শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা ১৩৭৭
পিন্টুর দাদু
পিন্টুর আপসোস এইখানেই। তার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেরই দাদু আছে, কিন্তু কই, তাদের কেউই তো তার নিজের দাদুর মতো নয়। রাজুর দাদুকে সে দেখেছে নিজে হাতে লাল আর বেগুনি কাগজের ফিতে পর পর জুড়ে রাজুর ঘুড়ির জন্য লম্বা ল্যাজ তৈরি করে দিতে। স্বপন আর সুদীপের দাদু–যাঁর টকটকে রং, গালভরা হাসি আর ধপধপে সাদা দাড়িগোঁফ দেখলেই পিন্টুর ফাদার ক্রিসমাসের কথা মনে পড়ে যায় তিনি কী দারুণ মজার মজার ছড়া লেখেন। একটা ছড়া স্বপনের কাছ থেকে শুনে শুনে পিন্টুর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল; এখনও বেশ কয়েক লাইন মনে আছে–
লন্ডন ম্যাড্রিড সানফ্রানসিস্কো
আকবর হুমায়ূন হর্ষ কণিষ্ক
অ্যান্ডিজ কিলিমাঞ্জারো ফুজিয়ামা
তেনজিং ন্যানসেন ভাস্কো-ডা-গামা
রিগা লিমা পেরু চিলি চুংকিং কঙ্গো
হ্যানিবল তুঘলক তৈমুরলঙ্গ…
কী মজার ছড়া!–এক লাইন ভূগোল, এক লাইন ইতিহাস। আর ছড়া যে শুধু লেখেন তা নয়; তাতে সুর দিয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করে পাড়ার ছেলেদের ডেকে শোনান।
এ ছাড়া সন্তুর দাদু–যাঁকে দেখতে ঠিক হ-য-ব-র-লর উদোর মতো–তিনি মোমবাতির আলোয় দেয়ালে নিজের হাতে ছায়া ফেলে দারুণ শ্যাডোগ্রাফি দেখান; অতীনের দাদু ফাটাফাটি রকম ভাল শিকারের গল্প করেন; সুবুর দাদু সাবানজলে কী জানি একটা মিশিয়ে আশ্চর্য রকম মজবুত বুদবুদ তৈরি করেন। একবার তাঁর তৈরি একটা পাঁচ নম্বর ফুটবলের সাইজের বুদবুদকে পিন্টু সাতবার মাটিতে পড়ে লাফিয়ে তারপর ফাটতে দেখেছিল।
পিন্টু অনেকবার এইসব ভেবেছে, আর নিজের দাদুর সঙ্গে এদের দাদুর তুলনা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে।
একটা গালভরা নাম আছে অবিশ্যি পিন্টুর দাদুর–ত্রিদিবেন্দ্রনারায়ণ গুহ মজুমদার। নামের পর আবার অনেকগুলো ইংরিজি অক্ষর আর কমা-ফুলস্টপ। সেগুলো সব নাকি দাদুর পাওয়া ডিগ্রি। মা বাবার কাছে পিন্টু শুনেছে যে দাদুর মতো বিদ্বান লোক শুধু বাংলাদেশে কেন, ভারতবর্ষেই কম আছে। দাদু নাকি বারো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তাঁর পড়াশুনার জন্য বাড়ি থেকে প্রায় খরচই দিতে হয়নি, কারণ তাঁর মতো এত বৃত্তি নাকি খুব কম ছাত্ৰই পেয়েছে। তা ছাড়া সোনা রুপোর মেডেল যে কত আছে তার তো হিসেবই নেই। আর আছে নানান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া মানপত্র, যেগুলো দাদুর ঘরের দেয়ালের সব ফাঁক ভরিয়ে দিয়েছে। যদিও দাদু সব বিষয়েই পণ্ডিত, যে বিষয়টা তাঁর সবচেয়ে ভাল করে জানা, সেটাকে বলে দর্শন। এই দর্শন নিয়ে দাদুর লেখা একটি ইংরেজি বই বেরিয়েছে দুবছর আগে। পিন্টু দেখেছে সেটায় ৭৭২ পৃষ্ঠা, আর তার দাম পঁয়ষট্টি টাকা।
