আমি জিজ্ঞেস করলুম, আপনি কি সাইলেন্ট যুগের অভিনেতাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন নাকি?
খুব বেশি তো বেঁচে নেই, বললেন সান্যাল মশাই। যে কজন রয়েছেন তাঁদের নিতে চেষ্টা করছি।
আমি রতন রক্ষিতের কথা বলে দিলাম, আর বললাম যে, তাঁর সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি। ভদ্রলোক তাতে বেশ উৎসাহ প্রকাশ করলেন।
এর পর আমি আসল প্রশ্নে চলে গেলুম।
টকি আসার পর কি শরৎ কুণ্ডু আর ছবিতে অভিনয় করেননি?
আজ্ঞে না, বললেন নরেশ সান্যাল। ভয়েস টেস্টেই ভদ্রলোক বাতিল হয়ে যান। তারপর যে কী করেছেন সেটা ভদ্রলোক খোলাখুলি বললেন না। মনে হল খুবই স্ট্রাগল গেছে, তাই নিজের কথা বেশি বলতে চান না। তবে সাইলেন্ট যুগ সম্বন্ধে অনেক তথ্য আমি ভদ্রলোকের কাছে পেয়েছি।
এর পর টালিগঞ্জ পাড়ার আরও কয়েকজন পুরনো কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানলুম যে, টকি আসার পরেও বেশ কয়েক বছর শরৎ কুণ্ডু সিনেমা পাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সে-সময় ওঁর অবস্থা নাকি খুব খারাপ। টালিগঞ্জেরই মায়াপুরী স্টুডিওর ম্যানেজার ধীরেশ চন্দর সঙ্গে কথা বলে জানলুম যে, শরৎ কুণ্ডু নাকি মাঝে মাঝে ছবিতে একার পার্ট করে পাঁচ-দশ টাকা করে রোজগার করতেন। এইসব পার্টে অভিনেতা সাধারণত ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকে; তার কথা বলার কোনও দরকার হয় না।
এই মায়াপুরী স্টুডিওতেই দ্বারিক চক্রবর্তী বলে এক বৃদ্ধ প্রোডাকশন ম্যানেজার আমাকে বললেন, বেনটিঙ্ক স্ট্রিটে নটরাজ কেবিনে গিয়ে খোঁজ করুন। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত সেখানে আমি শরৎ কুণ্ডুকে দেখেছি।
শরৎ কুণ্ডুকে বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে টেনে বার করার জন্য নটরাজ কেবিনে গিয়ে হাজির হলাম। এর মধ্যে–একথাটা বলা হয়নি–গোয়াবাগান বস্তিতে গিয়ে খোঁজ করে জেনেছি যে শরৎ কুণ্ডু আর সেখানে থাকেন না। এটাও বলা দরকার যে, আমার উৎসাহের সঙ্গে তাল রেখে চলেছেন রক্ষিত মশাই। ছোঁয়াচে ব্যারামের মতো তাঁরও এখন ধ্যান জ্ঞান চিন্তা হল শরৎ কুণ্ডু। তাঁদের দুজনের মধ্যে যে কত সৌহার্দ্য ছিল সেটা এখন মনে পড়েছে রক্ষিত মশাই-এর। যুবা বয়সের স্মৃতি, আর দুজনে তখন ডাকসাইটে জুটি। লোকে আসল ছবির কথা চিন্তাই করে না; ছবির আগে বিশু শিবুর দু রিলের কীর্তিকলাপই হল তাদের কাছে আসল। সেই জুটির একটি রয়েছে, একটি উধাও। এমন হলে কি চলে?
নটরাজ কেবিনের মালিক পুলিন দত্তকে জিজ্ঞেস করাতে ভদ্রলোক বললেন, শরৎদা বছর তিনেক আগে অবধি এখানে রেগুলারলি আসতেন। তারপর আর আসেননি।
তিনি কি কোনও কাজ-টাজ করতেন?
