সব রেডি? হাঁক দিয়ে প্রশ্ন করলেন পরিচালক জগদীশ নস্কর। নস্কর সাহেব হচ্ছেন সেই জাতের পরিচালক যিনি যার যার কাজ তাকে তাকে দিয়ে নিজে পরম নিশ্চিন্ত বোধ করেন। কেবল পরিচালনার সময়টুকুতেও তাঁর ব্যক্তিত্বে একটা পরিবর্তন আসে। তাও সেটা বেশি না। আর এঁর আরেকটি অভ্যাস হচ্ছে যে ইনি কাজের মধ্যে সামান্যতম ফাঁক পেলেই একটু বসে নেন, এবং আরামকেদারা পেলে কক্ষনও মোড়া বা কাঠের চেয়ারে বসেন না।
সব্বাই রেডি ছিল, কাজেই শট নেওয়ায় কোনও বাধা নেই, কিন্তু রমণীমোহন দেখছি ঘেমেই চলেছেন। মেক-আপ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রতি তিন মিনিট অন্তর তোয়ালে দিয়ে তাঁর মুখ প্যাড করে দিচ্ছে, কিন্তু তাও ঘামের অন্ত নেই। স্টুডিওতে বৈশাখ মাসে গরম ঠিকই, কিন্তু এখন তো চতুর্দিকে বিরাট বিরাট পাখা চলছে; শট-এর সময়ে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কী অবস্থা হবে?
শুটিং-এ একটা রেওয়াজ আছে যে প্রথম দিনের প্রথম শটটা একবার উতরে গেলে সবাই হাততালি দেয়। বিশেষ করে নতুন অভিনেতা হলে তো কথাই নেই।
কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপ ও বিস্ময়ের ব্যাপার যে পর পর সাতবার চেষ্টার পরেও হাততালির সুযোগ এল না, এবং তার জন্য দায়ী স্বয়ং আলমগীর বাদশা। তাঁর ডায়ালগ ছিল অতি সহজ। বাপকে তিনি বলবেন, আমি তো আগেই বলেছি, আমার পথে কোনও বাধা আমি সহ্য করব না। এই কয়েকটি কথা পর পর আমার পথে কোনও বাধা আমি সহ্য করব না–এটা একবার হল আমার বাধা আমি কোনও পথে সহ্য করব না, তারপর হল, আমার সহ্যের পথে আমি কোনও বাধা দেব না, তারপর হল, আমি কোনও পথেই আমার সহ্যে বাধা দেব না, আর চতুর্থবার পরিচালক হুঙ্কার দিয়ে অ্যাকশন বলার পরে আওরঙ্গজেবের মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোল না। আমি দেখি তার পা ঠকঠক করে কাঁপছে। সে তার কাছেই একটা সিংহাসন গোছের গদির চেয়ার ছিল, তাতে বসে মাথার পাগড়িটা খুলে ফেলল। তারপর বলল যে তার ব্লাড প্রেশার নাকি মাঝে মাঝে অত্যন্ত বেশি নেমে যায়, সম্ভবত এখনও তাই হয়েছে, তাই একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হয়।
রিহার্সাল মোটামুটি ঠিক হয়েছিল বলে সকলে আরও অবাক, কিন্তু আমি তো জানি যে শট নেবার ঠিক আগে যে মুখের সামনে খটাস করে ক্ল্যাপস্টিক মারা হয়, তাতে অনেক পাকা অভিনেতাও টসকে যায়। এখানেও তাই হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ডাক্তার এসে বললেন প্রেশার নামলেও তেমন কিছু নয়, কিন্তু অভিনেতাকে দিয়ে আজকে আর কাজ না করানোই ভাল।
রমণীমোহন বাড়ি চলে গেলেন। পরিচালক একা শাজাহানকে নিয়ে গোটা পাঁচেক শট নিয়ে তিনটের মধ্যে কাজ শেষ করে দিলেন।
কিন্তু বাকি কাজ কবে হবে?
আর এই রমণীমোহনকে দিয়ে আদৌ কাজ চলবে কি? নাকি, শেষ মুহূর্তে অন্য অভিনেতা দেখতে হবে?
