আমি বললাম, যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এতদিন আগের খুনের ব্যাপারে আজকে তো আর তুমি কিছু করতে পারবে না।
সুরেশ মাথুর ধন্যবাদ দিয়ে আমার পারিশ্রমিক চুকিয়ে দিয়ে চলে গেল।
এই ঘটনার প্রায় ছমাস পরে একদিন হঠাৎ আমার কাছে এক মক্কেল এসে হাজির, বছর ষাটবাষট্টি বয়স, ঘি খাওয়া চেহারা, বললেন তিনি একজন ব্যবসাদার, একটা নতুন ব্যবসায়ে টাকা ঢালতে যাচ্ছেন, তার ফলাফল কী হবে সেটা জানতে চান। সামনে তাঁর কোনও আর্থিক বিপর্যয় আছে কি?
আমি জিজ্ঞেস করতে বললেন তাঁর নাম গজানন আপ্টে। আমি তো শুনে অবাক!
যাই হোক, মক্কেল যখন, তখন তাঁকে অ্যাটেন্ড করতেই হবে। আমি তাঁকে আমার ফরাসে বসালাম। তারপর আমার একটা প্রশ্ন ছিল সেটা করলাম।
আপনার বয়স কত?
ভদ্রলোক বললেন, ছেষট্টি।
আমি হাতের রেখার দিকে মন দিলাম। দেখি যে নতুন ব্যবসা ফাঁদার কোনও প্রশ্ন আসছে না। এই বছরই ভদ্রলোকের মৃত্যু এবং সেটা অপঘাত মৃত্যু। সেকথা তো আর তাঁকে বলতে পারি না; বললাম, তোমার নতুন ব্যবসায়ে টাকা ঢেলে কোনও সুফল হবে না; তুমি যা করছ তাই করো।
তুমি ঠিক বলছ? ভদ্রলোক আবার প্রশ্ন করলেন। আমি কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে এই পন্থা স্থির করেছি।
আমি ভদ্রলোককে আবার বারণ করলাম। তাঁর হাতের তেলো আমার সামনে খোলা, আমি তখনও মনে মনে গণনা করে চলেছি। হঠাৎ একটা ব্যাপার দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
ভদ্রলোকের হাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তিনি পনেরো বছর আগে একটা খুন করেছেন। সাংঘাতিক ফাঁড়া, কিন্তু সে ফাঁড়া তিনি কাটিয়ে উঠেছেন, সেকথাও হাতে রয়েছে।
আমি অবিশ্যি এ বিষয়ে আর কিছু বললাম না। ভদ্রলোক আমাকে টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমি আবার বলে দিলাম যে, নতুন ব্যবসায়ে টাকা ঢেলে কোনও ভাল ফল হবে না।
এর সাতদিন পরে সুরেশ মাথুর আবার এসে হাজির। আমি বললাম, কী ব্যাপার?
মাথুরকে বিশেষভাবে উত্তেজিত বলে মনে হচ্ছিল। সে বলল যে, এর মধ্যে নাকি গজানন আপ্টের আপিসে গিয়েছিল। আপ্টে ছিলেন না কিন্তু তাঁর সেক্রেটারি ছিল। সেটা জেনে-শুনেই নাকি মাথুর গিয়েছিল। সেক্রেটারি নাকি বিশ বছর ধরে ওই আপিসে চাকরি করছে। তার সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল মাথুরের। মাথুর তাকে তার বাপের মৃত্যুর কথা জিজ্ঞেস করে। সেক্রেটারি বলে, তার ঘটনাটা পরিষ্কার মনে আছে। সে প্রকাশ মাথুরের বিশেষ অনুরক্ত ছিল। সে বলে বিকেলে কফি খাওয়ার পরই নাকি প্রকাশ মাথুর মারা যান। সেক্রেটারি সন্দেহ করেছিল যে, কফিতে বিষ মেশানো হয়েছে, কিন্তু ডাক্তারের মুখের উপর সে কোনও কথা বলতে পারেনি।
তা হলে এখন তোমার কী মতলব? আমি সুরেশ মাথুরকে জিজ্ঞেস করলাম।
সুরেশ চাপা স্বরে বলল, আমি বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব।
সে কী? কী করে?
