কিন্তু তাকে বেশিদূর এগোতে হল না। দুদিন হল বৃষ্টি হয়ে গেছে, শীতকালের লম্বা-ঘুম-ভাঙা এক কালসাপ ছিল কাছাকাছির মধ্যে, সেটা নিঃশব্দে এসে মহেশের গোঁড়ালিতে মারল একটা ছোবল। মহেশের হাত থেকে সিঁদকাঠি পড়ে গেল, আর দুমিনিটের মধ্যে তার নিষ্প্রাণ দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
পরদিন সকালে গঙ্গারামই দেখল প্রথমে চোরের মৃতদেহ। সে বুঝল কী হয়েছে, কিন্তু তার বাড়িতে চোর সিদ কাটতে আসবে কেন সেটা সে বুঝল না।
এদিকে মহেশের কী দশা হয়েছে সেটা রঘুনাথ জানতে পেরেছে। সে বুঝল তার পিসতুতো ভাইয়ের কী আশ্চর্য কপাল। এইভাবে চুরি করে তো তার কাছ থেকে টাকা আদায় করা যাবে না। অন্য কী পন্থা নেওয়া যায় সেই নিয়ে সে ভাবতে বসল।
এদিকে গঙ্গারামের যে কাল খুলেছে তার আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার মামার বাত আপনা থেকেই অনেকটা ভাল হয়ে গেছে; মামার মেজাজটা ছিল খিটখিটে, আজকাল সেটাও বদলে গিয়ে অনেক নরম হয়ে গেছে। মামা বলছে গঙ্গারামের জন্য এবার একটা পাত্রী খুঁজতে হবে। গঙ্গারাম এটাকেও কপাল ফেরার লক্ষণ বলে মনে করে, কারণ বিয়েতে তার আপত্তি নেই। বেশ একজন সুখ-দুঃখের সাথী হবে, ঘরকন্নার কাজ করার লোক হবে, আর সে মেয়ে যদি ফুটফুটে হয় তা হলে তো কথাই নেই। ফুল যেমন সুন্দর, সকাল-সন্ধ্যার আকাশ যেমন সুন্দর, পাখির ডাক যেমন সুন্দর, তেমনই তার বউও সুন্দর হয় এটা গঙ্গারাম চায়।
এই সময় একদিন এক হাটবারে হাটে ঢ্যাঁড়া শোনা গেল। বৈকুণ্ঠগ্রাম থেকে সাত ক্রোশ দূরে কনকপুর শহর, সেই শহর থেকে ঢ্যাঁড়া দিতে এসেছে। ঘোষণাটা এই–
কনকপুরের রাজকন্যার একটা সাতশিরা পাথর ছিল, সেটা একটা বাঁদর রাজবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে নিয়ে যায়। সেই থেকে রাজবাড়িতে নানা দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাজকন্যার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে, তার শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। এই সাতশিরা পাথরে রামধনুর সাতটা রঙই শিরায় শিরায় ফুটে বেরোয়। সে পাথর যদি কারও কাছে থেকে থাকে তা হলে সেটা ফেরত দিলে রাজা সে-লোককে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবে।
গঙ্গারাম শুনল ঘোষণাটা, তারপর একটা গাছের আড়ালে গিয়ে ট্যাঁক থেকে পাথরটা বার করে দেখল সেটার দিকে মন দিয়ে। হ্যাঁ, এতেও তো শিরায় শিরায় সাতটা রঙই দেখা যায়। এই কি তা হলে সাতশিরা পাথর?
