আমরা বললুম, ‘না, না, এতে আমাদের কোনও আপত্তি হবে না।’
কুশল রক থেকে বীরের মতো সাইকেলের সিটে উঠে বসল। বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এইবার আমি আমার মনকে বলব, মন! তুমি কাঁচা নও, পাকা সাইকেল চালক। তুমি সাইকেলে ভূ-পর্যটন করে এসেছ। তুমি সাইকেল চড়ে পৃথিবীতে এসেছ, সাইকেল চড়েই স্বর্গে যাবে।’
কুশল প্যাডেলে পা রেখে চাপ দিল। ডান দিকে হাতল ঘুরিয়ে লগবগ করে রাস্তায় নেমে পড়ল। আমরা ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেললুম। কুশল পড়বে, সাঙ্ঘাতিকভাবে পড়ে হাড়গোড় চুরমার করে ফেলবে। চোখ খুলে দেখি, কুশল অনেকটা দূরে চলে গেছে। সাঁই সাঁই করে গঙ্গার দিকে চলেছে। আমরা পেছন-পেছন দৌড়োচ্ছি। কুশল উল্কার মতো সামনে ছুটছে। রাস্তা শেষ। কুশল ঘাটের চাতালে। আমরা চিৎকার করছি, ‘নেমে পড় নেমে পড়।’ চাতাল শেষ করে কুশল। সাইকেলসুষ্ঠু লাফাতে-লাফাতে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে সোজা জলে নেমে গেল।
আমরা কোনওরকমে কুশলকে টেনেটুনে জল থেকে তুললুম। ডান পাটা ভেঙে গেছে। ডান হাত চুরমার। মনে আছে আমাদের, হাসপাতালে কুশলের জন্যে আলাদা একটা বেড রাখা হয়েছিল। কারণ, কুশল মনের জোরে সবকিছু করতে চাইত। তার ফলে দেহ কাবু হয়ে পড়ত। স্কুলে, কুশলের শেষ মনের জোর যা দেখেছিলুম, তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়া। কুশল দেখাতে চেয়েছিল, মনের জোরে মানুষ পাখির মতো উড়তেও পারে। সেবার তিন মাস শুয়ে ছিল। হাসপাতালে।
আজ, কুশল একজন বড় বিজ্ঞানী। আমেরিকায় থাকে। আমাকে আর অপূর্বকে হয়তো আর মনে নেই। এইটুকু জানি, কুশল মনের জোরেই বড় হয়েছে। অমরস্যার হঠাৎ মারা গেলেন। কুশল নিজেকেই নিজে বড় করেছিল।
কে?
১.
দু গেলাস চা, দুটো দিশি বিস্কুট। হাসপাতালের সামনে কোনওরকমের একটা চায়ের দোকান। যত বিপদগ্রস্ত মানুষ খদ্দের। কী খাচ্ছে না খাচ্ছে খেয়ালই নেই। মন পড়ে আছে বিপরীত দিকের হাসপাতালে, যেখানে প্রিয়জনেরা জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। সায়েব আমলের এক নম্বর হাসপাতালের এখন দশদশা। ভেতরে ঢুকলে কান্না পায়।
সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। কোনওরকমে চা শেষ করে আমি আর সুবীর একটা পার্কে। গিয়ে বসলুম। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। সুবীর বললে, ‘কী হয়ে গেল বল তো! আমি ভাবতেই পারছি না। কী করে হল? আত্মহত্যার চেষ্টা নয় তো!’
‘আত্মহত্যা করতে যাবে কী কারণে? অসাবধানতা। গ্যাস জ্বালিয়ে দেশলাই কাঠিটা নাইটির ওপর ফেলে রেখেছে। খেয়াল করতে পারিনি। যখন দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে, তখন ভয়ে কী করবে না করবে ঠিক করতে পারেনি। অনেকেই পারে না।’
‘বেশ ভালোরকম পুড়েছে। তোর কি মনে হয়, বাঁচবে তো?’
