বাবা বললেন—শুধু একটা আইটেমে তো হবে না, রীতিমতো খাওয়াতে হবে পাতা পেড়ে।
অফকোর্স। এতে আমাদেরও লাভ, আমরাও খাব। আমরা তো অনেক সময় আইটেম খুঁজে পাই না। আর আমাদের মেয়েরাও খুব উৎসাহ পাবে। আমাদের রবিবারগুলো উৎসবের চেহারা নেবে। সবাই লাইন দিয়ে আসছেন, কচুরলতি, মোচা, দই-করলা, ভাপা ইলিশ। সব পিলপিল করে আসছেন। হাঁচতে-হাঁচতে। কাশতে-কাশতে। লাঠি ঠকঠক করতে-করতে। কেউ কোমর সোজা করতে পারে না, কারও হাঁটু মোড়ে না। সকলেরই ওপরে যাওয়ার নোটিশ এসে গেছে।
জ্যাঠামশাই মুগ্ধ হয়ে বললেন—পৃথিবীর কোথাও এমন হয়নি। বাঙলায় বললে, দিস ইজ দি ফাস্ট টাইম ইন দি ওয়ার্লড।
বাবা এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি, এইবার বললেন—তাহলে দক্ষিণ পাড়ারটা।
দাদু বললেন—দক্ষিণ পাড়ারটা মানে?
প্রথমে দক্ষিণ পাড়ার জমিটা বিক্রি করা যাক, তারপর চাঁপাডাঙ্গা, তারপর মধুপুরের বাগানটা।
কেন-কেন, জমিজায়গা বিক্রি করবে কেন? খুব অর্থাভাব! আমাকে বললেই হয়। মক্কেলরা সব টাকা নিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আপনার এই পরিকল্পনা কার্যকরী হলে মাসে কী পরিমাণ টাকা লাগবে ধারণা আছে?
পুঁইশাক, কচুরলতি, মোচা, ডুমুর, পেঁপে, এসবের আর কী এমন দাম!
জ্যাঠামশাই বললেন—প্রজেক্ট কস্টটা তুই বের করে ফেল ছোট। এটা তোর সাবজেক্ট।
বাবা সায়েনসের। গণিতজ্ঞ। অঙ্ক নিয়ে খেলা করেন। জ্যাঠামশাই আর্টসের। ইংরিজি কেটে জোড়া দেন। সাহেবরা ইংরিজি শিখতে আসেন। দাদু আইনের। যার কেস ধরেন সেই মামলা জেতে। পাড়ার অনেকেই আমাদের হিংসে করে।
জ্যাঠামশাই অনেকক্ষণ ধরে একটা মাংসর হাড় নিয়ে কসরত করছেন। চুষে কিছুতেই ম্যারোটা বেরোচ্ছে না। থালায় ঠকাস-ঠকাস করে ঠুকছেন। বাবা বললেন—হয় তবলা ঠোকা হাতুড়িটা চেয়ে নাও, না হয় ওটার মায়া ত্যাগ করো।
বাবার কথায় কান না দিয়ে জ্যাঠামশাই বললেন—কিছু লিফলেট ছাপিয়ে বাড়ি-বাড়ি বিলি করতে হবে। তাতে লেখা থাকবে, নিমন্ত্রণের তারিখ আমরা জানাব। তাহলে হবে কী, ব্যাপারটা আমাদের কন্ট্রোলে থাকবে। সপ্তাহে একজন। জমিজমা বিক্রির প্রয়োজন হবে না।
দাদু বললেন—যদি দেখা যায় তিনজন কী চারজন একই আইটেম খেতে চাইছে, আমরা একই দিনে সেই ক’জনকেই আমন্ত্রণ জানাব।
জ্যাঠামশাই বললেন—গুড আইডিয়া, ভেরি গুড আইডিয়া।
বাবা বললেন—সমস্ত ব্যাপারটাই ভেরি রিস্কি। কিছু লোক পেয়ে বসবে। শুধু তাই নয়, তাদের বাড়ির লোককে অপমান করা হবে। তাঁরা বলবেন—কী আমরা খাওয়াতে পারি না? মার চেয়ে মাসির দরদ বেশি! ফলে হবে কি, সেই লোকটির বাড়িতে তিষ্ঠানো দায় হবে। গাল বাড়িয়ে চড় খাওয়ার মানে হয় না।
দাদু বেশ চিন্তিত—অতি যুক্তিপূর্ণ কথা। তাহলে আমরা কী করব? অভিনব একটা কিছু। তোমরা সবাই ভাবো।
জ্যাঠামশাই বললেন,—আপাতত আমরা মন দিয়ে খাওয়াটা সেরে ফেলি; কারণ আমরা উঠলে তবেই মেয়েরা খেতে বসতে পারবে। অলরেডি আমরা অনেকটা সময় নিয়ে ফেলেছি।
দাদু বললেন—ঠিক-ঠিক। এ ব্যাপারটা আমাদের মনে ছিল না। রান্না তো উপাদেয় হয়েছে। অ্যাজ উপাদেয় অ্যাজ পসিবল। আচ্ছা আমি কি আর এক রাউন্ড চাটনি পেতে পারি!
