একদিন দেখি, বিহারী মোটা দাঁড়ার চিরুনি দিয়ে বিমলার চুলের জট ছাড়িয়ে দিচ্ছে। যেন দুই সখী। বিমলা একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, এই মানুষটার কাম নেই, এর সবটাই প্রেম। আমাদের এই সংসার—আনন্দের সংসার। দুঃখ আমাদের পোষা কুকুরের মতো। আর কষ্ট হল আমাদের পাপোশ।
এই ভয়ংকর পৃথিবীর খাঁজে খাঁজে কোথাও না কোথাও এইভাবে স্বর্গ আটকে আছে। দেবতার দেখা পাওয়া যায়!
স্বাগত সাতাশি
সুপ্রভাত সাতাশি। গুড মর্নিং। তার আগে দিশি কোম্পানির এক চাকলা কেক খেয়ে নি। পিঠেপুলি তো আর তেমন ধাতে সয় না। বাঙালি প্রথায় একমাত্র মালপো ছাড়া সবই অখাদ্য। চালের ডোর খোলসের ভেতর গুড় দিয়ে চটকানো নারকেলের পুর ঠেসে, তারপর হয় জলে, না হয় দুধে সিদ্ধ করে, ছুঁচোর মতো দেখতে কী একটা তৈরি করা হয়! অপূর্ব! অনবদ্য! ওই বস্তুটিই মনে হয় গীতার আত্মপুরুষ যাকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্ৰানি, নৈনং দগ্ধতি পাবক।’ দাঁতে ফেললেই বোঝা যায়, সহজে কাবু হওয়ার জিনিস নয়। কাবু করার জিনিস। ‘যতবার আলো জ্বালাতে চাই’-এর মতো, যতবার দাঁত বসাতে যাই, নিবে যায় বারে বারের মতো, ফিরে আসে বারেবারে। ছেলেবেলায় ইরেজার খাবার অভিজ্ঞতা। এর নাম পিঠে। পুলি পিঠে না সিদ্ধ পিঠে, কী যেন বলে! এই পিঠে পেটের জিনিস নয় পিঠের জিনিস। সাউথ আফ্রিকা, জাপান প্রভৃতি দেশে জনতা ছত্রভঙ্গ করার জন্যে রাবার বুলেট বন্দুকে পুরে ছোড়া হয়। আমাদের দেশেও গুলি চালিয়ে পুলিপিঠে চালানো যায়। দমাদ্দম পিঠে চালিয়ে রাজভবন কি এসপ্ল্যানেড ইস্ট থেকে জনতা ছত্রভঙ্গ করলে, জনগণেরও কিছু বলার থাকবে না। প্রবাদেই আছে, পেটে খেলে পিঠে সয়। অনেকটা হরির লুটের মতো।
আমাদের ভাষায় যেন বাংলা আর ইংরেজির পাঞ্চ, সেই রকম সংস্কৃতিতেও বাঙালি, বিহারি, ইংরেজি, পাঞ্জাবি, ফরাসি, ফারসি, তুর্কি, মুর্কি, যা পেয়েছি, সব ঢুকিয়ে মানিকপীরের মতো এক আলখাল্লা তৈরি হয়েছে। সাতাশিকে তাই সুপ্রভাত বললে হবে না, গুড মরনিং, রাম রাম, সালাম আলেকম সবই বলতে হবে। কেক, পিঠে, সরুচাকলি, চরণামৃত, বোতলামৃত সব দিয়েই ভজনা করতে হবে।
পিঠে আর পেটো যেমন প্রায় এক হয়ে এসেছে, মালমশলা আর শিল্পনৈপুণ্যে, সেই রকম হয়েছে। কেকের অবস্থা। কেক আর ডাংকেক প্রায় সমান। আগে যে চাল ছিল, সে চাল আর নেই। বাসমতীই আছে তবে মুখে তোলার আগে দম বন্ধ করে তোলাই ভালো। আর মুখে পুরে ফোঁস না করাটাই নিরাপদ, কারণ তাহলেই মনে হবে ধাপায় ডাইনিং টেবিল পেতে লাঞ্চ করছি। এক বড়কর্তাকে জিগ্যেস করেছিলুম, মশাই, ভাত আর ভালুক—একই রকম গন্ধ হল কী করে! কোন কায়দায়? ভালুক বলায় তিনি ভেবেছিলেন আমি বিয়ারের সঙ্গে তুলনা করছি। বললুম, বোতলজাত ভালুক নয়, সেই ভালুক, যা কলকাতার রাস্তায় খেলা দেখায়। তিনি বললেন, ‘কী। জানি মশাই! আমার সাইনাস আছে। সারা বছরই নাক বুজে থাকে।’
যাঁরা প্রবীণ তাঁরা অতীতের স্বর্ণময় দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন। এক আনায় ষোলোটা হিঙের কচুরি। দু-পয়সার মটকির ঘি কিনলে জয়েন্ট ফ্যামিলির সবাই পেট ভরে ফুলকো লুচি খেতে পারতেন। এক পয়সায় দু-হাত মাপের জ্যান্ত রুই। সেই প্রবীণরাই আক্ষেপ করেন, ‘আর পিঠে! সেই পিঠে! আমার পিসিমা করতেন। সে কী ফ্লেভার! দুধ আর নলের গুড়ে ফুটছে, মনে হচ্ছে বাস্তু বেরিয়েছে।’
‘বাস্তু বেরিয়েছে মানে?’