‘ভগবান জানেন। বার্ন কেসে কিছু বলা যায় না।’
সুবীর বাদাম কিনলে। সন্ধে এগিয়ে আসছে। একপাশে বাচ্চারা হইচই করছে। ছড়ি হাতে বৃদ্ধরা পাকের পর পাক মেরে চলেছেন। আরও আরও বাঁচতে হবে। কেউ মরতে চায় না। সাজপোশাক দেখে বোঝা যায় বিত্তবান। হয় বড় চাকরি করতেন, না হয় ব্যবসা। বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, ভরপুর সংসার।
এই সরকারি উদ্যানে আগেও বসেছি অনেকবার। ছাত্রজীবনের কত বিকেল এখানে পড়ে আছে! সৌরভ, শ্যামল, বিদ্যুৎ, বিকাশ। কে কোথায় চলে গেল! ডাকাবুকো শ্যামল এত জোরে বাইক চালাল, পৃথিবীর বাইরে চলে গেল। আমাদের ব্যাচে বিধানই খুব উন্নতি করেছে। এখন আমেরিকার ‘নাসা’য় আছে। সায়েন্টিস্ট। খুব অভাবের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছে। হয়েছে তার। মায়ের জন্যে। অমন মা বিরল। আমার দাদু বলতেন, জন্ম দিলেই মা হয় না। কোন্নগরে গঙ্গার ধারে এক চিলতে একটা বাড়ি। ছোট্ট একটা কিচেন গার্ডেন। বিধানের বয়েস তখন তিন, বাবা মারা গেলেন। মা মানুষ করলেন ছেলেকে। সে এক সংগ্রাম। বিধানের বাড়িতে প্রায় প্রতি রবিবারেই যেতুম। দুটো আকর্ষণে—গঙ্গা আর মাসিমার হাতের অসাধারণ রান্না। ভীষণ। ভালোবাসতেন আমাকে। এখন আর যাই না। সংকোচ। আমি তো কিছু হতে পারলুম না। একেবারে মিডিওকার। আমার বাবা দুঃখ করে বলতেন, হওয়ার ইচ্ছে না থাকলে কিছু হওয়া যায় না।
সুবীর বললে, ‘কিছু মনে করিস না, আমাকে যেতে হচ্ছে, শেয়ালদার এক পার্টিকে টাইম দেওয়া আছে।’
সুবীরের নিজস্ব একটা ফার্ম আছে—ইলেকট্রিক্যাল কনট্রাক্টর। বেশ ভালোই চালাচ্ছে। ব্যবসাদারের ফ্যামিলি। পরিবারের কেউ কখনও চাকরি করেননি। বড়বাজারে পারিবারিক একটা ব্যবসা আছে হার্ডওয়্যারের। কলকাতায় তিনখানা বাড়ি।
সুবীর একটু অন্যরকমের। লেখাপড়ায় বেশ ভালো ছিল। শিবপুরের ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরির অনেক সুযোগ এসেছিল। নেয়নি। হাতে বড় বড় প্রোজেক্ট। গ্রে স্ট্রিটে অফিস। কেন জানি না আমাকে ভালোবাসে। কখনও বন্ধু, কখনও আবার অভিভাবক। জীবনের পরামর্শ দেয়। মাঝেমধ্যে শাসনও করে।
আমি একটা জরাজীর্ণ বাড়ির দোতলার একটা ঘরে থাকি। বাড়িটা আমার দাদুর। বেশ বড়ো বাড়ি। আমার দাদু একজন নামী মানুষ ছিলেন। ইংরেজির অধ্যাপক। বহুবার বিলেত গেছেন। আমার মা একমাত্র মেয়ে। ছেলে ছিল না। দিদিমা বাড়িটা আমাকে লিখে দিয়ে গেলেন। আমার আদর্শবাদী বাবা দান নেবেন না। বাড়িও করলেন না। ভাড়া বাড়িতে দিন কাটালেন। বাড়িটা পড়ে রইল তালা বন্ধ। বাবা ছিলেন কেমিস্ট। জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনে ল্যাবরেটারিটা নষ্ট হল। নেতারা নৃত্য করলেন। বাবা ওপরে চলে গেলেন। পড়ে রইলুম আমি আর আমার মা। ভাড়া বাড়ি ছেড়ে দিয়ে উঠে এলুম দিদিমার বাড়িতে।
