‘এই দেখো, সত্যি কথাটাকে তোমরা মিথ্যে ভাবছ। আমি যদি যুক্তি-তর্ক দিয়ে বোঝাতে পারি তাহলে মানবে তো!’
‘এর আবার যুক্তি-তর্ক কী! বাঘ মাংস খায়। শ্রীচৈতন্যের আমলেও খেত, আজও খায়।’ ‘আমি যে-বাঘটার কথা বলছি, সেটা ছিল বিধবা বাঘিনী। কপুরথালার মহারাজার গুলিতে তার স্বামী মারা গিয়েছিল। আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময় এদেশের বিধবারা মাছ-মাংস খেত না। এর ওপর আর কোনও কথা চলে?’
গজানন বললে—’না, চলে না। বিধবা হলে মাছ-মাংস খাবে কী করে! আমার মা বিধবা, আমি জানি।’
‘তুমি সব জানো! বাঘের আবার বিধবা-সধবা কী! বাঘ কি টোপর মাথায় দিয়ে বিয়ে করে!’
অমল রেগে গেছে! গজানন চলে গেল। রাতের রান্নার জোগাড় দিতে হবে। বাবুরা ভালো-মন্দ খায় আর খুব খায়। গজানন চলে যাওয়ার পর অমল বললে, ‘বাঘ তোমরা সেভাবে কেউ দেখোনি, আমি যেভাবে দেখেছি। আমি নেলকাটার দিয়ে বাঘের নখ কেটেছি।’
পরিমল বলল, ‘কেন, তোমার কি সেলুন ছিল!’
‘ঝট করে, একটা কমেন্ট করলে! আসল কথাটা শুনলে না! আমার দাদু ছিলেন মস্ত ডাক্তার। দিশেরগড় রাজ স্টেটের চিফ মেডিকেল অফিসার হয়ে গেলেন। আমরাও গেলুম। মহারাজা খুশি হয়ে দাদুকে একটা বাঘের বাচ্চা উপহার দিলেন। বেশ হৃষ্টপুষ্ট একটা বেড়াল বাচ্চার মতো। হবে না কেন! বেড়াল তো বাঘেরই মাসি। কী তার ওজন! হাসি হাসি মুখ।’
‘গায়ে বোটকা গন্ধ ছিল না?’
‘বোটকা গন্ধ থাকবে কেন! মহারাজার বাঘ। রোজ চান করে, আতর মাখে।’
‘বাঘটা যখন বড় হল, তখন কি একে একে সব খেয়ে ফেললে! তোমার দাদুকে, দিদাকে, তোমাকে!’
‘আজ্ঞে না! একটা কথা জেনে রাখো, বাঘের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করলে বাঘও তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। বাঘ মানুষ নয়।’
‘তা বাঘটা বড় হল, না বনসাই গাছের মতো চিরকাল ছোটই রয়ে গেল?’
‘রীতিমতো বড় হল। আমরা ভাইয়েরা সেই বাঘের পিঠে চেপে বাগানে ঘুরতুম।’
‘তারপরে চেপেই রইলে, চেপেই রইলে, কারণ শুনেছি, বাঘের পিঠে চাপলে আর নামা যায় না।’
‘ওটা একটা ইংরেজি প্রবাদ, রাইডিং এ টাইগার। ওটার সঙ্গে এটার কোনও সম্পর্ক নেই। বাঘটা ছিল ইংরেজদের মতোই, ম্যানারস আর এটিকেট জানা ভদ্রলোক। রাতে বিছানায় আমাদের পায়ের কাছে ঘুমোত। সকালে উঠে টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজত।’
‘খবরের কাগজ পড়ত?
‘ইয়ারকি কোরো না, এইরকম সিভিলাইজড বাঘ আমি আর দুটো দেখিনি।’
‘কী করে দেখবে ওটা তো বাঘ ছিল না, ব্যাঘ্রচর্মাবৃত মানুষ ছিল।’
বিমল বলল, ‘শেষ পর্যন্ত বাঘটার কী হল? মানুষ হয়ে গেল?’
‘দাদু দিশেরগড় থেকে চলে আসার সময় বাঘটাকে অনেক দামে একটা সার্কাস কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকায় একটা জাগুয়ার গাড়ি কিনেছিলেন।’
বিমল বললে, ‘আমার সঙ্গে একবার একটা বাঘের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল।’
পরিমল বলল, ‘তাহলে, আসল বিমলটা গেল কোথায়?’
