রাজা তো অবাক। এমন কথা তিনি কখনও শোনেননি। তিনি বললেন, এটা তোমার পুরস্কার, তোমার পাওনা। তোমায় নিতেই হবে।
তবে দিন। আপনি যখন এত করে বলছেন তখন না বলব না। কিন্তু একটা কথা বলার ছিল, রাজামশাই।
কী কথা?
যাকে এনে দিলাম সাতশিরা পাথর, সেই রাজকন্যাকে বড় দেখতে ইচ্ছা করছে। আমি কোনওদিন রাজকন্যা দেখিনি।
রাজা চোখ কপালে তুলে বললেন, এ কেমন কথা বললে তুমি! রাজকন্যাকে দেখা কি মুখের কথা? সে থাকে তার নিজের ঘরে; তার বিয়ের কথা হচ্ছে। সে তো আর খুকি নয়।
সে তো আমারও বিয়ের কথা হচ্ছে, রাজামশাই, বলল গঙ্গারাম। আমি বলি দেখতে দোষটা কী? একবার দেখেই আমি চলে যাব।
এমন সময় সকলকে অবাক করে দিয়ে রাজার ঘরে পর্দা সরিয়ে এক পরমাসুন্দরী মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল।
এ কী, সুনয়না! রাজা অবাক হয়ে বলে উঠলেন।
যে আমার পাথর এনে দিয়েছে তাকে একবার দেখতে ইচ্ছা হল, বলল রাজকন্যা সুনয়না। এই পাথর যে হাতছাড়া করতে পারে সে তো যেমন তেমন লোক নয়। এমন পয়া পাথর তো আর হয় না। এতে মানুষের ভাগ্য ফিরে যায়।
গঙ্গারাম অবাক হয়ে রাজকন্যার দিকে চেয়ে বলল, এ কথা বোধহয় ঠিকই, কারণ এটা পাবার পর থেকেই আমার মতো গরিবের কপালও খুলে গিয়েছিল। এখন যখন পাথরটা চলে গেল–
তখন আবার যে-কে-সেই হয়ে যাবে তুমি, বলল রাজকন্যা। আমি এ পাথর ফেরত চাইনি, বাবাই জোর করে ঘোষণা করেছিলেন। আমাদের সত্যি করে কোনও অভাব নেই, অভাব তো তোমারই।
অভাবের মধ্যেই তো মানুষ হয়েছি, বলল গঙ্গারাম, তাই অভাবের অভাবটা যে কী তা জানিই না। তবে একটা কথা বলতে পারি–এই পাথর আমাকে অনেক স্বর্ণমুদ্রা এনে দিয়েছে। অ্যাদ্দিন বুঝতে পারিনি, আজ বুঝলাম। আমার মনে হয় বাকি জীবনটা তাতে স্বচ্ছন্দে চলে যাবে আমার আর কোনও পাথরের দরকার নেই। ওটা তোমার জিনিস ছিল, তোমার কাছেই থাক।
কিন্তু একটা কথা বলি, এই পাথরের গুণে পাওয়া স্বর্ণমুদ্রা এই পাথর চলে গেলে আর নাও থাকতে পারে। তখন তুমি কী করবে?
পাথর পাওয়ার আগে যেমনভাবে চলছিল তেমন ভাবেই চলবে।
তা কেন? পাথর তো দুজনের কাছেই থাকতে পারে,সকলকে অবাক করে দিয়ে বলল রাজকন্যা।
এটা ঠিক বলেছ, বলল গঙ্গারাম, যদি তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় তা হলেই তো দুজনের কাছেই থাকবে পাথর।
রাজাকে এবার বাধ্য হয়ে কথা বলতে হল। তিনি গঙ্গারামের দিকে চেয়ে বললেন, সব তো বুঝলাম। কিন্তু আমি তো আর বেশিদিন নেই, আর আমার কোনও ছেলেও নেই। আমি না থাকলে তুমি রাজকার্য চালাতে পারবে?
