আমি বললুম, নির্ভয়ে বলুন।
রমণীমোহন কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে চেয়ে থেকে বলল, আপনার অভিনয় আসে?
হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
কারণ আমার সঙ্গে আপনার চেহারার মিল আছে। সে কথা আমার বেয়ারা প্রসন্নও বলছিল। ভাবছিলুম, আমার বদলে আপনি যদি আমার বাড়ি থেকে মেক-আপটা করে নিয়ে পোশাকটা পরে। আমার হয়ে অভিনয়টা করে দিয়ে আসতেন। অবিশ্যি, কিছু লোককে ব্যাপারটা বলতেই হবে। যেমন মেক-আপম্যান যতীন, তার সহকারী হাবুল, আর ড্রেসার তারাপদ। তাদের হাতে কিছু খুঁজে দিলে তারা কখনওই ব্যাপারটা ফাঁস করবে না।
আমি বললাম, তার মানে অভিনয় করবেন তারিণী বাঁড়জ্জে আর নাম হবে রমণী চ্যাটুজ্যের?
এ-ছাড়া আর রাস্তা আছে কি?
আর প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজটা কে করবে?
সেটার একটা অন্য ব্যবস্থা করবে ওরা। আপনি বলে দেবেন বোম্বাই থেকে একটা ভাল অফার পেয়েছেন, তাই চলে যাচ্ছেন।
কথাটা মন্দ বলেননি। কিন্তু যদি অভিনয় আমার ভাল হয়, আর তার জন্য যদি কোনও সংস্থা পুরস্কার ঘোষণা করে, তা হলে সেটাও তো আপনিই নেবেন?
তা তো নিতেই হবে। তবে আপনাকে পারিশ্রমিক ছাড়াও আমি একটা জিনিস দিতে রাজি আছি।
কী জিনিস?
আমার এই মোগলাই আংটি। আজকের বাজারে এর দাম কত জানেন তো?
পুরনো ভাল জিনিসের উপর আমার মোহ আছে সেটা তো তোরা জানিস। সেটা তখনও ছিল। বলে দিলুম ঠিক হ্যায়। আমি আপনার প্রস্তাবে রাজি। কিন্তু সবচেয়ে আগে আপনার চিত্রনাট্যটি চাই। ডায়ালগ মুখস্থ করতে হবে তো।
রমণীমোহন তৎক্ষণাৎ তাঁর ফাইলটা এনে আমায় দিলেন।
সেইদিনই বিকেলে মিঃ মুস্তাফির কাছে গিয়ে বললুম যে রমণীমোহন আরেকটা চান্স চাইছে। বলছে, এবার না হলে যেন তাকে বাদ দেওয়া হয়। মুস্তাফি মশাই রাজি হয়ে গেলেন, ওদিকে পরিচালক মশাইকেও খবরটা দিয়ে দেওয়া হল।
রমণীমোহনকে সুস্থ হবার সময় দিয়ে পনেরো দিন পরে শুটিং রাখা হল। অন্যদের কাজের তারিখ আর স্টুডিওর বুকিংও সেভাবে বদলে দেওয়া হল। যাদের দলে টেনে নেবার কথা তাদের সকলকেই তালিম দেওয়া হয়ে গেছে। আমার জায়গায় নতুন প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে গেছে। তাঁকেও দলে টেনে নিয়েছি, কারণ প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছে কোনও কিছু লুকোনো বড় কঠিন ব্যাপার। আমি মুস্তাফি মশাইকে অবিশ্যি জানিয়ে দিয়েছি যে একটা ভাল চান্স পেয়ে বোম্বে চলে যাচ্ছি, এ ছবিতে আর আমার কাজ করা সম্ভব হবে না।
যথারীতি শুটিং-এর দিন এসে পড়ল। সকাল দশটায় রমণীমোহনের লাল শেভ্রোলে এসে ঢুকল ভারত মাতা স্টুডিওতে। তার থেকে আলমগীরের বেশে নামলেন তারিণী বাঁড়জ্জে কার বাপের সাধ্যি ধরে যে অ্যাকটর চেঞ্জ হয়ে গেছে!