সেকথা তাঁকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, বললেন পুলিন দত্ত, কিন্তু কোনও সোজা উত্তর কখনও পাইনি। কেবল বলতেন, পেটের দায়ে এমন কোনও কাজ নেই যা আমি করিনি।তবে অভিনয় যে ছেড়ে দিয়েছিলেন সেটা আমি জানি, আর সেইসঙ্গে ছবি দেখাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। টকিই যে তাঁর কাল হয়েছিল সেটা বোধহয় উনি কোনওদিন ভুলতে পারেননি।
এর পরে আরও মাসখানেক নানান জায়গায় খোঁজ করেও শরৎ কুণ্ডুর কোনও পাত্তা পেলাম না। লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কথাটা রক্ষিত মশাইকে বলতে উনি সত্যিই মর্মাহত হলেন। বললেন, এমন একটা গুণী অভিনেতা, টকি এসে তার পসার মাটি করল, আর ক্রমে সে মানুষের মন থেকে মুছেই গেল। এখন আর তাকে কে চেনে? সে তো বেঁচে থেকেও প্রায় মরারই শামিল।
শরৎ কুণ্ডুর ব্যাপারে আর কিছু করার নেই বলে আমি কাজের কথায় চলে গেলুম। ভদ্রলোককে একটা প্রশ্ন করার ছিল। বললুম, আপনার একটি সাক্ষাৎকার দিতে কোনও আপত্তি আছে কি?
কে চাইছে সাক্ষাৎকার?
আমি নরেশ সান্যালের কথা বললুম। ভদ্রলোক সেদিনই সকালে ফোন করেছিলেন, আগামীকাল আসতে চান।
বেশ তো, সকালে দশটায় আসুক। তবে বেশি সময় যেন না নেয়।
নরেশ সান্যাল ফোন নম্বর দিয়ে দিয়েছিলেন, আমি তাঁকে খবরটা জানিয়ে দিলাম।
সেদিন সন্ধ্যায় প্রোজেকশন ঘরে রয়ে গেলুম। বিশু-শিবুর কীর্তিকলাপ দেখার জন্য। বিশু-শিবুর ছবি হয়েছিল সবসুদ্ধ বেয়াল্লিশটা। তার মধ্যে সাঁইত্রিশটা আগেই জোগাড় হয়েছিল, বাকি পাঁচখানা আমার চেষ্টায় জোগাড় হয়েছে। আজ এই নতুন পাঁচখানা দেখতে দেখতে আবার মনে হল যে, শরৎ কুণ্ডু সত্যিই বেশ জোরদার কমিক অভিনেতা ছিলেন। রক্ষিত মশাইকে দু-একবার চুকচুক করতে শুনলুম, তাতে বুঝলুম যে তিনি শরৎ কুণ্ডুর অন্তর্ধানের জন্য আক্ষেপ করছেন।
পরদিন সকালে আমি আসার দশ মিনিটের মধ্যেই নরেশ সান্যাল এসে পড়লেন। রক্ষিত মশাই তৈরিই ছিলেন; বললেন, আগে চা হোক, তারপর ইন্টারভিউ হবে। সান্যাল মশাই কোনও আপত্তি করলেন না।
সকালে দশটায় রোজই রক্ষিত মশাই চা খান এবং সেইসঙ্গে আমিও খাই। এই সময়টাতেই আমাদের যা কিছু আলোচনা করবার তা হয়ে যায়, তারপর আমি বসে পড়ি কাজে, উনি চলে যান। বিশ্রাম করতে। ক্যাটালগিং হয়ে যাবার পর আমি যে কাজটা করছি সেটা হল বিশু-শিবুর প্রত্যেকটি ছবির গল্পের সারাংশ তৈরি করা এবং তাতে কে কে অভিনয় করেছে, পরিচালক কে, ক্যামেরাম্যান কে–এই সবের একটা তালিকা তৈরি করা। একে বলে ফিল্মেগ্রাফি।
যাই হোক, আজ অতিথি এসেছেন বলে দেখি চায়ের সঙ্গে চুরি এসেছে। ট্রে সমেত চা টেবিলে রাখা হতেই সান্যাল মশাই হঠাৎ একটা কথার মাঝখানে খেই হারিয়ে চুপ করে গেলেন। তাঁর দৃষ্টি ভৃত্যের দিকে। ভৃত্য স্বয়ং খাস বেয়ারা লক্ষ্মীকান্ত।
