.
ঘটনাটা ঘটে নাগপুরে। আমি বোম্বাই গেলাম যদি ফিল্মে কিছু কাজ পাওয়া যায়। তার মানে মনে করিস না যে আমার ফিল্মে অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল। তা নয় মোটেই। আমি প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজটা ভাল জানতাম; টালিগঞ্জে দুটো ছবিতে ওই কাজ করেছি, তাই সেইদিকেই চেষ্টা করছিলাম। একটা ছবিতে কাজ জুটেও গেল।
আমি থাকি ভিলে পার্লেতে একটা দোতলা বাড়ির একতলায় একটা ছোট ফ্ল্যাটে। পুরো দোতলাটা নিয়ে থাকেন বম্বের এক বিখ্যাত জ্যোতিষী মুকুন্দ পটবর্ধন। দিশি মতে হাত দেখিয়ে হিসেবে তার খুব নামডাক। আমার প্রতিবেশী, তাই আমার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। কেন জানি না, ভদ্রলোকের আমাকে খুব ভাল লেগে গেল। বললেন, তোমাকে আমি পামিস্ট্রি শিখিয়ে দেব।
যে কথা সেই কাজ। কাজের পর রাত্তিরে ভদ্রলোকের ঘরে বসে হস্তরেখা গণনা শিখতে আরম্ভ করলাম। অদ্ভুত সাবজেক্ট। নেশা ধরে গেল। দুমাসের মধ্যে দেখি আমিও বেশ হাত দেখতে পারছি। স্টুডিওর কয়েকজনের হাত দেখে অতীত ভবিষ্যৎ বলে দিলাম, এক প্রোডিউসারের ছবি হিট হবে সেটা বলে দিলাম, আর ফলেও গেল।
শেষটায় একটা সময় এল যখন মনে হল আমি নিজেই এ কাজ করে রোজগার করতে পারি। এক কাজে বেশিদিন টিকতে পারি না সেটা তো তোদের বলেইছি, তাই ফিল্মের লাইন ছেড়ে পামিস্ট্রি ধরলাম। কিন্তু বম্বেতে নয়। বম্বেতে এ কাজে পটবর্ধন একচ্ছত্র অধিপতি। আমাকে অন্য জায়গা দেখতে হবে। চলে গেলুম নাগপুর। পাচপাগুলি অঞ্চলে রাস্তার উপর একটা ঘর নিয়ে দরজার পাশে নোটিশ লটকে দিলুম–এখানে সুলভে হস্তরেখা দেখে ভবিষ্যৎ গণনা করা হয়। বেঙ্গলের বিখ্যাত গণৎকার ইত্যাদি।
দেখতে দেখতে পসার জমে উঠল। এরকম র্যাপিড সাকসেস হবে তা আশা করিনি। এক বছরের মধ্যে একটা বড় ফ্ল্যাটে উঠে যেতে হল, একটা বি.এ. পাশ ছোঁকরা সেক্রেটারি রাখতে হল। সারা ভারতবর্ষ থেকে হাতের ছাপ আসে, সেই ছাপ দেখে আমি ইংরিজিতে গণনা করি, সেক্রেটারি সেগুলো টাইপ করে যথাস্থানে পাঠিয়ে দেয়। বেশিরভাগ মক্কেলই হচ্ছে ব্যবসাদার, আর তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মাড়োয়ারি। মাসে রোজগার তখন আমার প্রায় তিন হাজার টাকা, আর আমার বয়স তখন বত্রিশ। তা হলে কদ্দিন আগের কথা বুঝতেই পারছিস।
এর মধ্যে একদিন এক ভদ্রলোক এলেন, ফর্সা একহারা চেহারা, চোখে চশমা, পরনে বিলিতি পোশাক। বয়স আন্দাজ ত্রিশেক। তিনি তাঁর হাতটা দেখিয়ে বললেন, আমি শুধু একটা জিনিস জানতে চাই। আমি একটা নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি। সে কাজটা ঠিক হচ্ছে না ভুল হচ্ছে?
