আমার দৃষ্টিও চলে গেছে লক্ষ্মীকান্তের দিকে, এবং সেই সঙ্গে রক্ষিত মশাইয়েরও। এই নাক, এই থুতনি, এই চওড়া কপাল, চোখের এই তীক্ষ্ণ চাহনি–এ কোথায় দেখেছি? অ্যাদ্দিন তো এর মুখের দিকে ভাল করে চাইনি। কেন চাইব? অকারণে বেয়ারার দিকে কে চেয়ে থাকে?
প্রায় তিনজনের মুখ দিয়েই একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল একটা নাম–
শরৎ কুণ্ড!
হ্যাঁ, কোনও সন্দেহ নেই, শরৎ কুণ্ডু এখন হলেন তাঁর এককালের ফিল্মের জুটি রতন রক্ষিতের খাস বেয়ারা।
কী ব্যাপার হে শরৎ? এতক্ষণে চেঁচিয়ে উঠলেন রতন রক্ষিত। তুমি আমার বাড়িতে–?
শরৎ কুণ্ডুরও মুখে কথা ফুটতে সময় লাগল।
কী আর করি, অবশেষে কপালের ঘাম মুছে বললেন ভদ্রলোক, নেহাত ইনি চিনলেন বলেই তো তোমরা চিনলে; অ্যাদ্দিন তো বুঝতে পারোনি! আর চল্লিশ বছর বাদে দেখে বুঝবেই বা কী করে! একদিন মীরচান্দানির ওখানে চাকরির আশায় গিয়ে শুনি তুমি নাকি এসে আমাদের সেই আদ্যিকালের ছবির অনেকগুলো কপি কিনে নিয়ে গেছ নিজের সংগ্রহের জন্য। ভাবলাম তোমার এখানে এসে নিশ্চয়ই সেসব ছবি আবার দেখতে পাব। এমনিতে তো দেখার কোনও সুযোগ নেই। সেসব ছবি যে এখনও টিকে আছে তাই জানতাম না। তাই বেয়ারার চাকরির জন্য চলে এলাম তোমার কাছে। তুমি আমায় চিনলে না, চাকরিও হয়ে গেল। কুলিগিরিও করেছি, বেয়ারার কাজ তো তার কাছে স্বর্গ। আর ভালও লাগছিল। সে যুগের ছবিতে কথা না বলে অভিনয় করেছি, সে তো নেহাত নিন্দের নয়! অবিশ্যি সেসব দেখার সুযোগ বোধহয় এখন বন্ধই হয়ে গেল!
কেন, বন্ধ হবে কেন? রক্ষিত মশাই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছেন। তুমি এখন থেকে হবে আমার ম্যানেজার! তারিণীর সঙ্গে এক ঘরে বসবে তুমি; আমার এখানেই থাকবে, সন্ধেবেলা একসঙ্গে সে ছবি দেখব আমরা। এককালের জুটি ভেঙে গিয়েছিল দৈব দুর্বিপাকে, আবার এখন থেকে জোড়া লেগে গেল। কী বলো তারিণী?
আমি দেখছি নরেশ সান্যালের দিকে। তাঁর মতো এমন হতভম্ব ভাব আমি অনেকদিন কারুর মুখে দেখিনি। তবে তাঁর পক্ষে নির্বাক যুগের এই বিখ্যাত জুটির পুনর্মিলন যে একটা বড়রকম সাংবাদিক দাঁও হল, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে কি?
