তখন ব্রাহ্মণের স্ত্রী স্বামীকে বললেন, আমার ভাগটিও আপনি নিবেদন করে দিন।
ব্রাহ্মণ বললেন, তা হয় না।
ব্রাহ্মণী বললেন, সে কী কথা! অতিথি নারায়ণ। অতিথি তো শুধু আপনার একার নয়, আমাদের সকলের। আপনি দিন। চিন্তা করবেন না। কর্তব্য পালন করুন।
ব্রাহ্মণ তখন স্ত্রী-র ভাগটি অতিথিকে দিলেন। নিমেষে সেটি খেয়ে অতিথি হাসতে হাসতে বললেন, কিছুই হল না।
ব্রাহ্মণের পুত্র তখন তাঁর ভাগটি অতিথিকে নিবেদন করে বললেন, পুত্রের কর্তব্য পিতাকে তাঁর কর্তব্য পালনে সহায়তা করা।
পুত্রের ভাগ খাওয়ার পরেও অতিথির খিদে গেল না। তখন পুত্রবধূও তাঁর অংশটি দিয়ে দিলেন। সেই ভাগটি শেষ করে অতিথি বললেন, এতক্ষণে হল।
তিনি আশীর্বাদ করে চলে গেলেন। আর কেউ জানল না, সেই রাতেই ব্রাহ্মণের পরিবারের চারজন অনাহারে মারা গেল। ভোরের দিকে একটি বেজি হঠাৎ সেইখানে এল। এসে দেখছে, চারটি মৃতদেহ, আর কিছু ছাতুর গুঁড়ো মেঝেতে পড়ে আছে। বেজি সেই ছাতুর গুঁড়োর ওপর। গড়াগড়ি দিতেই তার শরীরের অর্ধেকটা সোনার হয়ে গেল। এইবার সে যখন বাইরে এসেছে, দেখছে কী, ঘোড়ার পিঠে চেপে এক রাজা এসেছে। রাজাদের সে খুব চেনে। কারণ সে রাজবাড়িতেই বড় হয়েছে।
বেজি জিগ্যেস করলে, এখানে কী হয়েছিল যে আমার আধখানা শরীর সোনার হয়ে গেল?
রাজা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে নামতে বললেন, এখানে একটি যজ্ঞ হয়েছিল, আত্মত্যাগের শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ। সেই যজ্ঞের ভূমিতে গড়াগড়ি দিয়েছিলে, তাই তোমার শরীরের আধখানা সোনার হয়ে গেছে। এইবার তুমি আর একটা এইরকম যজ্ঞের সন্ধান করো, তাহলে তোমার পুরো শরীরটাই সোনার হয়ে যাবে।
বেজি চলে গেল। আজও তার সন্ধান শেষ হয়নি। যেখানেই যজ্ঞ হয় সেইখানেই গড়াগড়ি দিয়ে দেখে তার বাকি শরীরটা সোনার হল কিনা! হয় না। তখন সে বলে, তোমাদের কিছু হয়নি। ভড়ংটাই সার।
রাজা সেই চারটি মৃতদেহের পাশে বসে মৃদুস্বরে ডাকলেন, ব্রাহ্মণ ওঠো! আমাকে আসতে হল তোমাদের জন্যে।
ব্রাহ্মণ চোখ মেলে বললেন, আপনি কে?
আমি সেই অতিথিরই আর এক রূপ। আমি জীবনের জাদুকর।
কেউ জানে না, একমাত্র ব্রাহ্মণ জানেন রাজা কে!