গঙ্গারাম বলল, অ্যাদ্দিন খেতে লাঙল চালালাম, এখন না হয় রাজ্য চালাব। ফসল ফলানোও তো সহজ কাজ নয়! তাতে অনেক বুদ্ধি লাগে, অনেক পরিশ্রম লাগে। আর রাজকার্যের অর্ধেক কাজ তো করে মন্ত্রী, আপনি আর একা কত করেন রাজামশাই?
সেকথা ঠিকই, বললেন রাজামশাই।
তবে কোনও ভাবনা নেই, বলল গঙ্গারাম। তারপর বলল, তা হলে এবার চলি। আপনি এদিকে তোড়জোড় করুন, দিনক্ষণ দেখুন। আমার মামাকে আবার খবরটা দিতে হবে।…চলি রাজকন্যা, আবার পরে দেখা হবে। ভাল কথা–আমার নাম গঙ্গারাম।
দরজার পাশ থেকে রাজকন্যা একটা খুশির হাসি হেসে পর্দা ফেলে দিয়ে চলে গেল।
.
বাড়ি ফিরে এসেই চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে গঙ্গারাম পাথরের অভাবটা হাড়ে হাড়ে টের পেল। মামার বাতটাও শুনল বেড়েছে। আর সবচেয়ে যেটা অবাক কাণ্ড–খাটের তলা থেকে কলসি বার করে দেখল তার ভিতর রয়েছে শুধু মাটি।
কিন্তু এর কোনওটাই সে গ্রাহ্য করল না, কারণ যা হতে চলেছে, তাতে তার কপাল মন্দ এটা আর বলা চলে না।
আনন্দমেলা, বৈশাখ ১৩৯৩ (১৪ মে ১৯৮৬)
গণেশ মুৎসুদ্দির পোর্ট্রেট
সুখময় সেনের বয়স পঁয়ত্রিশ। এই বয়সেই সে চিত্রকর হিসাবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। পোর্ট্রেটেই তার দক্ষতা বেশি। সমঝদারেরা বলে সুখময় সেনের আঁকা কোনও মানুষের প্রতিকৃতি দেখলে সেই মানুষের জ্যান্ত রূপ দেখতে পাওয়া যায়। বহু প্রদর্শনীতে তার আঁকা পোর্ট্রেট দেখানো হয়েছে, শিল্প সমালোচকেরা তার প্রশংসা করেছে।
কিন্তু শিল্পীরা সবসময় এক পথে চলতে ভালবাসে না। সুখময় এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি তার মনে হয়েছে–পোর্ট্রেট তো অনেক হল, এবার একটু অন্য ধরনের কিছু আঁকলে কেমন হয়। এই অন্য ধরনটা সুখময়ের ক্ষেত্রে হল ল্যান্ডস্কেপ বা প্রাকৃতিক দৃশ্য। এই প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকার উদ্দেশ্যেই সুখময় হাজির হয়েছে শিলং শহরে।
সুখময় এখনও বিয়ে করেনি, তার বাপ-মা দুজনেই জীবিত। দুটি বোন আছে, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। সুখময় শিলং-এ একাই এসেছে, কারণ শিল্পীর জীবনের একাকিত্বের প্রয়োজনীয়তা সে প্রবলভাবে অনুভব করে। যখন সে ছবি আঁকে তখন তার পাশে কেউ উপস্থিত থাকলে সেটা সে মোটেই পছন্দ করে না। অবিশ্যি পোর্ট্রেট আঁকা হলে যার ছবি আঁকা হচ্ছে তাকে থাকতেই হয়, কিন্তু আর কেউ নয়। সব শিল্পীর মধ্যেই এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়, কিন্তু সুখময়ের মধ্যে এর মাত্রাটা একটু বেশি।
তাই শিলং-এ এসে সেখানকার বিখ্যাত লোকের ছবি সে যখন আঁকছিল ঘাসের উপর ইজেল রেখে, তখন একটি দ্বিতীয় প্রাণীর আবির্ভাবে সে মোটেই সন্তুষ্ট হল না।
বাঃ, আপনার আঁকার হাত তো খাসা মশাই! হল আগন্তুকের প্রথম মন্তব্য।