আমার বস মিঃ মুস্তোফি আমায় ডেকে বললেন, তুমি একবারটি ওই ছোঁকরার বাড়িতে গিয়ে সঠিক খবরটা নিয়ে এসে তো। সে নিজে কী মনে করে সেটা জানা দরকার। সে ফ্র্যাঙ্কলি বলুক সে পারবে কি না। যদি কদিন সময় চায় তাও দিতে রাজি আছি, কারণ চেহারার দিক দিয়ে ওকে মানিয়েছিল চমৎকার। হয়তো জড়তাটা টেম্পোরারি। অবিশ্যি দ্বিতীয় দিনেও এই একই ব্যাপার ঘটলে অন্য লোক নিতেই হবে।
মুস্তোফি সাহেব যেন একবার ভুরু কুঁচকে আমার দিকে চাইলেন, ভাবটা যেন–একে দিয়েও তো কাজটা চলতে পারত। কিন্তু তারপর আর কিছু বললেন না, আর আমিও চেপে গেলুম।
.
দুদিন পরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রমণীমোহনের ট্যাপোর কাসল রোডের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলুম। বেয়ারা আমায় বৈঠকখানায় বসানোর এক মিনিটের মধ্যে বাবু এসে ঢুকলেন। দেখলুম এই কদিনে ওর বয়স যেন বেড়ে গেছে দশ বছর। বললুম, কী ব্যাপার বলুন তো? এরকম হল কেন?
ভদ্রলোক গভীর আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, কী আর বলব বলুন, শুটিং-এর তিনদিন আগে আমার এক বন্ধু এক জ্যোতিষী এনে হাজির করে বলল-নতুন কাজে হাত দিতে যাচ্ছ, এঁকে দিয়ে একবার ভাগ্যটা যাচাই করে নাও। আমিও আপত্তি করলুম না, কারণ ওসবে আমার বেশ আস্থা আছে। আর এঁর নাকি জ্যোতিষার্ণব-টার্ণব উপাধি আছে, চেহারাও বেশ ইমপ্রেসিভ। কিন্তু মশাই, হাত দেখার আগেই আমার মাথার দুদিকের রগ বুড়ো আর কড়ে আঙুলে। টিপে লোকটা কী বললে জানেন? বললে, এ লাইন তোমার নয়। অভিনয়ের দিকে যেও না; গেলেই হোঁচট খেতে হবে।–ভেবে দেখুন তো কী কথা! তিনদিন বাদে শুটিং, পার্ট মুখস্থ হয়ে গেছে, আর লোকটা বলে কি না আমায় দিয়ে অ্যাকটিং হবে না? সাধে কি ডায়ালগ গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল? যেই মুখ খুলতে যাব অমনি জ্যোতিষীর মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে, আর কে যেন গলার ভেতর পাথর গুঁজে দিচ্ছে। ওফ! সে যে কী অবস্থা, সে আর আপনাকে কী করে বোঝাব? রাজ্যি সুন্ধু লোক জেনে গেছে আমি আলমগীর করছি আর সেই সময় অকেজো বলে বাদ হয়ে যাওয়া–এর চেয়ে বেশি অপমান আর কী হতে পারে বলুন?
আমি আর কী করি? যথাসাধ্য সহানুভূতি দেখালুম। জিজ্ঞেস করলাম, কী করলে পরে এই বিভীষিকা আপনার মন থেকে দূর হতে পারে? কারণ আপনার মধ্যে যে অ্যাকটিং আছে সে তা আমরা রিহার্সেলেই দেখেছি।
রমণীমোহন মাথা নাড়ল। ঘাড় হেঁট ছিল, এবার মুখ ভোলাতে দেখলুম চোখে জল। আমার হাত দুটো ধরে অত্যন্ত করুণ সুরে বললে, কতদিনের যে স্বপ্ন সিনেমায় অভিনয় করে নাম করব। আর সেই সুযোগ এসেও গ্রহের ফেরে বানচাল হয়ে গেল! এখন আপনি যদি কোনও রাস্তা বাতলাতে পারেন। আমার নিজের মাথায় একটা রাস্তা এসেছে কিন্তু সেটা সভয়ে বলব না নির্ভয়ে বলব বুঝতে পারছি না।
