‘মানুষ খায়?’
‘আমাকে খাইয়ে দেব। তুই বাড়ি চলে আসবি।’
পরের দিন খুব ভোরে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। পথ একসময় ফুরিয়ে গেল। তারপর মাঠ ময়দান। এর আগে একটা চালা দোকানে আমরা গরম জিলিপি আর কচুরি খেয়েছি। দোকানদারকে জিগ্যেস করায় বললেন, ‘নদী! সে তো বেশদূরে। অনেকটা পথ। কেউ থাকে না সেখানে। এক শিকারি সাহেবের ভাঙা একটা বাংলো আছে। সাপের আড্ডা। সেখানে গিয়ে কী করবে তোমরা!’
রুকু বললে, ‘নদী দেখব।’
‘নদীর আবার দেখার কী আছে? কলকল করে জল যাচ্ছে। সাদা সাদা পাথর।’ রুকু বললে, ‘সেইটাই তো দেখব।’
দোকানদার আর কথা বললেন না। বিরক্ত মুখে কড়ায় জিলিপি ঘোরাতে লাগলেন।
রুকু জিগ্যেস করলে, ‘কোন দিক দিয়ে যাব?’
‘পশ্চিমে ঘুরে যাও। শেষ এক মাইল স্রেফ জঙ্গল।‘
‘বাঘ আছে?’
‘না, বাঘ ওপারে। মাঝেসাঝে দেখা যায়।’
‘তাহলে আবার কী?’
‘আনন্দের কিছু নেই। প্রচুর কটাস আছে।’
‘কটাস আবার কী?’
‘বড় বড় কালো কালো বনবেড়াল। ধরলে শেষ।’
রুকুর খুব আনন্দ বিপদের নাম শুনলে। নাচতে থাকে।
শীতকাল। হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছে। ফনফনে উত্তরে বাতাস। আমাদের দুজনের হাতেই ভাঙা গাছের ডাল। বনবেড়াল এলে পেটাতে হবে। দেহাতি গ্রামের এলাকা শেষ হয়ে গেল। প্রথমে পাতলা জঙ্গল। ঘন জঙ্গল এইবার শুরু হবে। দূরে দেখতে পাচ্ছি।
গাছের আড়াল থেকে ভোজবাজির মতো একটা বাচ্চা ছেলে বেরিয়ে এল। ভারী সুন্দর দেখতে।
কোঁকড়া চুল। খাড়া নাক, বড় বড় চোখ। ছেলেটি জিগ্যেস করলে, ‘কোথায় যাচ্ছ তোমরা?’
‘নদীর কাছে। তুমি কে?’
‘আমি এই বনে থাকি। আগে আমার জায়গায় চলো। বিশ্রাম করে নদীতে যাবে।’
ছেলেটি আগে আগে চলেছে। আমরা পেছনে। যেন টেনে নিয়ে চলেছে অদৃশ্য দড়ি দিয়ে বেঁধে। গভীর জঙ্গলে হঠাৎ একটা জায়গা খুব পরিষ্কার। সেখানে একটা ভাঙা মন্দির। অপূর্ব কারুকাজ সব ভেঙে ভেঙে পড়ছে। ছেলেটি চট করে সেই মন্দিরে ঢুকে গেল। ভেতরের থেকে ডাক এল ‘এসো’।
কেউ কোথাও নেই শ্বেতপাথরের বেদীর ওপর শ্বেতপাথরে তৈরি শ্রীরামচন্দ্রের অপূর্ব মূর্তি। যেন হাসছেন। কী সুগন্ধ!
ভাঙা মন্দিরের পাশে একটা কুঠিয়া। সেখানে শুয়ে আছে এক বৃদ্ধ সাধু। জ্বরে অচৈতন্য। রুকু। সঙ্গে সঙ্গে সেবা শুরু করল। জলপটি কপালে দিয়ে আমাকে বললে, ‘পা ঘষতে থাক। বরফ হয়ে গেছে।’
অনেকক্ষণ পরে সাধু চোখ মেলে বললেন, ‘রুকু! তুমি আর পলাশ এসেছ, আমি দেখেছি। আজ রঘুবীর তিন দিন উপবাসী।’
‘নাম জানলেন কী করে?’
‘ও জানা যায়, রঘুবীরের কৃপায়। আমার পাত্রে পঞ্চকেদারের জল আছে, আমার মুখে দাও। এক্ষুনি সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর তোমরা ভোগ বসাও। পেছনেই নদী। আগে স্নান করে এসো।’
নদীতে স্নান করতে করতে রুকু বললে, ‘আমি আর ফিরব না। আমার বিশ্বাস সাধু আর কেউ নয়, বিশ্বামিত্র মুনি!’
