে দিলুম।
রাত্রি নটায় যোড়শোপচারে ডিনার খেয়ে কফি আর ব্রান্ডিতে কিছুটা সময় দিয়ে সাহেব শুতে চলে গেলেন সফেদকোঠিতে। রাজা নিজে মদ্যপান করেন না, আমিও করি না–এখানে মিলেছে ভাল। আমি শুধু কফি আর একটা ভাল হাভানা চুরুট খেয়ে উঠে পড়লাম। দেওয়ান নিজে এলেন আমাকে লালকোঠিতে পৌঁছে দিতে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাজা আজ আছেন কেমন? দেওয়ান মাথা নেড়ে আক্ষেপসূচক শব্দ করে বললেন, সেইরকমই। ভুল বকছেন, হাসপাতালের নার্সদের। খুব জ্বালাচ্ছেন। ডাক্তাররাও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন।
লালকোঠিতে গিয়ে দেখি এখানে খাট বিছানা তোশক বালিশ সবই অনেক ভদ্রস্থ, অর্থাৎ আমার উপযোগী। দেওয়ানজি যাবার সময় বলে গেলেন, আপনার সাহসের তুলনা নেই। এই ঘরে রাজা শত্রুঘ্ন সিং মারা যাবার পর এই প্রথম মানুষ বাস করছে। আমি বললাম, কোনও চিন্তা করবেন না। আমি সব অবস্থাতেই নিজেকে সামাল দিতে পারি।
খাটের পাশে একটা ল্যাম্প রয়েছে; সেটা জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ মন্দোরের ইতিহাস সম্বন্ধে একটা বই পড়ে সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাতি নিভিয়ে দিলাম। পশ্চিমে একটা বড় জানলা রয়েছে, সেটা দিয়ে একসঙ্গে চাঁদের আলো আর ঝিরঝিরে বাতাস আসছে, চোখে ঘুম আসতে বেশি সময় লাগল না।
ঘুমটা ভাঙল যখন, তখন চাঁদ নেমে গিয়ে ঘরের ভিতরটা আবছা আলোয় ভরে গেছে। চোখ চেয়েই বুঝলাম যে, ঘরে আমি একা নই। দরজা যদিও বন্ধই আছে তবু জানলার পাশে একজন লোক সোজা আমার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমারই মতন লম্বা আর আমারই ধাঁচের চেহারা, কেবল গোঁফটা আমার চেয়ে একটু বেশি পুরু। চাঁদের আলোয় খুব স্পষ্ট বোঝা না গেলেও লোটা যে গাঢ় রঙের বিলিতি পোশাক পরে রয়েছে সেটা বুঝতে পারলাম।
আমি কনুইয়ে ভর দিয়ে একটু উঠে বসলাম। বুকের ভিতরে একটা মৃদু কাঁপুনি অনুভব করছিলাম, কিন্তু সেটাকে আমি ভয় বলতে রাজি নই। বেশ বুঝতে পারছি যে যিনি প্রবেশ করেছেন। তিনি জ্যান্ত মানুষ নন; তিনি প্রেতাত্মা। এবং ইনি যে বর্তমান মহারাজার বাপ শত্রুঘ্ন সিং-এর প্রেতাত্মা তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। ইনিই এই ঘরে নিজের মাথায় রিভলভার মেরে আত্মহত্যা করেছিলেন।
অ্যাই হ্যাভ কাম টু টেল ইউ সামথিং গম্ভীর গলায় বললেন প্রেতাত্মা। বাকি কথাও ইংরিজিতে হল, আমি সেটা বাংলায় বলছি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী বলতে এসেছেন আপনি?
আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমি একটা মহামূল্য পাথর কিনেছিলাম ভিয়েনাতে একটা নিলামে। সেটা একটা পান্না। তার নাম ছিল ডোরিয়ান এমারেন্ড। এমন পান্না সচরাচর দেখা যায় না।
সে পান্না কী হল?
এখনও আছে। আমার ছেলের আলমারির দেরাজে একটা মখমলের বাক্সতে। যদি পারো তো সেটা বিক্রি করে দাও। খরিদ্দার যখন পেয়েছ তখন এ সুযোগ ছেড়ো না।
