‘তাহলে সেই বাঘের ছালটা কী হল?’
অমল বলল—’কেন! ওটা শ্রীমহাদেবকে দুর্গাপুজোর সময় দিয়ে দিয়েছে। বাবা তো কৈলাসে ইদানীং ওইটা পরেই ঘুরছেন!’
পরিমল রেগে গিয়ে বললে, ‘তোমাদের চরিত্রের একটাই দোষ, কোনও কিছু বিশ্বাস করতে চাও না। বাঘ মারাটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। যে কলকাতার রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারে সে বাঘও মারতে পারে। দুটোর জন্যেই প্রয়োজন সাহস আর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব।’
‘শেষের শব্দটা কী বললে! ওটা শুনলেই বাঘ সেন্সলেস হয়ে যাবে। মুখে বাঘ সব বাঙালিই মারতে পারে। সত্যি বাঘ এলে কী হবে, বলা শক্ত।’
‘দুঃখ একটাই, সত্যি বাঘের দর্শন মেলে না।’
বাইরে থকথকে অন্ধকার। গাছের পাতায় বাতাসের ঝুপুর ঝাপুর শব্দ। হঠাৎ দূরে খুব একটা হইহই শোনা গেল। সঙ্গে টিন, ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দ।
অমল বলল, ‘আজ মনে হয় ট্রাইব্যালদের কোনও উৎসব আছে।’
পরিমল বলল, ‘আমার সন্দেহ অন্য, এ তোমার গিয়ে বাঘ তাড়ানোর শব্দ।’
বিমল বললে, ‘হাতিও হতে পারে। বুনো হাতিরা বহুত অত্যাচারী।’
কথাটা শেষ হয়েছে কি হয়নি, চারজনের মাথার ওপর দিয়ে বিশাল একটা কী জাম্প করে খোলা দরজা দিয়ে সোজা ঘরে। সেখানে যা কিছু ছিল সব দুদ্দাড় করে পড়ে গেল। বিশ্রী একটা বোটকা গন্ধ।
চারজনেই একটা কিছু বলার চেষ্টা করছে, ভয়ে বাক্য সরছে না, বা বাবা। সত্যিই বাঘ! বাঘটা নিজেকে একটু সামলে-সুমলে বেশ রাজকীয় ভঙ্গিতে দরজার সামনে এসে বসল। হাঁড়ির মতো গম্ভীর মুখ। চোখ দুটো জ্বলছে। লেজটা পেছন দিকে অনেক দূর চলে গেছে। প্রায় খাট পর্যন্ত। বাঘটা যেন পর্যবেক্ষণ করছে। চারটের মধ্যে কোনটাকে খাওয়া যায়! অমলই সবচেয়ে লোভনীয়। বেশ মোটাসোটা। রেওয়াজি শরীর। চারজনেই স্থাণু হয়ে গেছে। শরীর পাথরের মতো ভারী। চোখ বুজিয়ে চারজনেই সরু মোটা সুরে মন্ত্রোচ্চারণের মতো বলে চলেছে—’বা বা বা বা।’
লাঠি, সড়কি, বল্লম নিয়ে দলটা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। দৃশ্য দেখে থমকে গেছে। বাঘটা যেন টেরোরিস্ট। বাবু চারজন তার হোস্টেজ। ভাবটা এই—হয় আমাকে যেতে দাও, নয় তো এই চারটেকে চিবোই। দু-পক্ষই থমকে আছে। কী হয়, কী হয়! বাঘটা একটু এগিয়ে এসে অমলের চেয়ার ঘেঁষে কুকুরের মতো বসল।
সাহস বটে চম্পার। রান্নাঘরে তিন কেজি মাংস মশলা মাখিয়ে রেখেছিল। চাঁপ তৈরি করবে বলে। সেই থালাটা নিয়ে, একেবারে বাঘের সামনে। বাঘটা যেন তার বনবাসী ছেলে,
‘খোকা! তুই এসেছিস বাবা?’
বাঘটা যেন হাসল। খুশিতে লেজ নাড়াতেই ঘরের ভেতরের সেন্টার টেবিলটা দেশলাইয়ের খোলের মতো ছিটকে এধার থেকে ওধারে চলে গেল।
চম্পা বলছে, ‘ওরে আমার সোনা! কত দিন ভালোমন্দ খাওয়া হয়নি। গরু, ছাগল, মোষ খেয়ে খেয়ে অরুচি হয়ে গেছে। এই নাও, কাবাব খাও!’
