দুজনেই দুজনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে।
চোর বলছে–কী হল! হিম্মত থাকে এসে ধরো।
কাকাবাবু বললেন—হিম্মত থাকে তো তুই আয় না।
চোর বললে—কোনও দিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে! চোর সবসময় পালায়, আর চোর পালালে তোমাদের বুদ্ধি বাড়ে।
তা পালা, থামলি কেন হঠাৎ! চোর আর ছুঁচো এই দুটোকে আমি ধরি না। আমার ঘেন্না করে। নে নে, ছোট-ঘোট।
আর কত ছুটব! প্রায় এক মাইল হল, সেই গজার মোড় থেকে দৌড় শুরু হয়েছে।
কাকাবাবু বললেন—তুই তো ব্যাটা আচ্ছা অধার্মিক। চোরের ধর্মই হল পালানো।
এতক্ষণে এটা তো বুঝেছ, আমি তোমার চেয়ে জোরে দৌড়োই। ইচ্ছে করলে পালাতে পারি।
তা পালাচ্ছিস না কেন?
কী করে পালাব? তোমাদের বাগানে কৃষ্ণকলির ঝোপে আমার মাল পড়ে আছে যে!
তোর চোরাই মাল আমাদের বাগানে! নিয়ে যা, নিয়ে যা।
চোর আর কাকাবাবু দুজনে গল্প করতে-করতে ফিরে এলেন, যেন হলায়-গলায় বন্ধু। দাওয়ায় বসে কাকাবাবু বললেন—আয় বোস, একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। দৌড়টা বেশ ভালোই হল কী বল? তামাক সাজতে পারিস?
তা আর পারি না!
যা, ওইধারে সব আছে। টিকে, দেশলাই, দুটো-কো, অম্বুরি তামাক। ভালো করে সেজে আন।
দুজনে আয়েস করে তামাক খেতে লাগলেন। ওদিকে ভোর হতে শুরু করেছে। এই চোর কালু কিছুদিনের মধ্যেই কাকাবাবুর ব্যবসায় কাকাবাবুর ডান হাত হয়ে গেলেন। আরামবাগে। কাকাবাবুর বিরাট কাপড়ের আড়ত। কালীবাবু বিশ্বাসী ম্যানেজার। ভীষণ খাঁটিয়ে।
বেশ কিছুদিন পরে কাকাবাবু বললেন কালু, এইবার একটি ভালো মেয়ে দেখে তোর বিয়ে দেবো।
কালু বলল—আবার! ওই চক্করে আর পা দিচ্ছি না।
সে কী রে! বিয়ে করিছিলি? বউ কোথায়?
চুরি হয়ে গেছে।
এখন তাই ভাবি, এই হাইটেক যুগে এইরকম সৎ চোর আর দেখতে পাওয়া যাবে না। আর রসিক গৃহস্থ! আমার দাদু, চোরের কাঁঠাল কাঁধে করে চোরের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন!
.
২.
দাদু আমাদের পরিবারে সবচেয়ে মজার মানুষ। নাম করা আইনজীবী। খুব ‘পপুলার’। যখন গম্ভীর তখন ধারেকাছে যাওয়ার সাহস থাকে না কারুর। মারাত্মক চেহারা। ছ’ফুটের ওপর লম্বা। সেই রকম স্বাস্থ্য। ভোরবেলা দমাদ্দম ব্যায়াম করেন। মুঠো-মুঠো ভিজে ছোলা হল ব্রেকফাস্ট। গায়ে সরষের তেল ডলে গঙ্গাস্নান। কথায়-কথায় গরিলাদের মতো বুকে দুমদুম চাপড় মেরে সঘোষে নির্ঘোষ—শরীরম আদাম খলু ধর্ম সাধনম। আই অ্যাম এ হোয়াইট গরিলা। আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে, সকলের সামনে, স্কুলের বন্ধুদের সামনেও ‘টিকটিকি’ বলে ডাকেন। হুইচ ইজ সো ইনসাল্টিং। মাকে বহুবার বলেছি—মা, তোমার বাবাকে সাবধান করে দিও।
মা বললে–বাবাকে সাবধান! আমার নাম রেখেছে ঘৃতকুমারী। তোর বাবার নাম হয়েছে মুষল। জ্যাঠামশাইয়ের নাম রেখেছে হাবিলদার। কাকাবাবু চৌকিদার। কী করবি বল!