স্নান করে ওঠার পর যা হল, তা আরও অদ্ভুত। সেই জায়গাটা আমরা আর খুঁজে পেলুম না! সেই মন্দির, বিগ্রহ নেই, সারা জায়গা জঙ্গল আর জঙ্গল! যেদিকে যাই জঙ্গল।
কুশলের সাইকেল
অমরবাবু মানে অমর বসু আমাদের ব্যাকরণ পড়াতেন। ব্যাকরণ যতটা নীরস, অমরস্যার তার চেয়েও নীরস ছিলেন। চেহারাটা ছিল কোষো পেয়ারার মতো। আমরা নাম রেখেছিলুম সব্যসাচী স্যার। ডান হাত, বাঁ হাত দুটোই সমান চলত। বেত আর ডাস্টার দুটোই চালাতেন অক্লেশে। আর একটা কী? বাদ দিতেন না কাউকে। ফার্স্ট থেকে লাস্ট বেঞ্চ, সবাই গোল আলু, ঠিকরে আলু। আঁচড়, শুধু কামড়টাই বাদ যেত। আমরা বলাবলি করতুম, আর একটু বয়স বাড়লে ক্লাসে আমাদের কামড়েও দিতে পারেন। তবে একটাই কথা—সব্যসাচীস্যারের বয়স বাড়লে আমাদেরও বয়স বাড়বে। বছরের পর বছর ফেল না করলে আমরা পাসটাস করে বেরিয়ে যাব। তখন যাকে কামড়াবেন, তাকে কামড়াবেন, আমাদের দেখার দরকার নেই।
অমরস্যারের ছেলের নাম কুশল। কুশল আমাদের সঙ্গেই পড়ে। ফাস্ট বেঞ্চে বসে। ভালো ছেলে। ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়। অঙ্কে আর ইংরেজিতে ভীষণ ভালো। কুশলের তেমন অহংকার নেই। আমাদের সঙ্গে মেশে। মুখ গোমড়া করে বসে থাকে না। কুশলের চোখ খুব খারাপ। পুরু লেন্সের চশমা চোখে। কাচের আড়ালে বড়-বড় চোখদুটো ঝকঝক করে। কুশল একটু তড়বড় তড়বড় করে কথা বলে। কথা বলার সময় হাত নাড়ে খুব। ছেলেটা খুব সরল। আমার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব। স্কুল ছুটির পর ক্লাসরুমে বসে দুজনে অনেকক্ষণ গল্প করি। তার কাছে আমি আবার অঙ্ক বুঝে নিই। যে-অঙ্ক আমি জীবনে কষতে পারব না, কুশল তা নিমেষে করে ফেলে।
যে-কুশল কখনওই স্কুল কামাই করে না, সে পরপর তিনদিন ক্লাসে আসছে না। ব্যাপারটা কী হল! অমরস্যারকে ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘স্যার, কুশল কেন আসছেনা?’
‘কুশল কেমন আছে কুশল জানে, আমাকে জিগ্যেস কোরো না।’ ভয়ে পালিয়ে এলুম। আমার আর-এক বন্ধু অপূর্বকে বললুম, ‘কুশলের কী হল বল তো?’
‘চল না ছুটির পর দেখে আসি।’
‘স্যার যদি মারেন!’
‘কারও বাড়ি গেলে মারে! মারামারি সব ক্লাসে।’
স্কুল থেকে প্রায় এক মাইল হবে কুশলদের বাড়ি। খেলার মাঠ, বোসদের ঝিল, বরফকল, হরেনবাবুর কাঠকল পেরিয়ে, শ্মশানের পাশ দিয়ে, নদীর ধারে বাড়িটা। বড়লোকদের বড়-বড় বাগানবাড়ি, সারাদিন ঝিম মেরে থাকে। সেইরকম দুটো বাগানবাড়ির মাঝখানে অমরস্যারের বাড়ি। বেশ বড় একটা উঠোন। উঠোনের মাঝখানে একটি কামিনী গাছ। লাল দালান। পেছনেই নদী। বাড়িটা বেশ শান্ত। আমরা ডাকছি, ‘কুশল, কুশল!’ কোনও সাড়া নেই। সময়টা বিকেল বিকেল। কৃষ্ণকলির ঝোপে সাদা, হলুদ, নীল ফুল ফুটেছে। কামিনীর ডালে চড়াই পাখির ঝাঁক গল্প করছে। আবার ডাকলুম—’কুশল’! আমরা এই প্রথম কুশলদের বাড়িতে আসছি।