বাঘের সামনে থালাটা রাখতেই সব চেটেপুটে সাফ। ঝাল লেগেছে।
চম্পা বলল, ‘এইবার কী একটু দুদু খাবে! না, মাংসের সঙ্গে দুধ খায় না। বদহজম হবে। জল খাও। বাবুদের জন্যে ফোঁটানো জল আছে ক্লোরিন দেওয়া, সেই জল খাও।’
গজানন এক গামলা জল নিয়ে এল। বাঘ চকচক করে পুরো জলটা খেয়ে বিশাল একটা হাই। তুলল। চম্পা বলল, ‘বুঝেছি বুঝেছি, সোনার আমার ঘুম পেয়েছে। আজ আর বনে-জঙ্গলে শুয়ে কাজ নেই, যাও বাবুদের খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ো।’
বাঘটা কী বুঝল কে জানে, সত্যি সত্যিই একটা খাটে উঠে শুয়ে পড়ল। চম্পা বাইরে থেকে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। তাকিয়ে দেখল, বাবু চারজন প্রায় অজ্ঞান।
‘এই বাবু।’
ঘড়িতে দম দিলে টিক টিক শব্দ। বাবু চারজন সেইরকম আবার শুরু করল, বাবা, বাবা!
‘ঘ লাগাও, ঘ। বাবা নয়, বাঘ, বাঘ।‘
অমল উঠে দাঁড়াল। ট্রাউজারটা ঢিলে হয়ে কোমরের নীচে ঝুলে গেল।
‘এ কী, আমার ভুঁড়ি! আমার ভুঁড়িটা কোথায় গেল!’
‘চুপসে গেছে বাবু!’
‘এতকাল যোগাসনে যা হয়নি!
বিমল বলল, ‘রাতে আমরা কোথায় থাকব?’
ভি.আই.পি. এলে সাধারণ মানুষকে বাংলো ছেড়ে দিতে হয়। আজ আপনারা জঙ্গলে থাকবেন।’ গজানন বলল—’ওই যে কী দেখেন আপনারা সেইসব দেখবেন, নেচার।’
বিকাশের বিয়ে
বিকাশ আমার বন্ধু। বিকাশ বিয়ে করবে। না করে উপায় নেই। ব্যাংকে ভালো চাকরি পেয়েছে। পরিবারের একটি মাত্র ছেলে। নিজেদের বাড়ি আছে। বাবা মারা গেছেন। মায়ের বয়েস হয়েছে। বিকাশের বিয়ে অবশ্যম্ভাবী। আত্মরক্ষার জন্যেও বিয়ের প্রয়োজন। এদেশে অবিবাহিতা মেয়ের অভাব নেই। সকলেই যে প্রেম করবেন তা-ই বা আশা করা যায় কী করে! মেয়ের বাপ-মাকেই ভালো পাত্র ধরার জন্যে উদ্যোগী হতে হয়। বিকাশের হয়েছে মহা বিপদ। বিকাশ যেন তাজা ফুলকপি। বিকাশ যেন গঙ্গা থেকে সদ্য তোলা একটি ইলিশ মাছ। যাঁরা তাকে চেনেন, জানেন সকলেই তাঁকে ওই দৃষ্টিতে দেখেন। ঝোলাতে হবে, মেয়ের হাতের ইলিশ করে।
দু-চার কথার পরেই তাঁদের প্রশ্ন ইলিশের তেলের খোঁজে চলে যায়। কড়ায় ছাড়লে বিকাশ কতটা তেল ছাড়বে! ব্যাংকের চাকরি? বাঃ বাঃ। কোন ব্যাংক? ন্যাশন্যালাইজড? এখন পাচ্ছ। কত? পাকা চাকরি? বেড়ে বেড়ে কোথায় উঠবে? প্রোমোশান আছে? বাঃ বাঃ। তা ছুটিছাটার দিন। এসো না একদিন। একটু ফ্রায়েডরাইস, চিকেন। রবীন্দ্রসংগীত নিশ্চয় ভালোবাসো। উমা আজকাল ভীষণ ভালো গাইছে। পল্লব সেনের প্রিয় ছাত্রী। তুমি ছবি ভালোবাসো না, ছবি? মেয়েটার আঁকার হাত দুর্দান্ত। নিজের মেয়ের প্রশংসা করা উচিত নয়। তবু না বলে পারছি না।
