দাদু যে সবসময় পিন্টুদের বাড়িতেই থাকেন তা নয়। পিন্টুর জ্যাঠামশাই আসামে জঙ্গল বিভাগে বড় চাকরি করেন; তাঁর একটা চমৎকার বাংলো আছে জঙ্গলের ভিতরে। দাদু মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে থেকে আসেন মাস খানেক করে। যাবার সময় সুটকেস বোঝাই বই আর খাতা নেন সঙ্গে, আর যখন ফেরেন তখন খাতাগুলো লেখায় ভরে যায়।
যে সময়টা তিনি থাকেন না, সে সময়টা বাড়ির চেহারাই পালটে যায়। পিন্টুর দিদি রেডিওতে সিনেমার গান শোনে, দাদা হপ্তায় দুটো করে ফাইটিং-এর ছবি দেখে, বাবার চুরুট খাওয়া বেড়ে যায়, আর মা দুপুর হলেই পাড়ার সদু মাসি-লক্ষ্মীমাসিদের ডেকে এনে দিব্যি খোশ মেজাজে তাস খেলেন আর আড্ডা দেন।
দাদু ফিরে এলেই অবিশ্যি আবার যেই কে সেই।
কিন্তু এবার হল একটু অন্যরকম।
এক মাসের জন্য দাদু গিয়েছিলেন আসামে তাঁর বড় ছেলের কাছে। পিন্টু মা বাবার সঙ্গে এক ঘরে শোয়; দাদু ফেরার দুদিন আগে মাঝ রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গিয়ে পিন্টু শোনে মা বাবা দাদুকে নিয়ে কথা বলছেন। পিন্টু মটকা মেরে পড়ে থেকে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে কথা শুনল, কিন্তু বাবা অনেক শক্ত শক্ত ইংরিজি কথা ব্যবহার করাতে অনেক কিছুই বুঝতে পারল না। তবে এইটুকু বুঝল যে দাদুর কী একটা অসুখ করেছে।
দুদিন বাদে অসুখ নিয়েই ফিরলেন দাদু। বাবার সঙ্গে ডাঃ রুদ্র স্টেশনে গেলেন দাদুকে আনতে। বাবার অ্যাম্বাসাডর গাড়িতেই দাদু ফিরলেন, আর তাঁকে গাড়ি থেকে ধরে নামালেন বাবা আর ডাঃ রুদ্র। তারপর ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায়, বারান্দা থেকে বৈঠকখানায়, বৈঠকখানা থেকে দোতলার সিঁড়ি, আর সিঁড়ি উঠে দাদুর ঘরে নিয়ে তাঁর বিছানায় তাঁকে শুইয়ে দিলেন। পিন্টু ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখছিল, এমন সময় মা এসে তার মাথায় হাত দিয়ে নরম গলায় বললেন, এখানে না, নীচে যাও।
দাদুর কী হয়েছে মা? পিন্টু না জিজ্ঞেস করে পারল না।
অসুখ, বললেন মা।
অথচ পিন্টুর দেখে মনে হয়নি দাদুর কোনও অসুখ হয়েছে। অবিশ্যি এটা ঠিকই যে দাদুকে এইভাবে পরের কাঁধে ভর করতে কোনওদিন দেখেনি পিন্টু। তা হলে কি পায়ে কোনও চোট পেয়েছেন? জেঠুর বাংলোর বাইরে যদি একা হাঁটতে বেরিয়ে থাকেন দাদু, তা হলে জঙ্গলের মধ্যে খানাখন্দে পড়ে চোট পাওয়া কিছুই আশ্চর্য না। কিংবা যদি সাপ-টাপ বা বিছে-টিছে কামড়ে থাকে, তা হলেও অবিশ্যি অসুখ হতে পারে।
তিন দিন এইভাবে কেটে গেল। পিন্টুর শোবার ঘর এক তলায়, দাদুর ঘরের ঠিক নীচে। পিন্টুকে উপরে যেতে দেওয়া হয় না, কাজেই দাদুর অসুখ কেমন যাচ্ছে সেটা জানার উপায় নেই। দিদি বা দাদা থাকলে হয়তো জানা যেত, কিন্তু দিদি কলকাতার হস্টেলে, আর দাদা তার বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গেছে রানিখেত। গতকাল রাত্রে পিন্টু দাদুর ঘরে একটা কাঁসার গেলাস কিম্বা বাটি মেঝেতে পড়ার শব্দ পেয়েছে, আর আজ সকালে ধুপধাপ শব্দ শুনে মনে হয়েছে দাদু হাঁটছেন। তা হলে আর দাদুর এমন কী অসুখ?