অফকোর্স, অফকোর্স!
জ্যাঠামশাই সেই হাড়টার মায়া ছাড়তে পারেননি। আবার বারকতক ঠকঠক করলেন।
বাবা বললেন—ওরে কে আছিস, মেজদাকে দেখেশুনে একটা সহজ হাড় দে না।
জ্যাঠামশাই বললেন—ছোটু! খাওয়াটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল বের করা। প্রশ্ন হল— বেরোবে না কেন?
ওটা আর্টের পথে বেরোবে না। বেরোবে বিজ্ঞানের পথে। আমার হাতে দাও।
তোর এখনও খাওয়া হয়নি। আমার এঁটোটা হাতে নিবি!
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতৃতুল্য।
শোন ছোটু, সামনের বার আবার আমরা একসঙ্গে জন্মাব। তোর কোনও আপত্তি নেই তো?
একটুও নেই। তবে একটা কথা, চ্যাটাস-চ্যাটাস করে যখন-তখন মারতে পারবে না।
তাহলে আমারও একটা কথা আছে। যখন-তখন আমার তলপেটে তোমার মাথা দিয়ে ভেড়ার মতো ঢুঁস মারা চলবে না।
আমাকে গরু, ভেড়া, ছাগল, না বললেই হল। মাঙ্কি বলা তো একেবারেই চলবে না। তাহলেই মারব ঘাড়ে লাফ।
বাবা একটা কায়দা করে নলিটার পিছন দিকে ছোট্ট একটা ফুটো করে দিলেন।
নাও, এবার টানো।
ফুড়ুত করে একটা শব্দ হল। জ্যাঠামশাই আধ-বোজা চোখে বললেন—স্পেলনডিড!
মনে রেখো, এই হল টেকনিক।
পরের জন্মে এই জন্মের কিছু মনে থাকবে না রে ছোটু!
সদরে গাড়ি থামার শব্দ হল। ছোট কাকা মার্চ করে ঢুকলেন, পিছনে কালীদা। দু-হাতে দুটো পেল্লায় ইলিশ ঝুলছে।
কাকাবাবু বললেন—যাঃ, খাওয়া ফিনিশ! বউদি দুটো গেল কোথায়?
দাদু বললেন হয়ে গেল। চারটে নাগাদ আবার আমাদের খেতে বসতে হবে। কোনও উপায় নেই।
কাকাবাবু আরামবাগ থেকে মাঝে-মাঝেই হুট করে চলে আসেন, তখন বাড়ি একবারে জমজমাট। খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসেন। ব্যায়ামবীর। ফুটবল পাগল এখনও। মাঝে মাঝে আমার কাঁধে হাত রেখে তেপান্তরের মাঠে বেড়াতে-বেড়াতে কত গল্প। সব কথাই শেষ হয়ে একটি কথায়—ঘনশ্যাম, আমিও বিয়ে করিনি, তুইও বিয়ে করিস না। তোর বাবাকে অনেক বারণ করেছিলুম, অবশ্য এটাও ঠিক, তোর বাবা বিয়ে না করলে তোকে তো পেতুম না। আই। লাভ ইউ ভেরি মাচ বাদশা খান।
যেটাকে আমরা তেপান্তরের মাঠ বলি, সে এক বিশাল মাঠ। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমে চারটে পাড়া। পশ্চিমে কুমোর পাড়া। সুন্দর-সুন্দর চালা বাড়ি। মাঝখান দিয়ে মোটামুটি চওড়া একটা পথ, সোজা চলে গেছে নদীর ধারে। ওই নদীপথেই আসে এঁটেল মাটি বোঝাই নৌকো, পুজোর আগে। বিশ্বকর্মার মূর্তি তৈরির ফাঁকে-ফাঁকেই মা দুর্গা গড়ার কাজ শুরু হয়ে যায়। রাত্তির বেলায় দাওয়ায়-দাওয়ায় লণ্ঠন ঝোলে। ঘরে-ঘরে দেব-দেবীর মূর্তি। সেই আলো-আঁধারিতে হঠাৎ হাজির হলে মনে হয় স্বর্গে এসেছি।