গঙ্গারাম মনে মনে ঠিক করল সে কনকপুর যাবে, আর গিয়ে রাজাকে জিজ্ঞেস করবে এই পাথরই সেই পাথর কিনা। যদি তাই হয় তা হলে সে পাথরটা ফেরত দিয়ে দেবে। সেটা তার সাধের জিনিস সন্দেহ নেই, কিন্তু রাজকুমারীর অবস্থা শুনে তার মনে আঘাত লেগেছে। কারও দুঃখ গঙ্গারাম সইতে পারে না। সে দুঃখ দূর করার ক্ষমতা যদি তার থাকে তা হলে সে নিশ্চয়ই তা করবে।
এদিকে কেষ্টপুরেও এই একই ঢ্যাঁড়া পড়েছে, একই ঘোষণা হয়েছে, আর সেটা শুনেছে রঘুনাথ। তার মন বলল তার পিসতুতো ভাইটা যা বোকা, সে নিশ্চয়ই পাথর ফেরত দিতে কনকপুর যাবে। সে নিজে কনকপুরের রাস্তায় ঝোঁপের পিছনে লুকিয়ে থাকবে, আর ভাই এলেই তাকে ঘায়েল করে তার কাছ থেকে পাথরটা নিয়ে নেবে। নিয়ে সেটা সে নিজের কাছেই রাখবে, রাজাকে ফেরত দেবে না।
গঙ্গারাম পরদিন সক্কাল সক্কাল চাদরের খুঁটে মুড়ি বাতাসা বেঁধে নিয়ে দুগ্না বলে কনকপুর রওনা। দিল।
তিন ক্রোশ পথ যাবার কিছু পরে একটা বনের পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা ঝোঁপের পিছন থেকে বেরিয়ে রঘুনাথ হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে ধেয়ে এল গঙ্গারামের দিকে। গঙ্গারাম কিছুই টের পায়নি, কারণ তার পিছন দিক দিয়ে নিঃশব্দে এসেছিল রঘুনাথ। কিন্তু হলে কী হবে? গঙ্গারামের ট্যাঁকে সাতশিরা পাথর। সে লাঠি তার মাথায় পড়তেই সেটা শোলার মতো মট করে ভেঙে গেল। কাণ্ড দেখে রঘুনাথ দিল চম্পট, কারণ সে জানে গঙ্গারামের সঙ্গে খালি হাতে সে পেরে উঠবে না।
কনকপুর পৌঁছতে গঙ্গারামের দুপুর পেরিয়ে গেল। রাজবাড়িটা অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। সে সটান চলে গেল ফটকের সামনে। সেখানে প্রহরী তাকে রুখতে সে বলল, আমি রাজকন্যার জন্য সাতশিরা পাথর এনেছি।
প্রহরী পাথরটা দেখতে চাইলে গঙ্গারাম ট্যাঁক থেকে বার করে দেখাল। তাতে প্রহরী শুধু তার পথই ছেড়ে দিল না, আরেকজন প্রহরীকে বলে রাজার সঙ্গে দেখা করতে পাঠিয়ে দিল।
রাজা রাজসভায় যাননি, মন্ত্রী রাজকার্য চালাচ্ছেন, রাজা মনের দুঃখে অন্দরমহলে শয্যা নিয়েছেন।
গঙ্গারাম রাজার কাছে গিয়ে তাঁকে গড় করে বলল, মহারাজ, আমি একটা পাথর এনেছি, সেটা সাতশিরা কিনা যদি আপনি দেখে নেন।
রাজা উঠে বসলেন, তাঁর চোখে আশার ঝিলিক।
কই, দেখি তোমার পাথর।
গঙ্গারাম দেখাল।
রাজার দৃষ্টি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এই তো সেই পাথর। বলে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।
তারপর রাজা গঙ্গারামের দিকে চেয়ে বললেন, তুমি দাঁড়াও। তোমার পাওনা পুরস্কারটা তোমাকে দিই; আর তোমার সঙ্গে লোক দিয়ে দিচ্ছি, সে তোমাকে ঘোড়ায় করে তোমার গ্রামে পৌঁছে দেবে। এ-টাকা সঙ্গে নিয়ে হেঁটে যাওয়া নিরাপদ নয়।
কোষাগার থেকে একজন কর্মচারী একটা মখমলের থলিতে এক সহস্র স্বর্ণমুদ্রা এনে গঙ্গারামকে দিল। গঙ্গারাম থলি খুলেই বলল, আরে, এ জিনিস তো আমার অনেক আছে–এর চেয়ে বেশি আছে। খেতে চাষ করতে গিয়ে মাটির তলা থেকে পেয়েছি। এ জিনিস আর আমার লাগবে না, যথেষ্ট আছে।