কিন্তু এত জ্ঞান, এত বিদ্যা হলেই কি মানুষকে এত গোমড়া আর এত থমথমে হতে হবে? পিন্টুর বন্ধুদের মধ্যে তো এটা একটা ঠাট্টারই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। –হারে, আজ তোর দাদু হেসেছেন?–এ প্রশ্নটা যে পিন্টুকে কতবার শুনতে হয়েছে! উত্তরে সে যদি যা বলে, তা হলে সেটা হবে মিথ্যে কথা; কারণ পিন্টুর এই আট বছরে এমন একটা দিনও মনে পড়ে না যেদিন সে দাদুকে হাসতে দেখেছে। তবে এও ঠিক, যে ধমকধামক করা বা গলা তুলে কথা বলা, এগুলোও দাদু বিশেষ করেন না। সেটার সুযোগও বাড়ির লোকে দেয় না, কারণ সবাই জানে যে দাদুর পান থেকে চুনটি খসলে কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে। পিন্টু মার কাছে শুনেছে যে সে যখন জন্মায়নি তখন জগন্নাথ ধোপা একবার নাকি দাদুর পাঞ্জাবিতে ভুল করে বেশি মাড় দিয়ে ফেলেছিল। তাতে দাদু তাঁর কাঁঠাল কাঠের লাঠি দিয়ে প্রথম জগন্নাথকে পেটান, তারপর তার গাধাটাকে পেটান। গাধাটা কী দোষ করল সেটা আর কারুর জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি।
পিন্টু নিজে গত বছর বাড়ির বাইরের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ডাংগুলি খেলতে গিয়ে দাদুর ঘরের জানলার একটা কাঁচ ভেঙে দেয়। দাদু তখন সারাদিনের লেখাপড়ার কাজের পর বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে শবাসনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় গুলিটা কাঁচ ভেঙে ঘরের ভিতরে এসে পড়ে। দাদু গুলি হাতে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। পিন্টুর হাতেই ডাণ্ডা, তাই দাদুর বুঝতে বাকি থাকে না কার কীর্তি এই কাঁচ ভাঙা। দাদু চোখ রাঙাননি, ধমক দেননি, এমন কী একটি কথাও বলেননি পিন্টুকে।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরলে পর মা পিন্টুকে ডেকে বললেন, ডান্ডাটা দে। ওটা থাকবে দাদুর ঘরে। আর সাতদিন তোর সব খেলা বন্ধ।
পিন্টুর চোখে জল এসে গিয়েছিল। সাতদিন খেলা বন্ধের চেয়েও বেশি আপসোস হয়েছিল ডান্ডা-গুলিটার জন্য। বিশেষ করে গুলিটা। শ্রীনিবাস কী সুন্দর করে দা দিয়ে ছুঁচোলো করে কেটে দিয়েছিল দুটো দিক। এত ভাল গুলি এ তল্লাটে আর কারুর নেই।
অথচ পিন্টু জানে যে দাদু ছেলেবেলায় এরকম ছিলেন না। বাড়িতে একটা অনেক দিনের পুরনো বিলিতি ফোটো অ্যালবাম আছে, যার মোটা মোটা পাতার পাশগুলোতে সোনার জল লাগানো। সেই অ্যালবামে দাদুর একটা ছবি আছে বাষট্টি বছর আগে ভোলা। তখন দাদুর পিন্টুরই বয়স। তাতে দাদুর পরনে হাফ প্যান্ট, মুখে হাসি, আর হাতে একটি হকি স্টিক। তাঁর তখনকার চেহারার সঙ্গে পিন্টুর নিজের চেহারার আশ্চর্য মিল সেটা পিন্টু বেশ বুঝতে পারে। সেই হাসিখুশি খেলুড়ে থোকা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এমন হয়ে গেল কী করে?