সেই একই দৃশ্য ভোলা হবে, সব তৈরি, সবাই তৈরি, স্টার্ট সাউন্ড বলে চেঁচিয়ে উঠলেন পরিচালক। সাউন্ডম্যানের কাছ থেকে উত্তর এল রানিং।
অ্যাকশন।
আলমগীর তাঁর বাবার সামনে এসে অত্যন্ত সাবলীলভাবে তাঁর কথা বলে গেলেন; শট-এর শেষে পরিচালক কাট বলতেই হাততালিতে স্টুডিও গমগম করে উঠল।
সারাদিনের তেরোটি শট-এর একটিতেও রমণী-তারিণী ঠেকলেন না।
ছবি শেষ হতে লাগল পাঁচমাস। তোরা তখন জন্মাসনি তাই তোদের খবরটা দিতে হচ্ছে যে আলমগীর হয়েছিল সুপারহিট, আর রমণীমোহন বছরের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তিনটে সংস্থা থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। অবিশ্যি তাঁর কেরিয়ারের শুরু এবং শেষ এই একটি ছবিতে, কারণ তাঁর গুরু তাঁকে ফিল্মে অভিনয় করতে বারণ করায় সে প্লাস্টিকের ব্যবসায় চলে যায়। আর আমি হয়তো নিজের নামে ছবিতে একটা চান্স নিতে পারতুম, কিন্তু তখনই উদয়পুরে একটা ভাল চাকরি জুটে গেল। আমার কাছে তখন থেকেই নতুন দেশ দেখার চেয়ে বড় আর কিছু নেই, তাই আর দ্বিধা না করে পাড়ি দিলুম রাজস্থানে। অবিশ্যি সেটা আরেক গল্প।
তা হলে সেটাও হোক। বলল ন্যাপলা।
তা কী করে হবে, বললেন তারিণীখুড়ো, আগে যেটা বলছি সেটা শেষ হোক।
আমরা তো অবাক। এ গল্পে আর কী থাকতে পারে?
আমি যে দ্বৈত ভূমিকা বা ডবল পার্ট করেছিলুম সেটাই তো তোদের বলা হয় নি। বললেন তারিণীখুড়ো, তাঁর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।
কীরকম, কীরকম? আমরা সকলে একসঙ্গে বলে উঠলাম।
আমার বন্ধু ব্ৰতীনকে দিয়ে রমণীমোহনকে আমিই বলালুম যে নতুন কাজে নামার আগে একবার ভাগ্য গণনা করিয়ে নাও। তখন ব্রতীনই তো জ্যোতিষার্ণবকে নিয়ে যায় রমণীমোহনের কাছে। কে সেই জ্যোতিষার্ণব? হুঁ হুঁ–স্বয়ং তারিণীচরণ বাঁড়জ্জে। নিজের হাতে তৈরি মেক-আপ, নিজের হাতে লেখা সংলাপ। বাজিমাত না হয়ে যায় কোথায়?
সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯২
টেরোড্যাকটিলের ডিম
বদনবাবু আপিসের পর আর কার্জন পার্কে আসেন না।
আগে ছিল ভাল। সুরেন বাঁড়ুজ্যের স্ট্যাচুর পাশটায় ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে বিশ্রাম করে তারপর ট্রামের ভিড়টা একটু কমলে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় শিবঠাকুর লেনে বাড়ি ফিরতেন।
এখন ট্রামের লাইন ভিতরে এসে পড়ায় পার্কে বসার আর সে আনন্দ নেই। অথচ এই ভিড়ে গলদঘর্ম অবস্থায় ঝুলতে ঝুলতে বাড়ি ফেরাই বা যায় কী করে?
আর শুধু তাই নয়। দিনের মধ্যে একটা ঘণ্টা অন্তত একটু চুপচাপ বসে থেকে কলকাতার যেটুকু খোলামেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে সেটুকু উপভোগ করা–এ না হলে বদনবাবুর যেন জীবনই বৃথা। রোনি হলেও কল্পনাপ্রবণ তিনি। এই কার্জন পার্কেই বসে মনে মনে তিনি কত গল্পই কেঁদেছেন। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি কোনওদিন। সময় কোথায়? লিখলে হয়তো নামটাম করতে পারতেন এমন বিশ্বাস তাঁর আছে।