‘হা ভগবান! বাস্তু জানো না! বাস্তু হল বাস্তু সাপ। বাস্তু সাপ। বাস্তু সাপের অপূর্ব সুগন্ধ।’ শহরে আর সাপ কোথায়। ক-জনেরই বা বাস্তুভিটে আছে! আমরা যে সাপ চিনি, তা বেরোয় মানুষের মনের গর্ত থেকে! গন্ধ নেই, ছোবল আছে। তা সেকালের পিঠেতে নাকি চাল আর গুড়ের গুণে মিঠে মিঠে, সোঁদা সোঁদা অদ্ভুত এক গন্ধ বেরোত। একালের চাল তো আর বস্তায় থাকে না, থাকে মানুষের চলনে। সমাজে চালিয়াত চন্দরের অভাব নেই। কেক হল পিঠের মেড-ইজি। চাল। গুঁড়োনোর হাঙ্গামা নেই। নারকেল কোরার ঝামেলা নেই। দোকানে দোকানে রঙিন সেলোফেন মোড়া পিঠ উলটে পড়ে আছে বিলিতি পিঠে।
টোপর ছাড়া বিয়ে হয় না। কেক ছাড়া আজকাল নববর্ষ হয় না। ইংরেজি নববর্ষ। যাকে প্রকৃত কেক বলে, তা তৈরি হয় বড় নামী জায়গায়। দামও সাংঘাতিক। এক টুকরো খাবার পর এক। ঘণ্টা ধ্যানস্থ। বিবেকের সর্পদংশন। পাঁচ-দশ টাকা ভুল হয়ে গেল। আড়াই টাকা দাঁতের খাঁজেই লেগে রইল। আগে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত ফিল করিয়ে দুঃসাহস দেখানো উচিত ছিল। হ্যাপি নিউ ইয়ার করতে গিয়ে সারা মাস ডালভাত! প্রায় মলমাসের মতো অবস্থা।
টুনি-জ্বলা পাড়ার দোকানে যে মাল ‘অ এ অজগর’ হয়ে আছে তার দশা ওই পিঠের মত। আটা চটকানো চিনির ড্যালা। কুমড়োর বরফি যেন কাচ বসানো খাদির ওড়না। পাউরুটির মিষ্টি সংস্করণ। দাঁতে জড়িয়ে যায়। বাটালি দিয়ে দাঁত চাঁছতে হয়। টুথব্রাশের কর্ম নয়। পেটে ঢুকে হামাগুড়ি দেয়। চা পড়া মাত্রই অম্বল। নিউ ইয়ার টকে যায়। অ্যান্টাসিড দিয়ে সামলাতে হয়।
শুরু যদি এই হয়, শেষে কী হবে জানা আছে। কত বছরই তো এইভাবে এল আর গেল। না। বাড়ল ধন-সম্পদ, না বাড়ল মানসম্মান। বাড়ার মধ্যে বাড়ল কেবল বয়স। যুবক থেকে প্রৌঢ়, প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ। দশ বছর আগে সাইকেল চালক বলত, ‘দাদা সরে, দাদা সরে’, এখন বলে, ‘দাদু সরে, দাদু সরে।’ আগে আমি গুঁতিয়ে বাসে উঠতুম, এখন আমি তো খেয়ে ছিটকে পড়ি। বছর আসে বছর যায়, বুঝতে পারি ভালোবাসা কমছে। বছর আছে, ক্যালেন্ডার আছে, প্রেম। নেই।
