ছিয়াশির পয়লা কী হয়েছিল মনে আছে! আমার জন্যে এক টুকরো কেক কেটে ডিশে ফেলে রেখেছিল। ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘ইন গুড ফেথ’—সেই পূর্ণ আস্থা নিয়ে মুখে ফেলে দিলুম। জিভ পরোটা। কে জানত পিঁপড়েরাও নববর্ষ করে! হাজার খানেক লাল পিঁপড়ে জড়িয়ে ছিল। মুখে ফেলার সময় এক লহমার দেখায় ভেবেছিলুম কারিকুরি। পোস্তর দানা মাখিয়েছে। প্রথমে জিভটাকে কামড়ে শেষ করে দিলে। একটা বাহিনী টনসিল আক্রমণ করে গলায় বড়ে গোলাম আলির জোয়ারি এনে দিল। বাকি সব স্টম্যাকে ঢুকে সেলাইকল চালাতে লাগল। ডিভিসি-র জল ছাড়ার কায়দায় গলার সুইস গেট খুলে কয়েক গ্যালন চালিয়ে দিলুম। নে সব ডুবে মর। গেরস্তের সে কী হাসি! সবাই বললে, সাঁতার শিখে নে।
সাঁতার তো শেখাবে। কোন সাঁতার? সংসার সমুদ্রে সাঁতার কাটা শেখাবে কি! সেই সাঁতারই আসল সাঁতার। এত চেষ্টা করেও যা শেখা গেল না। টাকার লাইফবোটে চেপে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া যায়, সেই টাকাই তো নেই। এখন একটা ষাঁড় খুঁজছি, যার ন্যাজ ধরে বৈতরণীটা অন্তত পার হওয়া যায়! সেটা তো পেরোতে হবে! সাতাশি তো সেই কথাই স্মরণ করাতে চায়। জীবন। তো বালির ঘড়ি। ঝুরঝুর করে ঝরেই চলেছে। এ ঘড়ি গোল হয়ে ঘোরে না। বারোটা-একটা। নেই। সোজা ছুটছে। মানুষের সঞ্চয় কমে এলে ভয় হয়। পুঁজি তো আর বেশি নেই। চেকবই শেষ হয়ে আসছে। এর পর হঠাৎ একদিন সেই লাল স্লিপটা বেরিয়ে পড়বে। সতর্কবাণী—আর মাত্র পাঁচটা আছে। জীবনের বছর এমন ব্যাঙ্কে জমা আছে, যে ব্যাঙ্ক দ্বিতীয় বার আর চেকবই দেয়। না।
ইংরেজিতে বলে, লুক বিফোর ইউ লিপ। ঝাঁপাবার আগে দেখে ঝাঁপাও। বছর এমন এক নদী, সেখানে না দেখেই ঝাঁপাতে গিয়ে ছেলেবেলায় নদীতে প্রথম সাঁতার শেখার কথা মনে পড়ছে। হাফপ্যান্ট পরে কোমরে গামছা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছি ঘাটে, আচমকা ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিলেন আমার সাঁতার শিক্ষক। হাবুডুবু। বোয়াল মাছের মতো গ্লাব গ্লাব করে জল খাচ্ছি। একবার ডুবছি, একবার উঠছি। বেঁচে থাকার কী অদম্য ইচ্ছা! যিনি আমাকে হঠাৎ ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলেন, তিনিই আবার চুলের কুঁটি ধরে ভাসিয়ে দিলেন। সেই যে ভাসতে শিখলুম জলে, আর ডুবিনি কোনওদিন। সেদিন প্রচণ্ড অভিমানে কেঁদে ফেলেছিলুম। আমার সাঁতার শিক্ষক কাকাকে জিগ্যেস করেছিলুম, ‘কেন আপনি অমন করে ঠেলে ফেলে দিলেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘বোকা। জল না খেলে সাঁতার শিখবি কী করে!’