দুপুরে পিন্টু আর থাকতে পারল না। মা দাদুকে ওষুধ খাইয়ে নীচে নেমে এসেছেন কিছুক্ষণ হল, আর বাবা চলে গেছেন কোর্টে। আজ বিকেল থেকে একজন নার্স আসবে সে কথা পিন্টু জানে, কিন্তু এখন দাদুর ঘরে আর কেউ নেই।
বুকের মধ্যে একটা ধুকপুকুনির সঙ্গে সঙ্গে পিন্টু বুঝতে পারল যে তাকে একবার দোতলায় গিয়ে দাদুর ঘরে উঁকি দিতেই হবে। শুধু তাই না; দাদু যদি ঘুমোন, তা হলে তাকে ঢুকতে হবে, আর ঢুকে তার ডান্ডা আর গুলিটা খুঁজে বার করে আনতে হবে। দাদু যখন থাকেন না তখন তাঁর ঘর তালা-চাবি দিয়ে বন্ধ থাকে, তাই ওঘর থেকে কিছু বার করে আনার উপায় থাকে না।
দোতলায় উঠতে পিন্টুর যে একটু ভয়-ভয় করছিল না তা নয়; তবে অসুস্থ দাদু আর তেমন কী করতে পারেন এই ভেবে মনে খানিকটা সাহস পেয়ে উনিশ ধাপ সিঁড়ি উঠে পা টিপে টিপে সে দাদুর ঘরের দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল। প্যাসেজের বাঁয়ে ঘরের দরজা, আর সামনে আট-দশ পা এগিয়ে ছাতের দরজা।
কোনও শব্দ নেই ঘরে। যে গন্ধটা পাচ্ছে পিন্টু সেটা ওর খুব চেনা আর প্রিয় গন্ধ। পুরনো বইয়ের গন্ধ। দুহাজার পুরনো বই আছে দাদুর ঘরে।
পিন্টু নিশ্বাস বন্ধ করে গলাটা বাড়িয়ে দিল।
দাদুর খাট খালি।
তবে কি দাদু পিছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন?
পিন্টু তার ডান পা-টা বাড়িয়ে দিল চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢোকার জন্য। পা-টা চৌকাঠের ওদিকের মেঝেতে পৌঁছবার আগেই একটা শব্দ এল তার কানে।
খটাং, খটাং, খটাং!
পিন্টু চমকে পেছিয়ে আসতেই আরেকটা শব্দ–
কু-ই ই ই!
পিন্টুর চোখ চলে গেল ছাতের দরজার দিকে। দরজার পাশ দিয়ে একটা মুখ উঁকি মারছে।
দাদুর মুখ। এ মুখ পিন্টু এর আগে কখনও দেখেনি। সারা মুখ হাসিতে উজ্জ্বল, চোখের চাহনি দুষ্টুমিতে ভরা।
পিন্টু অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সে মুখের দিকে।
তারপর দাদুর ডান হাতটা বেরিয়ে এল দরজার পাশ দিয়ে।
পিন্টু দেখল সে হাতে ধরা তার ডাংগুলির ডান্ডা।
এবার দাদু পিন্টুকে আসবার জন্য ইশারা করে দরজা থেকে সরে গেলেন। পিন্টু ছাতের দিকে এগিয়ে গেল।
বেশ বড় ভোলা ছাত, ছাতের মাঝখানে রাখা শ্রীনিবাসের তৈরি কাঠের গুলি। দাদু পিন্টুর দিকে চেয়ে একবার হেসে হাতের ডান্ডাটা গুলির দিকে তাগ করে মারলেন–খটাং!