লণ্ঠনের নীল আলোর দিকে তাকিয়ে রাজা বললেন, ব্রাহ্মণ! এই আলোটা এইবার একদিন লাল হয়ে যাবে; খুব শিগগির হবে। তখন শুরু হবে দানবের যুগ। আমরা তখন চলে যাব। সবাই তৈরি থাকো।
রুপোর মাছ
অনেকেই বলে মামার বাড়িতে মানুষ হওয়া ভালো নয়। নিজের বাড়ি ছেড়ে মামার বাড়ি কেন? অনেক সময় ছেলেদের বাবা মারা গেলে বা বাবার অবস্থা খারাপ হলে মায়েরা ছেলেকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আমার ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। আমার বড়মামা বিরাট ডাক্তার। মেজোমামা। নাম করা অধ্যাপক। আমার মাসিমাও খুব শিক্ষিতা। একসময়ে একটা ভালো স্কুলে শিক্ষকতাও করেছিলেন কিছুকাল। আমার দুই মামা এবং মাসিমা ঠিকই করেছেন বিয়ে নিয়ে করবেন না। সাবেক আমলের বিশাল বাড়ি। বিরাট জমিদারি। আমার মাকে এসে অনুরোধ করেছিলেন, দিদি, ভাগ্নেটাকে আমাদের দিয়ে দে। তৈরি করে আবার তোর কাছে ফেরত দিয়ে যাব। ওখানে অতবড় জায়গা, খোলামেলা, কাছাকাছি ভালো ইস্কুল। দেখবি ও খুব আনন্দে থাকবে। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল কী জানি বাবা, বাবা-মাকে ছেড়ে থাকতে পারব তো! এখন মনে হয় মামাদের আর মাসিকে ছেড়ে আমি কোথাও থাকতে পারব না। লোকে বলে আনন্দ নিকেতন। আমার মামার বাড়িটা সত্যিই তাই। সবসময় একটা হুল্লোড়। যখন একা থাকি তখন ভাবি স্বর্গ তো দেখিনি, দেখতেও চাই না। আমার মামার বাড়িটাই তো স্বর্গ! আমার বড়মামা যেন মহাদেব। মেজোমামাকে দেখলে মনে হয় অর্জুন। আর আমার মাসিমা যেন দ্রৌপদী! ঠিক দ্রৌপদীর মতো দেখতে। দ্রৌপদী কেমন দেখতে ছিলেন জানি না। তবে কল্পনায় দ্রৌপদীর যে ছবি আছে তার সঙ্গে আমার মাসিমার খুব মিল। নামটাও ভারী সুন্দর-কুসী! কুসী বোধহয় একটা নদীর নাম। আবার কচি কচি আমকেও বলে কুসী। সত্যি কথা বলতে কি, আমি আমার মাসিমাকে মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।
সকালবেলা মাসিমা আমাদের একতলার বসার ঘরে একটা দোল খাওয়া চেয়ারে বসে অল্প অল্প দুলছেন আর গান গাইছেন, ‘দিবা নিশি করিয়া যতন হৃদয়েতে রচেছি আসন। কর্তা যিনি খ্যাপা তিনি খ্যাপা মূলাধার। চাকলা ছাড়া চ্যালা দুটোর সঙ্গে অনিবার। আহা গুণের কথা কইবো কার।’ মাসিমা গান গাইছেন আর গান্ধারীদি একা হাতল লাগানো ডাস্টার দিয়ে ছবির ধুলো। ঝাড়ছে। মাসিমার বসে থাকার কারণ এই ধুলো ঝাড়ার কাজটা গান্ধারীদি একটু ফাঁকি দিয়ে সারে। তাই মাসিমা বলেছেন, ‘আমি বসে থাকব, আমার সামনে তুই পরিষ্কার করে সব ঝাড়বি। একটাও ছবি যেন না ভাঙে।‘
গান্ধারীদি একটা ছবি একটু নাড়তেই ছবির পেছন থেকে একটা খাম মেঝের ওপর পড়ল। গান্ধারীদি থেবড়ে বসে খামটা দেখছে। মাসিমা গান থামিয়ে বললেন, ‘কী ওটা?’
‘এই ছবিটার পেছনে থেকে খুটুস করে পড়ে গেল।’
‘পড় না, পেছনে কার নাম লেখা আছে?’
‘কিছু লেখা নেই গো। সাদা খাম। মোটা মতন। যেন পার্শে মাছের ডিম ধরেছে!’
‘টিপে দেখনা।’
‘না বাবা, ভয় করছে! কী-নাকী আছে ভেতরে! মাগো!’
আমি ওপাশের টেবিলে বসে বসে অঙ্ক কষছিলুম। আর একটু পরেই মাস্টারমশাই আসবেন। মাসিমা আমাকে বললেন, ‘বিলে দেখ তো, আমার আলসে লেগে গেছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না চেয়ার ছেড়ে।’