পুরোনো বছর আমার সেই সাঁতার শিক্ষক, আচমকা ধাক্কা মেরে নতুন বছরের স্রোতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। জলে পড়লে হাত-পা তো ছুঁড়তেই হবে। উপায় নেই। ছিয়াশির মতো সাতাশিতেও হাত-পা ছুড়ব। শীত শীত ভাব কেটে গিয়ে আসবে ক্ষণবসন্ত। কোথাও না কোথাও একটা কোকিল ডাকবেই। এসে যাবে গ্রীষ্ম। গদিতে যাঁরা গদিয়ান, তাঁরা প্রথমে চিকার। করবেন, ‘খরা খরা’ বলে। তারপরই আসবে বন্যা। শুরু হয়ে যাবে বন্যাত্রাণের নাচা-গানা। কলকাতার পুকুর পানিতে নাকানিচোবানি খেতে খেতে আমাদের দাদ, হ্যায়জা, খুজলি হয়ে যাবে। এক্সপার্ট তাঁর মাচা থেকে ওপিনিয়ান ছাড়বেন, কলকাতা হল বাটি, এ বাটিতে জল। জমবেই। কুইন ভিক্টোরিয়া কি জর্জ দি ফিফথের সঙ্গে ওপরে গিয়ে দেখা হলে বোলো, ‘কী প্ল্যান করেছিলেন মশাই! ভূ-গর্ভের নকশাটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি ম্যাডাম। একটা কপি দিতে। পারো! স্বপ্নে প্রশান্ত শূরকে জানিয়ে দাও।’
স্বাগত সাতাশি। যা হওয়ার তা হবে। যা হওয়ার নয়, তা হবে না। এই তো জেনেছি। ময়দানে ফুটবল পড়বে। হয় মোহনবাগান, না হয় ইস্টবেঙ্গল জিতবে। নতুন নতুন ছেলে-মেয়েরা নতুন নতুন প্রেমে পড়বে। কিছু কর্মচারী রিটায়ার করবেন, নতুন কিছু চাকরি পাবেন। পাত্রপাত্রীর কলামে বিজ্ঞাপন হাতড়াবেন ছেলেমেয়ের বাপ। সানাই বাজবে আবার বলহরি-ও হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে হাতাহাতি হবে। কারুর সঙ্গে হলায়-গলায় হবে। কর্তার মেজাজ কখনও চড়বে, কখনও নামবে। গৃহিণী কখনও সরাসরি কথা বলবেন, কখনও দেয়ালে ক্যামেরার আলোর। কায়দায় বাউন্স করিয়ে। সার সত্য—চলছে চলবে। টাকেও চিরুনি চলবে।
স্বামী-স্ত্রী সংসার
দেখো, বছর পাঁচেক হল আমাদের বিয়ে হয়েছে. প্রশান্ত চায়ের কাপে চুমুক লাগাল। প্রথম চুমুকটা সশব্দে। পরেরটা একটু কম শব্দ। তৃতীয়টা নিঃশব্দে। অর্থাৎ ঘোরতর আবেগ, স্বল্প আবেগ এবং পরিতৃপ্তি। সামনে পোর্সেলিনের প্লেটে ঘিয়ে-ভাজা ফুল ফুল চিঁড়ে, তার ওপর মিহি করে ছড়ানো মরিচের গুড়ো। পাশে আড় করে রাখা ঝকঝকে একটি চামচে।
কাপটা বেশ সন্তর্পণেই নামাতে চেয়েছিল। দূরত্ব আর বেগের হিসেবের সামান্য গোলযোগে সেই ঠকাস শব্দটা হলই হল।
প্রমীলা সামনের সোফায় বসে সোয়েটার বুনছিল। এই বোনার সময় সে গোলমতো অদ্ভুত একটা চশমা পরে। নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রাখে বিচক্ষণ মোক্তারের মতো। প্রমীলা কোনও কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে প্রশান্তর দিকে তাকিয়ে রইল। প্রশান্ত অপরাধীর মতো মুখ করে বললে, আই অ্যাম সরি। আমি সাবধানেই নামাই, আর তখনই টেবিলটা ওপর দিকে উঠে আসে, এ এক অদ্ভুত ভৌতিক ব্যাপার।
প্রমীলা বোনায় মনোনিবেশ করে বললে, হুঁ, এর দাওয়াই আমার জানা আছে।