‘ঠিক বুঝলুম না!’
‘যে-বিমলের সঙ্গে বাঘের দেখা হয়েছিল, সে তো বাঘের পেটে গেছে।’
‘বাঘটা খুব অন্যমনস্ক ছিল, আমাকে গ্রাহ্যই করেনি, আমিও বাঘ বলে চিনতে পারিনি। আর চিনতে পারিনি বলেই বাঘটা আমার সঙ্গে বাঘের মতো ব্যবহার করেনি।’
‘কোথায় দেখা হল! ময়দানে?’
‘ঘটনাটা ঘটেছিল মান্দার হিলে। বিকেলে বেড়াতে বেরিয়েছি। হাঁটছি, হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে ফলুনদীর ওপর লম্বা একটা ব্রিজে এসে গেছি। দেখি কী উলটো দিক থেকে আসছে। বেশ হেলতে-দুলতে। সূর্য ডুবছে। নদীর বালি চিকচিক করছে। গাছপালার মাথায় শেষবেলার রোদ। আমি ভেবেছি, একটা কুকুর। জলবায়ু ভালো। মানুষ চেঞ্জে আসে। হতেই পারে। স্বাস্থ্যবান। কুকুর! ব্রিজের শেষ মাথায় তিন-চারজন লোক, হাতে লাঠি। আসছে। আমাকে জিগ্যেস করছে, দেখা, ইধার কোই শের গিয়া! এক শের নিকলা। সঙ্গে সঙ্গে ধরেছি, ওটা স্বাস্থ্যবান কুকুর নয়, বড় একটা বাঘ! মার দৌড়। দৌড়োতে দৌড়োতে সোজা গয়ায়। একটা দোকানে ঢুকেই এক সের। প্যাঁড়া খেয়ে ফেললুম।’
‘কতটা বেশি হল জানি না। তবে অনেকটাই কাটতে হবে। মান্দার হিল থেকে দৌড়ে গয়া যাওয়া যায় না, দুনম্বর, এক সের প্যাঁড়া খেলে মানুষ মারা যায়।’
‘মান্দার হিলে এক সের কেন তিন সের হজম হয়ে যাবে। জলের গুণ। পাথর খেলে পাথর হজম। একজন ফলঅলা বাইচান্স একটা বাটখারা খেয়ে ফেলেছিল। তিন-চার গেলাস জল খেতেই বিলকুল হজম।’
‘ফল থাকতে বাটখারা খেল কেন?’
‘কম ওজনের বাটখারা ছিল, ওয়েটস অ্যান্ড মেজারসের লোক ধরতে এসেছিল, বাটখারাটা স্রেফ গিলে ফেললে। ইনস্পেকটার বোকা বনে চলে গেল।’
পরিমল বলল, ‘তোমরা বাঘ শিকার করেছ কোনও দিন? আমি করেছি কুমায়ুন ফরেস্টে ইন দি ইয়ার নাইনটিন সেভেনটি টু। সে একটা থ্রিলিং ব্যাপার। আমি এখানে বাঘটাদশহাত দূরে। দুজনে মুখোমুখি। চোখে চোখে তাকিয়ে আছি। বাঘটা আমাকে দেখে জিভ বের করে ঠোঁট চাটছে। ভাবছে, কোন দিক থেকে খাবে!’
‘বাঘ সজনে ডাঁটা খায়?
‘মানে?’
‘মানে, তোমার যা চেহারা! অনেকটা ডাঁটার মতো।’
‘বাঘ সম্বন্ধে তোমাদের কোনও জ্ঞান নেই। বাঘ হাড় হাড় চেহারার মানুষ খুব পছন্দ করে। ওই যাকে বলে হাড়ে-মাসে। বাঘটাকে আমার মারার কোনও ইচ্ছেই ছিল না। ওর ফচকেমি দেখে রাগ ধরে গেল। একটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব। বললুম, ইয়ারকি হচ্ছে! একটা মাত্র গুলি, কপালের মাঝখানে। মেরেই বললুম, সরি। বাঘটা, থ্যাঙ্ক ইউ, বলে শুয়ে পড়ল।