যে করে হোক।
আমি যে ইতিমধ্যে গজানন আপ্টের হাত দেখেছি আর জেনেছি যে তাঁর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, সে বিষয়ে আর কিছু বললম না। সুরেশ মাথুর প্রতিশোধের সংকল্প নিয়ে আমার আপিস থেকে বেরিয়ে গেল।
এর তিনদিন পরে খবরটা খবরের কাগজে বেরোল। গজানন আপ্টে খুন হয়েছেন। তিনি ইটওয়ারি রোডে থাকতেন। রোজ সন্ধ্যায় আপিসের পর জুমা তালাও-এর পাশে হাঁটতে যেতেন। সেই হাঁটা অবস্থায় পিছন থেকে কেউ এসে তাঁকে কোনও ভারী অস্ত্র দিয়ে মাথায় মেরে খুন করেছে। পুলিশ আততায়ীর অনুসন্ধান করছে।
কিন্তু আমি তো সুরেশ মাথুরের হাত দেখেছি। আমি জানি তার এখন একটা ফাঁড়া আছে, কিন্তু এ ফাঁড়া সে কাটিয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত হলও তাই। পুলিশ খুনিকে ধরতে পারল না, এবং গজানন আপ্টের খুন আনসম্ভড ক্রাই-এর পর্যায়ে ফেলে দেওয়া হল।
সুরেশ মাথুর যে শুধু পারই পেল তা নয়। আমি জানি যে বিরাশি বছরের আগে তার মৃত্যু নেই, এবং সে মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু অন্তত তার হাতের রেখা তাই বলে।
সন্দেশ, আষাঢ় ১৩৯৫
গল্পবলিয়ে তারিণীখুড়ো
তোরা তো আমাকে গল্পবলিয়ে বলেই জানিস, বললেন তারিণীখুড়ো, কিন্তু এই গল্প বলে যে আমি এককালে রোজগার করেছি সেটা কি জানিস?
না বললে জানব কী করে? বলল ন্যাপলা।
সে আজ থেকে বাইশ বছর আগের কথা, বললেন তারিণীখুড়ো। বম্বেতে আছি, ফ্রি প্রেস জার্নাল কাগজে এডিটরের কাজ করছি, এমন সময় একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম–আমেদাবাদের এক ধনী ব্যবসায়ী একজন গল্পবলিয়ের সন্ধান করছে। ভারী মজার বিজ্ঞাপন। হেডলাইন হচ্ছে ওয়ানটেড এ স্টোরি টেলার। তারপর লেখা আছে যে আমেদাবাদের একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী বলবন্ত পারেখ একটি ব্যক্তির সন্ধান করছেন যে তাঁকে প্রয়োজনমতো একটি করে মৌলিক গল্প শোনাবে। সে লোক বাঙালি হলে ভাল হয়, কারণ বাঙালিরা খুব ভাল গল্প লেখে। বুঝে দেখ–মৌলিক গল্প। অন্যের লেখা ছাপা গল্প হলে চলবে না। সেরকম গল্প তো পৃথিবীতে হাজার হাজার আছে। কিন্তু এ বোক চাইছে এমন গল্প, যা আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে কী, আমার পক্ষে গল্প তৈরি করা খুব কঠিন নয়। আমার জীবনের এতরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতেই একটু-আধটু রঙ চড়িয়ে রদবদল করে বলে নিলেই সেটা গল্প হয়ে যায়। তাই কপাল ঠকে অ্যাপ্লাই করে দিলুম। এটাও জানিয়ে দিলুম যে, আমি গুজরাতি জানি না, তাই গল্প বললে হয় ইংরিজিতে না হয় হিন্দিতে বলতে হবে। হিন্দিটা আমার বেশ ভাল রকমই রপ্ত ছিল আর ইংরিজি তো কলেজে আমার সাবজেক্টই ছিল। সাতদিনে উত্তর এসে গেল। পারেখ সাহেব জানালেন ওঁর ইনসমনিয়া আছে, রাত সাড়ে তিনটে-চারটের আগে ঘুমোন না, সেই সময়টা গল্প শুনতে চান। রোজ নয়, যেদিন মন চাইবে। মাইনে মাসে হাজার টাকা।