আমি হাতের রেখা দেখে বললাম, যা করতে যাচ্ছ করো। তোমার নতুন চাকরিতে উন্নতি হবে।
ভেরি গুড, বললেন ভদ্রলোক। এবার আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।
আমি আগেই লক্ষ করেছিলাম যে ভদ্রলোকের কাঁধে একটা নকশাদার কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে। ভদ্রলোক তার মধ্যে থেকে একটা বেশ বড় খাম বার করে তার ভিতর থেকে এক শিট কাগজ টেনে বার করলেন। কাগজটা পুরনো, তা দেখলেই বোঝা যায়। সেই কাগজে রয়েছে কালো কালিতে একটা রেখা সমেত হাতের ছাপ। ভদ্রলোক সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজের উপর দিকে ডান কোনায় একটা তারিখ লেখা রয়েছে সেটা পনেরো বছর আগে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার হাতের ছাপ?
আমার বাবার,বললেন ভদ্রলোক। একটা পুরনো বাক্স ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেরিয়ে পড়ল। মনে হয় এটা উনি দিয়েছিলেন বম্বের গণৎকার পটবর্ধনকে পাঠানোর জন্য। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
আমাকে কি এখন এই হস্তরেখা দেখে গণনা করতে হবে?
হ্যাঁ। বিশেষ কয়েকটা তথ্য।
আপনার বাবার বয়স তখন কত ছিল?
পঞ্চাশ।
আমি হাতের রেখা বিচার করে একটা অদ্ভুত তথ্য আবিষ্কার করলাম। ভদ্রলোকের মৃত্যু হয়েছে ওই পঞ্চাশ বছর বয়সেই। সেটা আমি বললাম আমার মক্কেলকে।
স্বাভাবিক মৃত্যু কি? জিজ্ঞেস করলেন মক্কেল।
আমি আবার ভাল করে দেখলাম ছাপটা। তারপর বললাম, রেখা স্পষ্ট বলছে অপঘাত মৃত্যু, স্বাভাবিক নয়।
এ বিষয় আপনি নিশ্চিত?
অ্যাবসোলিউটলি, আমি জোর দিয়ে বললাম।
তা হলে আপনাকে ঘটনাটা একটু খুলে বলি, বললেন ভদ্রলোক। আমার বাবার নাম ছিল প্রকাশচন্দ্র মাথুর। আমি বাবার একমাত্র সন্তান। আমার মা আমাকে জন্ম দিতে মারা যান; আমি মানুষ হই এক বিধবা পিসির কাছে। আমার নাম সুরেশ মাথুর। বাবা ব্যবসাদার ছিলেন। বাবার একজন অংশীদার ছিল, নাম গজানন আপ্টে। আজ থেকে পনেরো বছর আগে–তখন আমার বয়স সতেরো বাবা একটা বিশেষ কারণে খুব কষ্ট পান। বাবাকে এত বিচলিত হতে আমি কখনও দেখিনি। আমি কারণ জিজ্ঞেস করতে বাবা বলেন, যাকে আপনার জন বলে মনে করা যায়, সে যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তা হলে যত কষ্ট পেতে হয় তেমন আর কিছুতে হয় না। আমার স্বভাবতই বাবার বিজনেস পার্টনারের কথা মনে হয়; কিন্তু বাবা এই নিয়ে আর কিছু বলতে চান না। এর কিছুদিন পরেই একদিন বিকেলে আপিসে বাবাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় তাঁর টেবিলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তখনই ডাক্তার ডাকা হয়। ততক্ষণে বাবা মারা গেছেন। ডাক্তার বলেন হার্ট অ্যাটাক। আমার ইচ্ছা ছিল পুলিশ ডাকার, কারণ আমার সন্দেহ হয়েছিল বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। বাবা তাঁর অংশীদারের কীর্তি ধরে ফেলেছেন, তাই তাঁকে মেরে তাঁর মুখ বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আমার তখন মাত্র সতেরো বছর বয়স–আমার কথা কে শুনবে? আজ আপনার গণনায় জানতে পারছি যে, আমার ধারণাই ঠিক ছিল, বাবাকে খুনই করা হয়েছিল।