দাদু একদিন রাতে খাওয়ার আগে খানাঘরে আসনে বসে বললেন—তোমাদের ভোজের আসরে আমার একটি সারস্বত নিবেদন আছে। ইদানীংকাব্যরচনায় মনোনিবেশ করেছি। লিখেও। ফেলেছি কয়েকছত্র। এতে মহাকাব্যের গুণ দেখতে পাচ্ছি। অনেক-অনেক দিন মহাকাব্য কেউ লিখলেন না। তার কারণ মুনি-ঋষিরা কেউ নেই। অবশেষে আমাকেই হাত দিতে হল। এই কাব্যের নাম, ‘টিকটিকিকাব্য’।
আমার ভীষণ প্রতিবাদ—এই কাব্য পাঠ করলে, আমি খাবার ঘর ছেড়ে চলে যাব। দাদু বললেন—সেটা অবশ্যই খুব বোকামির কাজ হবে; কারণ আজ শনিবার। তুমি স্পেশ্যাল ভোজ মিস করবে। পোলাও, মালাইকারি, রসনাসিক্তকারী সুখাদ্য যাবতীয়। বৎসে! ইংরেজরা আইন করেও কলমের স্বাধীনতা হরণ করতে পারেনি। সুতরাং শান্ত হয়ে বসে শ্রবণ করো। এটি পরে। নানাভাষায় অনূদিত হবে। চতুর্দিক থেকে মানুষ আসবে এই টিকটিকি কুঞ্জে অবতার দর্শনে।
এ অতি সুস্বাদু জীবন কাহিনি
অবতরিলেন এক সুদৃশ্য টিকটিকি।
মাথা ভরা কৃষ্ণ কেশ কৃষ্ণের মতো।
সারাদিন নানাভাবে পরিচয্যারত।
আর এগোলো না। খাবার এসে গেল। পোলাও-এর সুগন্ধে মহাকাব্য চাপা পড়ে গেল। খেতে খেতে দাদু বললেন—জানো তো, আমার আর ভালোমন্দ খেতে ইচ্ছে করে না। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সেদিন ভোলানাথের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। অত বড় গুণী মানুষ; কিন্তু নেগলেকটেড। একসময় মানুষটা খেয়ে আর খাইয়ে আনন্দ পেত। আমাকে বলছে—ধোঁকা খেতে কী ভালোই বাসতুম। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর কাকেই বা বলব, কে-ই বা শুনবে! কারই বা সময় আছে!
আমার খুব ইচ্ছে!
সকলেই উন্মুখ! জ্যাঠামশাই বললেন সামনের রবিবার নেমন্তন্ন করা যাক। ধোঁকা এমন একটা কিছু হাতি-ঘোড়া ব্যাপার নয়!
দাদু বললেন—আমি সমস্যার গভীরে যেতে চাই।
বাবা বললেন—ডিপ ইনসাইড।
দাদু ভীষণ খুশি হয়ে বললেন—অ্যায়! তুমি ঠিক বাঙলাটা বলেছ—ডিপ, ডিপ, ডিপ ইনসাইড দা প্রবলেম।
জ্যাঠামশাই বললেন—বিস্তারিত জানতে ইচ্ছে করছে। বাংলা করলে, ইন ডিটেলস।
বাড়ির বাইরে লাল রঙের আলাদা একটা লেটার বক্স প্লেস করব। তার গায়ে লেখা থাকবে— ভোজন বক্স।
জ্যাঠামশাই বললেন—ওয়ান্ডারফুল। তার মধ্যে ধোঁকা থাকবে। ভোজন বক্স না লিখে ধোঁকার বাক্স লিখলে কেমন হয়?
আমার আইডিয়া আরও সুদূরপ্রসারী। এই পাড়ায় যার যা খেতে ইচ্ছে করছে, বিশেষ কোনও পদ, অতীতে খেয়েছে, স্মৃতিতে আছে, যেমন ধরো কচুরলতি, কি ইলিশপাতুরি, কি কইমাছের গঙ্গা-যমুনা, ভাপা ভেটকি, জাস্ট একটা স্লিপে লিখে ভোজন বক্সে ফেলে যাবে। শনিবার আমরা খুলে দেখব, রবিবার দুপুরে সার্ভ করা হবে।