আনন্দ বার্ষিকী, ১৩৯২
টলিউডে তারিণীখুড়ো
তাকিয়াটাকে কোলের উপর টেনে নিয়ে আরও জমিয়ে বসে ঝুঁকে পড়ে তারিণীখুড়ো তাঁর গল্প আরম্ভ করলেন। —
আমার তখন তেইশ বছর বয়স, তবে একটা তেকোনা ফ্রেঞ্চকাট গোছের দাড়ি রেখেছিলাম বলে মনে হত তেত্রিশ। বেয়াল্লিশ সালের কথা বলছি। তখন যুদ্ধ চলেছে পুরোদমে, কলকাতার রাস্তাঘাটে খাকি পরা জি. আই. সেনা ঘোরাফেরা করছে, শহরের চেহারাটাই পালটে গেছে। জোড়া জোড়া মার্কিন মিলিটারি পুলিশ চৌরঙ্গিতে টহল দিয়ে ফেরে, তাদের জামার আস্তিনে কুনুই-এর ওপর লেখা এম. পি.। সিনেমা হাউসগুলো খালি পড়ে থাকে না কখনও; ম্যাটিনি-ইভনিং-নাইট তিনটেই হাউস ফুল, সব ছবিই হিট, তা সে দিশিই হোক আর বিলিতিই হোক। আমাদের টলিউডের
স্টুডিওগুলো গমগম করছে, কুইক মানির লোভে রোজই টাকাওয়ালা নতুন নতুন প্রোডিউসার। আসছে। তারা জানে ছবি একবার লেগে গেলে কোনও ব্যবসাতে চটজলদি এত লাভ হয় না। আমার মেজোমামার এক সহপাঠী, নাম পরেশ মুস্তোফি, তিনি ভারত মাতা স্টুডিওর মালিক। আমাকে ডেকে পাঠিয়ে যেচে একটা চাকরি দিলেন প্রোডাকশন ম্যানেজারের। কাজটা নেহাত ফেলনা নয়; একটা ছবি হলে পরে সবাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, খরচের হিসেব রাখা, আর্টিস্ট আর কর্মীদের পেমেন্ট করা, এমন কী উঁচ থেকে হাতি পর্যন্ত যা কিছু একটা ছবিতে লাগবে সব কিছু জোগাড় করার ভার আমার উপর। তখন বয়স কম, তা ছাড়া টুপাইস রোজগার হচ্ছে, খাটনি হলেও কাজটা ভালই লাগছিল।
সেই সঙ্গে এটাও বলা দরকার যে ভেতরে ভেতরে আমার অভিনয়ের একটা শখ ছিল। আমার চেহারাটা যে এককালে ভাল ছিল, সেটা তো তোমাদের বলেইছি। তা ছাড়া আমি ছিলাম হলিউডের ছবির পোকা। বাংলা ছবিতে তো আর অভিনয় হত না, হত রঙ তামাশা। আমি দেখি পৃথিবীর সব সেরা স্টারের অভিনয়, যাকে দেখে অভিনয় বলেই মনেই হয় না। অবিশ্যি সেই সঙ্গে ভাল বাংলা পেশাদারি থিয়েটারও বাদ দিই না, কারণ শিশির ভাদুড়ী, যোগেশ চৌধুরী মনোরঞ্জন ভট্টাচায্যি–এঁরা সব ছিলেন বাঘা বাঘা অভিনেতা। কিন্তু যেচে গিয়ে বলব আমায় একটা পার্ট দিন, তেমন সাহস তখনও হয়নি। তবে স্টুডিও পাড়ায় থাকলে কোনও প্রযোজক বা পরিচালকের চোখে পড়ে গিয়ে সুযোগ যে আসবে না, এমনই বা কে বলতে পারে?
একদিন জানতে পারলাম যে আলমগীর ছবি হচ্ছে আমাদের এই ভারত মাতা স্টুডিওতেই, আর স্টুডিওই টাকা ঢালছে সে ছবিতে। বস মুস্তাফি সাহেব আমাকে ডেকে সব ডিটেল বললেন। তখনকার নামকরা পরিচালক জগদীশ নস্কর পরিচালনা করবেন, সেরা অভিনেতারা সব অভিনয় করছেন। তবে নাম ভূমিকায়–অর্থাৎ আলমগীরের চরিত্রে–একটি নতুন লোককে নেওয়া হচ্ছে। এর নাম রমণীমোহন চ্যাটার্জি, সুন্দর চেহারা, উচ্চবংশের ছেলে, অনেক পয়সা। মুস্তাফিমশাই নিজেই নাকি ছেলেটিকে এক বিয়ে বাড়িতে দেখে সোজাসুজি অফারটা দেন, এবং ছেলে নাকি এককথায় রাজি হয়ে যায়।
রমণীমোহন চ্যাটার্জি নামটা চেনা চেনা লাগছিল কেন বুঝতে পারছিলাম না, শেষটায় হঠাৎ মনে পড়ল যে শ্যামবাজারের একটা ক্লাবে আমারই স্কুলের সহপাঠী ব্রতীন থিয়েটার করে, তার কাছে শুনেছি এই রমণীমোহবে কথা। চেহারা ভাল–অনেকটা তোর মতো দেখতে বলেছিল ব্রতীন, আর অ্যাকটিংটাও নাকি ভালই করে। তবু মনে একটা খটকা ছিল তাই ব্রতীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করলাম, আর করে জানলাম যে এ সেই একই রমণীমোহন। বললাম, পারবে তো এত বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে? ব্রতীন বললে, সাদা নুন খেয়ে উঠে পড়ে লেগেছে তো ছোঁকরা। শখ। প্রচণ্ড। আর, ও একটা আংটি পরে সেটা নাকি মুঘল আমলের; ওর ঠাকুরদাদার ছিল; খুব পয়া। আলমগীর সাজলে ওটা আঙুলে পরবে, আর তা হলে নাকি আর দেখতে হবে না। আসলে, রমণী আবার তুকতাকে বিশ্বাস করে, পুজো আচ্চা করে। বড়লোক বাপের একমাত্র ছেলে, বুঝতেই তো পারিস, পয়সার জন্য যে করছে তা তো নয়, শখ হয়েছে চিত্রতারকা হবার।
